
X
দেশি-বিদেশি বিবিধজন বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে নানা ওয়াজ-নসিহত করেন। তারা সেকিউলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে চুপ।
এ ব্যাপারে তারা কোনো কথা বলেন না। অথচ গণতন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে সেকুলারিজম বা ধর্মনিরপেক্ষতা। সেকিউলারিজম ব্যতীত গণতন্ত্র হচ্ছে খোঁড়া। খোঁড়া মানুষ যেমন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, খোঁড়া গণতন্ত্রও তেমনি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সেকিউলারিজমের সঙ্গে ধর্ম যেমন সাংঘর্ষিক, তেমনি গণতন্ত্রের সঙ্গেও ধর্ম সাংঘর্ষিক। গণতন্ত্রে জনগণ হচ্ছে দেশের সার্বভৗম ক্ষমতার অধিকারী। আর ধর্মে সৃষ্টিকর্তা, ভগবান, গড, ঈশ্বর হচ্ছে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। গণতন্ত্রে জনগণই সব, প্রভু, মালিক। ধর্মে সৃষ্টিকর্তা, ভগবানই সব। তাহলে একজন ধার্মিকের কি গণতান্ত্রিক হওয়ার সুযোগ আছে? আর যে গণতন্ত্র দাঁড়িয়ে আছে সেকিউলারিজমের উপর সে গণতন্ত্রে একজন ধার্মিক কি আস্থা রাখতে পারেন?
কেননা সেকিউলারিজম হচ্ছে, রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা; রাষ্ট্র ধর্মের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করতে পারবে না; রাষ্ট্র কোনো ধর্মকে স্বীকৃতি, আর্থিক সহায়তা বা ভর্তুকি দিতে পারবে না; ধর্মপালন বা বিশ্বাসের যেমন স্বাধীনতা থাকবে, তেমনি পালন না করা বা অবিশ্বাস করার স্বাধীনতাও থাকবে; রাষ্ট্রের নীতি হবে ধর্মীয় সহনশীলতা; ধর্মের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য নিষিদ্ধ করা; পাবলিক স্কুল এবং অন্যান্য সরকার পরিচালিতশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মকে অংশগ্রহণের সুযোগ নিষিদ্ধ করা; পাবলিক স্কুল, আদালত এবং অন্যান্য স্থানে ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শন না করা যাবে না; এবং ধর্মকে একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা।
গণতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপে হলেও বিংশ শতাব্দীর পূর্বে এটি খোদ ইউরোপেও শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়াতে পারেনি। অথচ বিংশ শতাব্দীর অনেক আগেই ইউরোপে সেকিউলারিজম শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়েছে। ইউরোপে রেনেসাঁর ফসল হচ্ছে সেকিউলারিজম। গ্রিক ও রোমান সভ্যতার পতনের পর ধর্ম ইউরোপের জনজীবনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। জীবন মানেই ধর্ম, জ্ঞান মানেই বাইবেল, মুক্তিত্রাতা মানেই পোপ। ইউরোপে শুরু হয় অন্ধকার যুগ যা মধ্য যুগ নামে অভিহিত। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে ধর্ম ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে মানুষ জেগে উঠে। শুরু হয় রেনেসাঁ, ভিত্তি পায় সেকিউলারিজম, আলোকিত হতে থাকে ইউরোপ। তারই ধারাবাহিকতায় ইউরোপে বিকাশ ঘটতে থাকে গণতন্ত্র ও সাম্যের। তাই সেকিউলারিজম ব্যতীত গণতন্ত্র ও সাম্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব।
যেসব দেশে সেকিউলারিজম নিষিদ্ধ, সেকিউলারিজমের নাম উচ্চারণ করা যায় না, সেকিউলারিজমকে পাপ মনে করা হয় সেসব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব? গণতন্ত্রের প্রথম কাজ হচ্ছে দুর্বলকে রক্ষা করা, সংখ্যালঘুকে নিরাপত্তা দেওয়া, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, দেশ ও জাতিকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়া। যে রাষ্ট্রে ব্লাসফেমি আইন বিদ্যমান থাকে, ধর্ম মন্ত্রণালয় থাকে, যে রাষ্ট্র ধর্মকে পৃষ্ঠপোষকতা করে সে রাষ্ট্র কি গণতান্ত্রিক হতে পারে? তার পক্ষে কি গণতান্ত্রিক হওয়া সম্ভব? ধর্ম ও গণতন্ত্র পরিপূরক নয়, বরং মুখোমুখি। ধর্ম সমালোচনার অধিকার দেয় না, ভিন্নমত ও পথ সহ্য করে না। এর অবশ্য কারণও আছে। ধর্ম সমালোচনার অধিকার দিলে ধর্মই থাকবে না। আর গণতন্ত্র সমালোচনা ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার দেয়। গণতন্ত্র প্রস্ফুটিত হয় সমালোচনা ও ভিন্ন মত ও পথের মধ্য দিয়ে। ধর্মে সন্দেহ ও প্রশ্ন করার অবকাশ নেই। অথচ জ্ঞান বিজ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে সন্দেহ ও প্রশ্নের মধ্য দিয়ে। এ জন্যই বলা হয় Ñ Doubt
is the origin of wisdom.
ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আরনল্ড যোসেফ টয়েনবি ÔA
Study of HistoryÕগ্রন্থে সভ্যতার উদ্ভব, বিকাশ ও পতনের কারণ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি সমাজের মানুষকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছেন, সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে তা ধর্মের ভিত্তিতে নয়। তা হচ্ছে মেধা, বুদ্ধিমত্তা ও সৃজনশীলতার ভিত্তিতে। সংখ্যালঘুরা হচ্ছে সৃজনশীল মানুষ, উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। টয়েনবির মতে, জ্ঞানী-গুণী মানুষ, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী এঁরা হচ্ছেন সংখ্যালঘু শ্রেণি। বাকি সাধারণ মানুষ হচ্ছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রেণি। সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ যখন সংখ্যালঘু সৃজনশীল মানুষকে অনুসরণ করে কর্ম পরিচালিত করে তখন সভ্যতার উদ্ভব হতে থাকে। আর যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষ সংখ্যালঘু সৃজনশীল মানুষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তখন সভ্যতার পতন হতে থাকে।
গণতন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এবং সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করে। এটাই গণতন্ত্রের নীতি ও আদর্শ। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠরা শাসন করবে যুক্তি ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। সে ন্যায্য ও যৌক্তিক কথা যদি একজন মানুষও বলেন। এজন্য বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেন, যদি একজনও ন্যায্য কথা বলেন, আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তা মেনে নেব। এটাই গণতন্ত্র। সংখ্যাগরিষ্ঠতার নামে যা ইচ্ছা তা করার নাম গণতন্ত্র নয়। চিন্তাশীল- সৃজনশীল সংখ্যালঘুদের মতামতের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠরা শাসন করবে। এভাবে দেশ সভ্যতা ও প্রগতির পথে এগিয়ে যাবে।
যে দেশে সংখ্যালঘুদের কথা বলার স্বাধীনতা নেই, সৃজনশীল মুক্তমনা মানুষদের কাফির, মুরতাদ, নাস্তিক হিসেবে ঘোষণা করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় সে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কি কোন সুযোগ আছে? বাংলাদেশের ন্যায় দেশে গণতন্ত্রের নামে যা হয় তা হলো ভোটতন্ত্র। ভোটতন্ত্রে বিজয়ী পক্ষ পরাজিত পক্ষের উপর দমন পীড়ন চালায়, তাদের ঘরবাড়িতে হামলা চালায়। আর বিজয়ী পক্ষ যদি প্রতিক্রিয়াশীল হয়, তাহলে তাদের অত্যাচারের মাত্রা আরো বৃদ্ধি পায়। ভোটতন্ত্রে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের আশায় মৌলবাদী শক্তিকে তোশন করে মাথায় তুলে। ফলে মৌলবাদী শক্তি আরো উগ্র হয়। সুলতানি ও মুঘল আমলে এতো উগ্র মৌলবাদী ছিল না। কারণ তখন ভোটতন্ত্র ছিল না। তখন রাজনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলেও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ছিল। এখন বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নেই। কারণ মৌলাবাদী থ্রেট।
ইসলামে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ন্যায় গণতন্ত্রও বিদায়াত। এ প্রসঙ্গে আসাদুল্লাহ আল-গালিব বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে গণতন্ত্র অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ প্রথমে মুসলমানকে ঈমানের গণ্ডিমুক্ত করে। অতঃপর গণতন্ত্র তাকে মানুষের গোলাম বানায়। অতঃপর সে আল্লাহর সন্তুষ্টি বাদ দিয়ে মানুষের মনস্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয় যা তাকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে যদি একটি মাকাল ফলের সাথে তুলনা করা যায়, তাহলে গণতন্ত্র হলো উপরের খোসা এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হলো ভিতরের সারশূন্য অংশ। খোসা উল্টালেই ধর্মনিরপেক্ষতার দুর্গন্ধ বেরিয়ে আসবে। (মুহাম্মদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, হাদিস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, পৃ. ৩০)।
বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্মনিরপেক্ষ বা সেকিউলার শব্দটি উচ্চারণ করা যায় না। মুসলমানদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা, নাস্তিকতা। তাদের কাছে ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ মানে নাস্তিক। এ জন্য কেউ ধর্মনিরপেক্ষ শব্দ কেউ উচ্চারণ করে না। এর পরিবর্তে আরেকটি শব্দ কেউ কেউ উচ্চারণ করেন তা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতা। তাই যে দেশে সেকিউলার শব্দটি উচ্চারণ করা যায় না সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কীভাবে সম্ভব তা কেউ বলে না।
লেখক : শিক্ষক ও ইতিহাস বিশ্লেষক