একুশের চেতনা ও বর্তমান ভাষা পরিস্থিতি

রবিউল আওয়াল পারভেজ

মতামত

দিনে দিনে গড়িয়েছে ৭২টি বছর। ইতিহাসে এ সময়টি খুব দীর্ঘ না হলেও; আমরা বায়ান্নর চেতনাকে কতটুকু সমুন্নত রাখতে

2024-02-22T17:05:59+00:00
2024-02-22T17:05:59+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
একুশের চেতনা ও বর্তমান ভাষা পরিস্থিতি
রবিউল আওয়াল পারভেজ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ৫:০৫ পিএম   (ভিজিট : ১৪৩)
X

দিনে দিনে গড়িয়েছে ৭২টি বছর। ইতিহাসে এ সময়টি খুব দীর্ঘ না হলেও; আমরা বায়ান্নর চেতনাকে কতটুকু সমুন্নত রাখতে পেরেছি ইতোমধ্যেই তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তা সত্ত্বেও, যদি কোন বাঙালিকে প্রশ্ন করা হয়, বাঙালি হিসেবে আপনার কাছে সবচেয়ে গর্বের বিষয় কোনটি?  তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে উত্তরটি আসবে তা হলো আমার ভাষা অর্থাৎ বাংলা ভাষা। সেটি আমরা সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করে বলি আর নাই বলি অন্তত স্বীকার করতে কুণ্ঠাবোধ করি না। 

মূলত বাংলাকে মাতৃভাষার দাবিতে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়নি, ভাষা আন্দোলন হয়েছিলÑ বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে। পাকিস্তান সরকার সে দাবি মেনে না নেওয়ায় বিশ্ব ইতিহাসে সৃষ্টি হয়েছে এক বিরল ঘটনা। ভাষার জন্য তাজা প্রাণে বিলিয়ে দিয়েছে এই ভূখণ্ডের মানুষ। বাংলা সংখ্যাগুরুদের মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও; পাকিস্তান সেটিকে হিন্দুয়ানি ভাষা এবং অপরপক্ষে উর্দু ইসলাম ধর্মের ভাষা, সামন্তবাদী ভাষা এই সব খোড়া যুক্তিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করে তা সর্বস্তরে ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও বাঙালির মধ্যে একটি দূরত্ব সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। তবে ভাষার প্রশ্নে বাঙালি চিরকালই ছিল আপসহীন কাজেই পাকিস্তানিদের উদ্দেশ্যে চরিতার্থ হয়নি। বাঙালি প্রাণ দিল ভাষার তরে, আদায় করে নিলো রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি। পরবর্তীতে নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হল। বাঙালি পেল এক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। বলতে হয়, স্বাধীনতার সঙ্গত একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধকে এই প্রক্রিয়ার পরিণতি হিসেবে বিবেচনা করি তাহলে তার সূচনা হলো ভাষা আন্দোলন। সূচনাকে উপেক্ষা করে কখনো ফলাফল উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কাজেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুধাবন করতে হলে; আমাদের আগে ভাষা আন্দোলনকে গভীরভাবে বুঝতে হবে। আজকে আমাদের এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশে বাংলাভাষা কোন অবস্থায় রয়েছেÑ এই বিষয়টি এখন প্রনিধাণযোগ্য। 

মূলত বাংলা একটি মিশ্রভাষা। এতে নানান দেশের, নানান ভাষার, নানান শব্দ এসে মিশেছে। বাংলা ভাষা সেগুলোকে প্রাণ খুলে আপন করে নিয়েছে। এটিই তো ভাষার ধর্ম। ভাষা যদি তার গ্রহণের দ্বার বন্ধ করে দেয়। ভিনদেশি শব্দ গ্রহণ না করে। তাহলে সেটি পরিণত হবে ল্যাটিন, সংস্কৃত, গ্রিক ভাষার মতোই একটি মৃত ভাষা। তবে প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের নিজস্ব শব্দ থাকা সত্ত্বেও; ভিনদেশি ভাষার শব্দ নিত্যদিন দেদারসে ব্যবহার করে যেতে পারি কিনা? নিশ্চয়ই না! বাংলা ভাষা কালক্রমে অনেক সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে। আমাদের এখন রয়েছে এক সুবিশাল শব্দভাণ্ডার। তবে আক্ষেপের বিষয়, খুব চমৎকার বাংলা শব্দ থাকা সত্ত্বেও; আমরা সেটা ব্যবহার না করে তার স্থলে ইংরেজি, হিন্দি ইত্যাদি শব্দ বেশি ব্যবহার করে থাকি। আবার উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি মিশিয়ে জগাখিচুড়ি এক ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। এইসব কর্মকাণ্ড বাংলার মান-মর্যাদা-গৌরব ক্ষুণ্ন  করে। বাংলা ভাষাকে নিজস্বতা বিলুপ্তির পথে নিয়ে যায়। বর্তমান সময়ের তরুণ-তরুণীরা বিদেশি সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট। বিদেশে সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হওয়া অন্যায়ের কিছু নয়। তবে তারা বাংলা সাহিত্যকে উপেক্ষা করে ইংরেজি সাহিত্যে বুঁদ হয়ে থাকেন। আবার তারা তাদের বিনোদনের খোরাকি মেটাতে কোরিয়ান, হিন্দি, ইংরেজি ইত্যাদি ভাষার চলচ্চিত্রে আপাদমস্তক নিমগ্ন থাকেন। এর ফলে সেই সকল সংস্কৃতির অনেক নেতিবাচক বিষয় আমাদের সংস্কৃতি প্রবেশ করছে এবং বাংলা ভাষার মধ্যে সে সকল বিদেশি শব্দের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হতাশার কথা হলো, আমরা আজো শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা সেটি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছি। সেই সাথে উচ্চ আদালত ও সরকারি অফিসে এখনো ইংরেজি ভাষার আধিক্য রয়ে গেছে। যতদিন পর্যন্ত না আমরা বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে পরিণত করতে পারছি ততোদিন পর্যন্ত বাংলা তার যথাযথ মর্যাদা লাভ করবে না; সেই সঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রেও বাঙালি সর্বোচ্চ উৎকৃষ্টতা অর্জন করতে ব্যর্থ হবে।  সবকিছু মিলিয়ে, বর্তমানে বাংলাভাষা বড়ই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে বিরাজমান। এই সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়। বাংলা ভাষার মান, মর্যাদা ও গৌরব  সমুন্নত রাখতে প্রয়োজন বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগের। প্রথমত সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমকে বাংলায়  করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে বাংলার সুবিশাল, সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার সম্পর্কে এবং সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কেননা সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে একটি ভাষা সবচেয়ে বেশি বিকাশ লাভ করে। বিদেশি ভাষার দৌরাত্ম্য কমাতে,  বাংলা ভাষায় ভালো সংগীত, চলচ্চিত্র, নাটক নির্মাণ করতে হবে।

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার মাস। ভাষা আন্দোলনের চেতনায় নতুন করে উদ্বুদ্ধ হওয়ার মাস। তবে আমাদের ভাষার প্রতি ভালবাসা, সম্মান এবং চর্চা যেন শুধু ফেব্রুয়ারিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর গানÑ ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?’ না, আমরা ভুলতে পারি না। ভাষা আন্দোলনের চেতনা আমাদের মনে অনন্তকালব্যাপী লালন করতে হবে। 

লেখক :  শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়







Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy