আগুনে মৃত্যুর দায় কার

ইয়াসমীন রীমা

মতামত

সদ্য বেইলি রোডে একটি বিল্ডিংয়ে মমান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেলে। এতে প্রায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়।

2024-03-03T15:23:00+00:00
2024-03-03T15:23:00+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
আগুনে মৃত্যুর দায় কার
ইয়াসমীন রীমা
প্রকাশ: রোববার, ৩ মার্চ, ২০২৪, ৩:২৩ পিএম   (ভিজিট : ২০০)
X

সদ্য বেইলি রোডে একটি বিল্ডিংয়ে মমান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেলে। এতে প্রায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ-শিশু অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। কাচ্চি ভাই নামক রেস্তোরায় হ্রাসকৃত খাবারের প্রলোভনে পড়ে হতাহতের ঘটনাটি সিংহভাগ অংশীদার। দেশে এই ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যে প্রথম তা নয়। তবে ট্র্যাজেডির দিক থেকে সত্যিই বলাইবাহুল্য।

আগুন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের মিথ ও লোককাহিনী প্রচলিত আছে। এসব মিথে বা কাহিনীতে লক্ষ্য করা গেছে মানুষকে আগুন এনে দিয়েছে কোনও প্রাণী, দেবতা কিংবা কোনও বীর। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার এডমিরাল্টি দ্বীপের অধিবাসীরা বিশ্বাস করেন সাপ তার মনুষ্য সন্তানদের আগুন দিয়ে রান্না করা শেখায়। সেই থেকে মানুষ রান্না ছাড়াও বিভিন্ন কাজে আগুনের ব্যবহার শুরু করে। আগুন তৈরি আজকের যুগের মতো এতো সহজ ছিল না বলেই বিশ্বের প্রায় সব এলাকার মানুষ আগুনকে পবিত্র হিসেবে গণ্য করেছে। তাকে মর্যাদা দিয়েছে দেবতার আসনে।

বাংলাদেশ প্রতিবছরই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণহানিসহ বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিগ্রস্তের সম্মুখীন হয়। তবে সরকারি হিসাবে তার যথাযথ প্রতিফলন না ঘটলেও ফায়ার সার্ভিস বিভাগ যেসব অগ্নিকান্ডের হিসাব রাখে সেই অনুযায়ীই সরকারি পরিসংখ্যান করা হয়। কিন্তু প্রত্যন্ত এলাকাসহ গ্রাম-গ্রামান্তরে সংঘটিত ছোট-খাটো অগ্নিকাণ্ডগুলোর হিসাব সরকারি নথিতে হিসাবে এলেও খুবই কম। ফায়ার সার্ভিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে মোট ৯ হাজার ৩শত ১০টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে তার মধ্যে ফায়ারসার্ভিসের ৫কর্মীসহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ১০৬ জন। আর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২শত ৩১ কোটি টাকা।

যেসব কারণে সাধারণত অগ্নিকাণ্ড ঘটে তার মধ্যে শহরাঞ্চলে বৈদ্যুতিক গোলযোগ, চুলার আগুন এবং বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাই বেশি ঘটে। গ্রামাঞ্চলে  উত্তপ্ত ছাই, চুলার আগুন এবং খোলাবাতি ব্যবহারের কারণেই বেশিভাগ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এছাড়া বাচ্চাদের আগুন দিয়ে খেলা করা, যন্ত্রাংশের ঘর্ষণ, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অগ্নিসংযোগ, হাঙ্গামা ও উচ্ছৃঙ্খল জনতার অগ্নিসংযোগ, যড়যন্ত্র এবং রহস্যজনক কারণেও কিছু কিছু অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে। সাধারণ পর্যবেক্ষণে দেখা যায় নভেম্বর-জানুয়ারি মার্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটে। এই মৌসুমে এপ্রিল মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ফায়ার সার্ভিস সূত্রেই জানা গেছে, প্রতিবছর সারাদেশে গড়ে প্রায় ১০ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কিন্তু আজও গড়ে ওঠেনি সংগঠিত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা।

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের পরিসংখ্যান থেকে প্রাপ্ত তথ্যে থেকে জানা যায়, শীত, বসন্ত ও গ্রীষ্মকালেই বেশি আগুনে পোড়া রোগী হাসপাতালগুলোতে ভিড় করে। যার প্রধান কারণ হিসেবে চিকিৎসকরা জানায়, শীতকালে গ্রামাঞ্চলে শীতকষ্ট থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে বিভিন্নস্থানে আগুন জ্বালানো হয় আর এইসব আগুনের তাপ গ্রহন করার জন্য শিশুরাই এগিয়ে আসে বেশি এবং অসাবধানতাবশত আগুনের শিকার হয়ে যায় খুব বেশি। তাছাড়া বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে প্রকৃতি শুষ্ক থাকায় সামান্য আগুনই ব্যাপক আকার ধারণ করে পাড়া-মহল্লা গ্রাম পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় এবং নারী শিশুরাই প্রতিবারই বেশি আগুনে শিকার হয়। কারণ অগ্নিকাণ্ডের পর মুহূর্ত্যইে শিশুরা তাদের রক্ষা করার জন্য খুববেশি তৎপর হতে পাওে না।

নারীরা অধিকাংশ সময়ই লজ্জা নিবারণের বস্ত্র আগুন ধরে গেলে তা খুলে ফেলতে দ্বিধাবোধ করেন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেরি করে ফেলেন; ফলশ্রুতিতে তারাই আগুনের শিকার হয় বেশি। তাছাড়া বর্তমানে  শহরাঞ্চলে গার্মেন্টেস ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ড ঘটলে পুরুষ শ্রমিকের তুলানায় নারীশ্রমিকরা আত্মরক্ষায় পারঙ্গম কম। পুরুষরা হয়তো আত্মরক্ষার খাতিরে দৌড়াদৌড়ি করে নিজেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করলেও নারী ও শিশু শ্রমিকরা  তার হড়াহুড়ির কারণে পিছিয়ে পড়ে ফ্যাক্টরি থেকে বের হতে পাওে না। ফলে পুড়ে মরে বেশি। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলো থেকে বেসরকারি এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতিদিন হাসপাতালে যতো আগুনে পোড়া রোগী আসে তার শতকরা ৭০ ভাগই নারী ও শিশু।

এ-ব্যাপারে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. জাহিদুজ্জামান বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি আগুনে পোড়া রোগী আসে শীতকালে এবং তাদের বেশিরভাগ গ্রামগঞ্জের নারী ও শিশু। অধিকাংশ আগুনে পোড়া  মহিলা রোগীরাই অসচেতনার জন্যই দগ্ধ হয়। অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তৎক্ষণিক কী করতে হবে তা তাদের অবগত নয় আত্মরক্ষার জন্য আগুন ধরা গায়ের কাপড় নিয়েই ছোটাছুটি আরম্ভ করে দেয় এবং বাতাসে আগুন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আর শিশুরা আতংকে নিজেকে রক্ষা করার ব্যাপারটি ভুলে যায় যার জন্য তাদের অনেকেই আগুনে পুড়তে হয়।”

ঢাকা মেডিকেল  হাসপাতালের  বার্ণ ইউনিটের অপর ডা. ফিরোজ আলম জানানÑ প্রতিদিন হাসপাতালে সেসব অগ্নিদগ্ধ হয়ে রোগী আসে তার বেশিরভাগ হচ্ছে শিশু ও নারী সেসব রোগী গ্যাস, কেরোসিন, জ্বলন্ত চুলা ও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকেই অগ্নিদগ্ধের শিকার হচ্ছে। অধিকন্তু প্রতিহিংসা-পৈশাচিকতা ও সহিংসতার কারণে অনেক নারী অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়ে হাসপাতালে আসছেন। একটি বেসরকারী এনজিও সংস্থা ‘সেভ লাইভ’ এর জরিপে জানা গেছে, দেশের ৬৮টি জেলায় প্রতিদিন প্রায় গড়ে ১৩ জন মানুষ অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ২ জন, নারী ৭ জন এবং শিশু ৪। গড় অনুপাত হিসাবে দেখা যাচ্ছে এখানে নারী ও শিশুদের সংখ্যা বেশি।

অগ্নিকাণ্ড একটি আকস্মিক দুঘর্টনা। তবে সাবধনতা ও সচেতনতা মাধ্যমে এর হাত থেকে যেমন রক্ষা পাওয়া যায় পাশাপাশি আর্থিক ও বৈয়ষিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক হ্রাস করা যায়। যেমনÑ বাচ্চাদের হাতের নাগালে লাইটার, গ্যাস লাইটার, ম্যাচবক্স না রাখা। খোলা বাতির ব্যবহার পরিহার করা অথবা সাবধানে ব্যবহার করা। অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পুড়ে ফেলার পর ছাইয়ে পানি ঢেলে দেয়া। গ্যাসের চুলার তাপে কাপড় ইত্যাদি শুকানো বদ-অভ্যাস পরিহার করা। যেখানে সেখানে জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো না নিক্ষেপ করা।

আগুনে পোড়া একটি জরুরি স্বাস্থ্যগত সমস্যা। ছোটখাটো পোড়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দিলেও পোড়া যদি বড় হয় তবে তাকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষা পেতে সবার সচেতন ও সাবধনতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের আগুনের কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে। কারণ আগুনের প্রতি শিশুদের কৌতূহল খুব বেশি। প্রতিবছর দেশে আগুনে পুড়ে ২৫০ কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যায়। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে প্রায় ১০ হাজারের বেশি। এসব ঘটনার মূলে রয়েছে অসাবধানতা-অসচেনতা।

 লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy