
X
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস- এ দিবসটির আমাদের সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। দিবসটির সূত্রপাত হয় ১৮৫৭ সালের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কারখানার নারী শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, শ্রমঘণ্টা ১৬ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টা নির্ধারণ এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
১৯১০ সালে সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাবক্রমে ৮ মার্চকে ‘নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে প্রথমবারের মতো ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে উদযাপন করে।
অপরদিকে, আমরা ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস পালন করি। বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া জন্ম ও মৃত্যুদিনকে ঘিরে আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে এ দিনটি পালিত হচ্ছে। কাজেই নারীর ক্ষমতায়ন, নিরাপত্তা ও নারীর প্রতি বৈষম্যহীনতার প্রতি আমাদের জোরাল অঙ্গীকার রয়েছে। তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হলে অবশ্যই নারীবান্ধব সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চত করতে হবে।
মা, বোন, স্ত্রী কিংবা শাশুড়ি ও দাদি হিসেবে পাড় করা জীবনের প্রতিটি ধাপে নারীকে পালন করতে হয় আলাদা ভূমিকা। তবুও আমাদের সমাজে নারীরা সম্পদ থেকে বঞ্চিত, সিদ্ধান্তগ্রহণে প্রান্তিক নারীর কোনো ক্ষমতা নেই। যদিও ক্ষমতাবলয়ের কেন্দ্রে কিছু কিছু নারী নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিয়েছেন; তবুও আমাদের সমাজের প্রান্তিক নারীদের অবস্থা তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। আমাদের দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী, তাই পেছনে ফেলে দেশ এগোতে পারে না।
পুরুষের পাশাপাশি নারীর পূর্ণ মানবাধিকার উপভোগ ও জীবনের সব ক্ষেত্রে তাদের সমানাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক যাবতীয় প্রচলিত বৈষম্যমূলক ধারণাগুলোকে নির্মূল করার ব্যাপারে রাষ্ট্রের যথেষ্ট প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ইংরেজিতে একে বলা হয়-Convention
on the Elimination of All Forms of Discrimination Against Women। বাংলায় বলা হয়, নারীর প্রতি সবধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ। সংক্ষেপে বলা হয় সিডও (CEDAW)। বাংলাদেশ সরকার ১৯৮৪ সালে এ সনদে স্বাক্ষর করে। তবুও আমাদের দেশে নারীর প্রতি বৈষম্য রয়েছে পারিবারিক কাঠামোয় ও সমাজব্যবস্থায়।
অপরদিকে, জাতিসংঘের এসডিজির লক্ষ্য নারীদের সম-অধিকার এবং তাদের ও কন্যাশিশুদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নারীদের জন্য যে নতুন উন্নয়নের মডেলের বিষয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা চলছে, সেখানে মূলত মোটাদাগে চারটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা হয়েছে।
এক. ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা স্থাপন। ভূমির ওপর নারীদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে পরিবার ও জনগোষ্ঠীর খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা তৈরি হয়। ভূমি কেবল আয়ের উৎস নয়, এটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সাথেও সম্পৃক্ত।
দুই. মানসম্মত কাজের পরিবেশ এবং মজুরি। গার্মেন্টস, কৃষি, ঘর-গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত নারী শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এমন একটি উন্নয়ন কৌশল দরকার যেখানে শ্রমিক, তার পরিবার ও ওই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি মানসম্মত মজুরি নির্ধারনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে একজন শ্রমিক সম্মানের সাথে তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
তিন. শান্তি ও ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া, সুশাসনের শূণ্যতা নারী অধিকার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লংঘন যা অন্যান্য উন্নয়ন অধিকারের অন্তরায় হিসেবে মনে করা হয়। সহিংসতার ফলে নারী এবং শিশু গৃহহীন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
চার. সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে এবং সরকারি উচ্চপর্যায় পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। তৃণমূল পর্যায় এবং জাতীয় পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ হলো নারী অধিকার, জেন্ডার সমতা, টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।
আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং নারীর প্রতি সবধরনের বৈষম্য বিলোপ করতে হবে। তৃণমূলের নারীদের স্থানীয় সরকারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে। জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন থাকলেও সেখান থেকে কোনো নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না, কারণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণ করার সুযোগ নেই। অপরদিকে নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবারিত সুযোগ উন্মোচিত করতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতিসহ সমস্ত জায়গায় নারীর সক্রিয় ও অবাধ অংশগ্রহণের জন্য সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করে নারীবান্ধব সমাজ ও রাষ্ট্রব্যাবস্থার প্রত্যাশাই হোক আজকের নারী দিবসের অঙ্গীকার।
লেখক : বিশ্লেষক ও সমাজসেবক