একাত্তরের মার্চ : বঙ্গবন্ধুময় বাংলাদেশ

এ কে এম শাহনাওয়াজ

মতামত

নির্বাচনে অভ্রভেদী বিজয় লাভ করার পরও বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসনভার হস্তান্তর না করার ব্যাপারে পাকিস্তানি শাসকচক্রের ষড়যন্ত্র এরই

2024-03-18T14:07:44+00:00
2024-03-18T14:07:44+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
একাত্তরের মার্চ : বঙ্গবন্ধুময় বাংলাদেশ
এ কে এম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০২৪, ২:০৭ পিএম   (ভিজিট : ১৫৬)
X

নির্বাচনে অভ্রভেদী বিজয় লাভ করার পরও বাঙালির হাতে পাকিস্তানের শাসনভার হস্তান্তর না করার ব্যাপারে পাকিস্তানি শাসকচক্রের ষড়যন্ত্র এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তখন বাঙালি অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। 

আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া এ সময়ে বাঙালির আর কোনো পথ খোলা ছিল না। এবারের আন্দোলন শাসকচক্রের সঙ্গে সর্বাত্মক অসহযোগিতা করার দিকে এগিয়ে যায়। ঘোষণা করা হয় ৩ মার্চ থেকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে। ২ মার্চ থেকে হরতাল শুরু হয়ে যায়। ৩ মার্চেও তা অব্যাহত থাকে। সর্বস্তরের মানুষ তখন রাজপথে নেমে এসেছিল। ঢাকা শহর মিছিলের নগরীতে পরিণত হয়।

এরই মধ্যে প্রশাসন কারফিউ বা সান্ধ্য আইন জারি করে। কারফিউ উপেক্ষা করে মিছিল করতে থাকে বাংলার মানুষ। সেনাদের গাড়ি যাতে চলাচল না করতে পারে সে জন্য রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া হয়। একপর্যায়ে পুলিশ জনতার মিছিলে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে এদিন ঢাকায় পাঁচজন বাঙালির মৃত্যু হয়। এতে হতোদ্যম হয়নি অকুতোভয় মানুষ। তারা মৃতদেহ নিয়ে মিছিল বের করে। এই সংবাদে ঢাকার বাইরে অন্যান্য বড় শহরেও মিছিল বের হয়।

ঢাকার মতো পূর্ণ হরতাল পালন করে চট্টগ্রাম। ২ মার্চ হরতাল চলাকালে চট্টগ্রামে মোট ৭৫ জন নিরীহ বাঙালি শহীদ হন। এই সময় পাকিস্তানি শাসকচক্র ভিন্ন ষড়যন্ত্রে নামে। বিহারিদের দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে দেয়। দাঙ্গার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের গতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করা হয়। এতে কোনো ফল হয়নি। ক্রমে ঢাকার মতোই খুলনা, রাজশাহী, বরিশালসহ চারদিকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে আসে বাঙালির কাক্সিক্ষত ৭ মার্চ। এদিন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে বাঙালি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পথ ধরে স্বাধীনতাসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার বার্তা পেয়ে যায়। শুরু হয় সর্বাত্মক প্রস্তুতি। সেদিন থেকেই পূর্ব পাকিস্তান হয়ে পড়ে বঙ্গবন্ধুময়। বাঙালি পাকিস্তানি প্রশাসনকে অকার্যকর করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই ছিল একমাত্র পালনীয়। এই তুমুল আন্দোলন বাঙালিকে টেনে নিয়ে আসে ১৫ মার্চ পর্যন্ত।

পাকিস্তান সরকার অনড় থাকায় ১৫ মার্চ নতুন করে তীব্র অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু। ১৫ মার্চ তিনি ঘোষণা করেন, ‘লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত অহিংস ও অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’ আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনার জন্য মোট ৩৫টি নির্দেশ ঘোষণা করে। এই সব নির্দেশ সমাজের সর্বস্তরে; যেমন—সরকারি অফিস-আদালত, কলকারখানা, রাষ্ট্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রেই মেনে চলা হলো। এমনকি রেডিও, টিভিও বঙ্গবন্ধুর অদেশ মেনে চলে। এর মধ্যে ছিল সরকারি সংস্থাগুলো; যেমন—কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সেক্রেটারিয়েট, সরকারি-বেসরকারি অফিস, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান, হাইকোর্ট এবং বাংলাদেশস্থ সব কোর্ট হরতাল পালন করবে। বঙ্গবন্ধুর দেওয়া বিশেষ নির্দেশনাবলি এবং বিভিন্ন সময়ে যেসব ছাড় ব্যাখ্যা দেওয়া হবে, তার সবই মেনে চলা হবে।

নির্দেশ অনুযায়ী পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ডেপুটি কমিশনারসহ মহকুমা কর্মকর্তারা তাঁদের দপ্তর বন্ধ রেখে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে তাঁরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশমতো আওয়ামী লীগের সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও নিবিড় সহযোগিতা বজায় রাখেন।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা সব বাহিনী নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নেতার নির্দেশে প্রয়োজনবোধে আওয়ামী লীগ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকেন। বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতি কেবল সেই সব অফিস খোলা রাখার নির্দেশ ছিল, যেগুলো বন্দরে জাহাজ চলাচলের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষকে নির্যাতনের জন্য সেনা ও সমরাস্ত্র আনা-নেওয়ার কাজে কোনোভাবেই সহযোগিতা না করার নির্দেশও অক্ষরে অক্ষরে পালিত হতে থাকে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য খাদ্যবাহী জাহাজগুলোর মাল খালাস ত্বরান্বিত করার সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। নির্দেশ ছিল আদায়কৃত শুল্ক কেন্দ্রীয় সরকারের নামে জমা হবে না এবং তা-ই পালিত হতে থাকে।

বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের চলাফেরা ও খাদ্যশস্য পরিবহনের জন্য যানবাহন চালু রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ডাক বিভাগ শুধু জনপ্রয়োজনীয় কাজটুকু করার নির্দেশই পালন করে যায়। নির্দেশ ছিল বেতার, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রগুলো কাজ চালিয়ে যাবে। কর্মীরা গণ-আন্দোলন সম্পর্কিত সব বক্তব্য, বিবৃতি, সংবাদ ইত্যাদি প্রচার করবেন। যদি না করেন, তবে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করবেন না। অক্ষরে অক্ষরে পালিত হতে থাকে এই নির্দেশ।

এভাবে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ৩৫টি নির্দেশ সামরিক সরকারের রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে বাঙালি স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করতে থাকে। কার্যত সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তান অর্থাউৎ বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলেছিল।

অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি সামরিক সরকার নতুন ষড়যন্ত্র আঁটে। পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার জন্য ১৫ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। ঢাকায় তাঁকে বাঙালিদের পক্ষ থেকে কোনোরূপ স্বাগত জানানো হয়নি। বিমানবন্দরের সব পথ সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়। চারদিকে সেনারা পাহারায় ছিল। প্রেসিডেন্টকে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল ১৮ পাঞ্জাব ব্যাটালিয়নের একটি কম্পানি। মেশিনগানে সজ্জিত গাড়ি ছিল। ইয়াহিয়ার বিমান শ্রীলঙ্কা ঘুরে ঢাকায় পৌঁছে বিকেল ৩টায়।

এই সময় পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি কতটা নাজুক ছিল, তা পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিকের গ্রন্থে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমি অনেক রাষ্ট্রপতি আর দেশের প্রধানদের আগমন দেখেছি, কিন্তু ১৫ মার্চ ঢাকায় যে পরিবেশের মধ্যে রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান এসে অবতরণ করলেন, তা আমি কখনোই ভুলব না। বিমানবন্দরে প্রবেশের সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। টার্মিনাল ভবনের ছাদের ওপর স্টিলের হেলমেট পরা প্রহরীদের দাঁড় করানো হয়। বিমানবন্দর ভবনের প্রতিটি সদস্যকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখা হয়। পিচঢালা পথে প্রবেশের একমাত্র রাস্তা পিএএফ গেটে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সেনাবাহিনীর একটি দলকে বসানো হয়। পদাতিক সেনার (১৮ পাঞ্জাব) ট্রাক ভর্তি একটি কম্পানি (প্রায় ১০০ জনের) ফটকের বাইরে মেশিনগান নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে রাষ্ট্রপতিকে সঙ্গে করে শহরে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করা অল্প কয়েকজন কর্মকর্তাকে বিমানবন্দরের ভেতরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। তাঁদের বিশেষ নিরাপত্তা পাস দেওয়া হয় আমাকেসহ।

কোনো ফুলের তোড়া ছিল না, ছিল না কোনো বেসামরিক কর্মকর্তা, শহরের অভিজাতদের কেউ নেই, নেই সাংবাদিকদের ধাক্কাধাক্কি বা ক্যামেরার ক্লিক। এমনকি সরকারি ফটোগ্রাফারকেও অনুমতি দেওয়া হয়নি। এ ছিল এক অদ্ভুত ভীতিকর পরিবেশ, যেখানে জড়িয়ে ছিল মৃত্যুর স্তব্ধতা’ (আত্মসমর্পণের দলিল, মূল বই সিদ্দিক সালিক, Witness to Surrender, মুক্তিযুদ্ধ আর্কাইভ, পৃ. ৮০)।

উত্তাল মার্চের ২৫ তারিখ পর্যন্ত প্রতিটি দিনই ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। এর মধ্যে ১৫ মার্চ বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে এসেছিল। এদিন থেকে অসহযোগ আন্দোলন তীব্রতা পায়। ১৫ মার্চে ইয়াহিয়া খানের ঢাকায় আগমন ও পরদিন থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূল থাকলেও রাজনীতিবোদ্ধা বাঙালি তেমন আস্থা  রাখতে পারেনি।

কোনো কোনো মহলের ধারণা ছিল, ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠকের কারণে আন্দোলন স্থগিত হতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের প্রতি সচেতন মানুষের কোনো আস্থা ছিল না। বঙ্গবন্ধু নতুন কোনো নির্দেশও দেননি। ১৫ মার্চে যথারীতি আন্দোলন কর্মসূচি এগিয়ে যায়। এদিন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে ঢাকা শহরের পাঁচটি এলাকায় গণসংগীতের আসর, সভা ও নাট্যানুষ্ঠানের কর্মসূচি নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় নাটক মঞ্চস্থ হবে খোলা ট্রাকের ওপর। বাহাদুর শাহ পার্ক থেকে বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর বেচারাম দেউড়ী, হাজারীবাগ, মগবাজার ও মালিবাগে অনুষ্ঠান কার্যক্রম চালানো হয়। নাটকের নাম ছিল ‘শপথ নিলাম’।

সন্ধ্যা ৭টায় বিক্ষুব্ধ শিল্পী সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে শহীদ মিনারে অনুষ্ঠিত হয় গণসংগীত। পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের উদ্যোগে অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে বিকেল ৪টায় ১২ নম্বর তোপখানা রোডে মহিলাদের সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য বিকেল ৫টায় ঢাকা জেলার বিভিন্ন মহকুমার আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ও সহকারী প্রধানদের জরুরি সভা ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। একইভাবে বিকেল ৫টায় ৪১২ নম্বর নাখালপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় শ্রমিক লীগ তেজগাঁও আঞ্চলিক শাখার অন্তর্ভুক্ত ৮৬টি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদকদের জরুরি সভা। সামরিক আদেশের বিরুদ্ধে বিকেল ৪টায় স্বাধীন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালিত হয়।

এভাবে ১৫ মার্চ থেকে আরো কার্যকরভাবে বঙ্গবন্ধুর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে গোটা পূর্ব পাকিস্তান। পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে পাকিস্তান প্রশাসন। বাঙালির কাছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশই ছিল একমাত্র পালনীয় কর্তব্য, যা আরো তীব্র হতে থাকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত। এসব বাস্তবতায়ই ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বর্বর সেনারা গণহত্যা শুরু করলে ভয়ংকর মারণাস্ত্রের মুখেও বাঙালির রুখে দাঁড়াতে কালবিলম্ব হয়নি।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy