
X
মিয়ানমারের পূর্ব নাম বার্মা। মোট জনসংখ্যার ৮৮.৭ শতাংশ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষের আবাসস্থল হচ্ছে মিয়ানমার। মিয়ানমার ভূখণ্ডের ইতিহাস ১৩,০০০ বছরেরও পুরনো। মিয়ানমারের সবচেয়ে প্রাচীন অধিবাসী ছিল তিব্বতীয়-বার্মান ভাষাভাষি জনগোষ্ঠী।
সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এই জনপদে মোট জনসংখ্যার ৬৮ ভাগ বার্মিজ হলেও ৯ শতাংশ শান, ৭ শতাংশ কারেন, ৪ শতাংশ রাখাইন, ৩ শতাংশ বর্মী চীনা, ২ শতাংশ বর্মী ভারতীয়, ২ শতাংশ মোন এবং ৭ শতাংশ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী বাস করে। মিয়ানমারের দি ইরাবতী পত্রিকার তথ্যানুসারে ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে মিয়ানমার গঠিত। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা তাদের হৃদয়ে একটি বিশ্বাস ধারণ করে তা হলো ‘জীব হত্যা মহাপাপ’। বিশ্বের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো বৌদ্ধদেরও আস্থা বিশ্বাসের প্রতীক হচ্ছে শান্তি। কিন্তু মিয়ানমারের জনমনে শান্তি কোথায়?
ইতিহাস ঘেটে জানা যায়- সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মিয়ানমার ভূখণ্ডে অশান্তি বিরাজমান। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের সময় থেকে দেশটি একরকম গৃহযুদ্ধের মধ্যেই লিপ্ত আছে। ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর Anti Fascist Peoples Freedom League (AFPFL) এর নেতা অং সান মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতায় ছিল। এরপর থেকেই সামরিক বাহিনী নানা কলাকৌশলে দেশটির রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রেখেছে। ফলে রাজনৈতিক ও জাতিগত সংঘাতের মাত্রা কখনোই কমেনি। এছাড়া সময়ে সময়ে সেনা সরকারের একেকটি হঠকারী সিদ্ধান্ত দেশটির সাধারণ জনগণ কখনোই পছন্দ করেনি। ফলে কেউ কেউ উন্নত জীবনের আশায় স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছে। আবার কেউ কেউ সেনাবাহিনীর জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
২০১৭ সালে মিয়ানমার জান্তা বাহিনীর ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’-এর পর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দলে দলে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আসতে থাকে। মানবিক বিবেচনায় সে সময় বাংলাদেশ সরকার নিজ দেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু বিশাল জনসংখ্যার এই দেশে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়া গেলেও স্থায়ীভাবে তাদের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়।
অদ্যাবধি মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আগ্রহ প্রকাশ করেনি। মিয়ানমার এমন একটি রাষ্ট্র, যার সঙ্গে কোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা কখনোই সহজ নয়। মিয়ানমার সবসময়ই সামরিক বাহিনী কর্তৃক প্রভাবিত একটি রাষ্ট্র। যাই হোক মিয়ানমারজুড়ে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন শক্তির সংঘাত বেগবান হচ্ছে। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের কাছে জান্তাবাহিনীর অবস্থানগত পরিবর্তন হচ্ছে। ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স তিনটি সামরিক শক্তির সম্মিলিত রূপ। মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, তায়াং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি এবং আরাকান আর্মির জোটবদ্ধ এ গ্রুপটি ২০২৩ সালে গঠিত হয়।
২০২৩ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রেজিস্টেন্ট গ্রুপ সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করেছে। সে আক্রমণ ক্রমেই তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি প্রতিনিয়ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্টেশনে আক্রমণ করছে। মিয়ানমার জান্তাবাহিনীর উপর আরাকান আর্মির এই আক্রমণে আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক ও ভূরাজনৈতিক কূটনীতির অন্যতম ধাপ হতে পারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। কারণ এরকম পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের যেমন আন্তর্জাতিক সুদৃষ্টি প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন আরাকান আর্মিরও। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখানে একটি প্রধান ভূমিকা হিসেবে কাজ করতে পারে।
আরাকান আর্মির তৎপরতার সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সংযুক্ত করা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বর্তমানে মিয়ানমারে যুদ্ধরত আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রতি সংবেদনশীল মনোভাব পোষণ করেছে। আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তোয়ান মারত নাইং এক সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গাদের প্রতি তাদের সহানুভূতি, নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া ও দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিনিময়ে বাংলাদেশের কাছ থেকে আরাকান আর্মি স্বীকৃতি চায়। আরাকান আর্মির দেওয়া প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য শুভকর কি না ভেবে দেখার বিষয়। যদি আরাকান আর্মির কার্যক্রমে বাংলাদেশ সমর্থন দেয় সেটাকে তারা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে প্রচার করবে।
বাংলাদেশি স্বীকৃতির বিষয়টি তুলে এনে তারা তাদের কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। তবে আরাকান আর্মির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে এমন অনেক যুদ্ধের ঘটনা আছে যেখানে বিনিময় চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মোঘল সম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট মির্জা নাসির-উদ-দীন মুহম্মদ হুমায়ূন শুরি রাজবংশের কবল থেকে তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করেছিলেন পারস্য সম্রাট শাহ তামাস্প এর সহযোগিতায়। বিনিময়ে কান্দাহার প্রদেশ ছেড়ে দিয়েছিলেন।
আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্য দখল করলেও তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রত্যক্ষ আলোচনা শুরু করা বাংলাদেশের জন্য সহজ হবে না। কেননা এ আলোচনা বাংলাদেশ-মিয়ানমার কূটনীতিক কাঠামো পরিপন্থী। অন্তত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এ আলোচনা নিতান্তই অশোভন। রাখাইন সম্পূর্ণ স্বাধীন হলে সে দেশের সরকার গঠিত হবে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কী হবে সেটা রাষ্ট্রই জানে। আরাকান আর্মির একক সিদ্ধান্তে বহুল আলোচিত রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান কি আদৌ সম্ভব?
সদ্য জন্ম নেওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইনে এত দ্রুত ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়া প্রকৃতপক্ষেই দূরহ ব্যাপার। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে যদি কোন রাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয় তবে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে নিজ উদ্যোগেই মিয়ানমারের সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করা। এজন্য সেদেশের সামরিক বাহিনীর প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। প্রয়োজনে তাদের সাথে বারবার সংলাপের ব্যবস্থা করতে হবে। সামরিক বাহিনীর মনস্তত্ত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর কাছে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণহত্যা সংঘটনের বিষয়টি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গাদের কেবল ধৈর্য ধারণের পরামর্শই দেওয়া হয়। একজন শরণার্থীর জীবন যে কতটা দুর্বিষহ সেটা বুঝেও কেউ বুঝতে চায় না। শান্তির বাণী বয়ে বেড়ানো বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মিয়ানমারবাসীর রোহিঙ্গাদের প্রতি যেন কোন মমত্ববোধ নেই।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতায় গত ৬ বছর ধওে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের দেখভাল করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজেই অধিক জনসংখ্যাসমৃদ্ধ একটি নিম্নমধ্যবৃত্ত দেশ। মানবাধিকার সংস্থার ভূমিকা কেন এ ব্যাপারে নীরব সে প্রশ্নোত্তর কে দেবে? চীনের মধ্যস্থতায় রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার ব্যাপারে ‘পাইলট প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছিল। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে এটি ছিল তৃতীয় দফা উদ্যোগ।
২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করে। সে সময় অবশ্য তারা রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’ বলে আখ্যায়িত করেছিল। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রথম ধাপে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্যকর হয়নি। এরপর দ্বিতীয় দফায় চীন আবার ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর আরেকটি উদ্যোগ নেয়। সেটিও কার্যকর হয়নি। কারণ একটাই মিয়ানমারের নাগরিকত্ব বিষয়ক জটিলতা। চীনের পক্ষ থেকে তৃতীয় দফা উদ্যোগও ব্যর্থ হয়। কারণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ দেখতে ২০ জন রোহিঙ্গা মিয়ানমারে গেলে তাদের গ্রামের কোন চিহ্নই নাকি দেখতে পায় নাই। তাই তারা স্বেচ্ছায় নিজভূমে ফিরতে অনাগ্রহ দেখিয়েছে।
বর্তমানে রাখাইনে প্রত্যাবাসন উপযোগী পরিবেশ বলতে কিছুই নেই। ছয় বছর আগে ফেলে আসা তাদের জন্মভূমির কাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে। সেখানে সেনা ব্যারাক, পুলিশ ফাঁড়ি, সীমান্ত চৌকিসহ গড়ে তোলা হয়েছে এক ভিন্ন নগর। মংডুতে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনের জন্য যে মডেল ভিলেজ’ নির্মাণ করা হচ্ছে, তাতেও থাকতে রাজি না রোহিঙ্গা সম্প্রদায়। আসল কথা হলো নাগরিকত্বের অনিশ্চয়তা রোহিঙ্গাদের ঘরে ফিরতে ভীত সন্ত্রস্ত করে রেখেছে। মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গারাই এখন বাংলাদেশের দুঃশ্চিন্তার প্রধান ইস্যু। প্রথম প্রথম মোটামুটি ভালোই বিদেশি সাহায্য আসত। কিন্তু এখন তার পরিমাণ একেবারেই কমে গেছে। রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পের বাইরে বের হওয়া নিষিদ্ধ করা হলেও তারা অবাধে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। পেটের দায়ে বিবিধ অপকর্মে জড়িত হয়। ভুয়া এনআইডি তৈরি করে বাঙ্গালি সাজার চেষ্টা করে। ভুয়া পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে। মূলত রোহিঙ্গারা যে এ দেশে আশ্রিত সেটি তাদের জীবনাচরণে ফুটে ওঠে না। আবার তাদের মূলস্রোতে মিশে যেতে দেয়াও সম্ভব নয়। এ কারণে যে করেই হোক রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতেই হবে। তবেই বাংলাদেশ হবে বোঝামুক্ত, দায়িত্বমুক্ত এবং দুশ্চিন্তামুক্ত।
লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও সংগঠক