
X
ভূরাজনীতি এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রতিনিয়তই ভূরাজনীতির চিত্র পরিবর্তন ঘটছে। ভূরাজনীতিতে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থির রাখা, সম্পর্ক উন্নয়ন এবং সম্পর্কের মেরুকরণ বাণিজ্য এবং অন্যান্য বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে। এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে।
সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং র্দীঘ ৫ বছর পর ইউরোপ মহাদেশ সফরে যান। অবশ্য সফরের শুরুতেই তাকে পরতে হয়েছে বিক্ষোভের মুখে। অভিযোগ রয়েছে, কোভিড বৈশ্বিক মহামারির কারণ হিসেবে ইউরোপের বহু মানুষ এখনো চীনকেই সন্দেহের চোখে দেখেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, চীনে গণতন্ত্র নেই, সেই সঙ্গে মানবাধিকারও লুণ্ঠিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
চীনে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করার দাবি তোলেন। চীনের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আগেও উঠেছে। সেখানে উইঘুঁর মুসলিমদের বিরুদ্ধে করা চীনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এসেছে। এর সাথে রয়েছে তীব্বত সমস্যা। এছাড়াও আরও কয়েকটি অভিযোগের তীর রয়েছে জিনপিংয়ের দিকে। ফলে তাকে বিক্ষোভের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যদিও এই পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণভাবেই তিনি ফ্রান্স সফর করেছেন। কিন্তু এরপর চীননীতি কতটা বদলাবে সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ।
গণমাধ্যমে যতটুকু বিশ্লেষণ দেখেছি সেখানে কূটনৈতিক মহলের অনুমান, চীনা প্রেসিডেন্টের ইউরোপ সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজেদের আর্থিক সঙ্কটের আশঙ্ক থেকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করা। চীন সরকারের দমন-পীড়ন নীতির সমালোচনা ইউরোপজুড়ে। ফ্রান্স থেকে শুরু করে ইউরোপের সর্বত্রই চীনের সাম্রাজ্যবাদী ও আগ্রাসী ভূমিকার প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন বিভিন্ন তিব্বতী সংগঠনের সদস্যরা। তিব্বতের মুক্তির দাবিতে খোদ প্যারিসে শি-র সফরকালে বিক্ষোভ দেখান নারীরা।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনও এগিয়ে আসে তিব্বতীদের সমর্থনে। তিনি ফ্রান্স, এর পর সার্বিয়া ও হাঙ্গেরিতেও যাবেন। সার্বিয়ার বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ চিন। সার্বিয়া সফরে চিনের মার্কিনবিরোধী এবং ন্যাটোবিরোধী এজেন্ডাকে আরও বেশি করে তুলে ধরে কেন তারা রাশিয়ার সমর্থন করছে তা জানাতে চান জিনপিং। ফ্রান্স সফরের পর তিনি যাবেন সার্বিয়ায়। দেশটির সাথেও রয়েছে চীনের এক ইতিহাস। ২৫ বছর আগে দেশটির রাজধানী বেলগ্রেডে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা আঘাত করেছিল চীনা দূতাবাসে। সেই সময় যুগোস্লোভিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর সংঘাতের অংশ ছিল ওই আক্রমণ। পরে যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘটনার জন্য ক্ষমা চায়। নিহত চীনা নাগরিকদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণও দেয়। কিন্তু চীনে অনেকে এখনো মনে করেন, ইচ্ছাকৃতভাবেই তাদের দূতাবাসে বোমা ফেলা হয়েছিল। এই ইতিহাসকে সঙ্গী করে ইউরোপের দেশগুলোতে অবস্থান করবেন জিনপিং।
পাঁচ বছর আগেও তিনি ইউরোপ সফরে গিয়েছিলেন। কিন্তু জিনপিংয়ের তখনকার সফর আর এখনকার সফরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তখন ছিল কোভিডের শুরু এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলছিল না অথবা এই যুদ্ধ যে লাগতে পারে সেই ভাবনাও ছিল না। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বে অর্থনীতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কে এসেছে পরিবর্তন। বিশ্বে সম্পর্ক এবং প্রতি সম্পর্ক স্থাপনে এসেছে পরিবর্তন।
রাাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইইউ। ইউক্রেনকে অস্ত্র এবং অর্থ সরবহরাহ করছে প্রতিনিয়ত। বিভিন্ন দেশ চীনের প্রতি নির্ভরতা কমাতে নতুন আইন আনা হয়েছে। আসলে দেশগুলো এখন অনুধাবন করতে পেরেছে যে কোনো দেশের উপর এককভাবে নির্ভর হওয়া ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। ফলে বিকল্প খুঁজছে অথবা নিজ দেশের অভ্যন্তরেই সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। ২০২২ থেকে ইইউ রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু চীন রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। যদিও রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধে মূলত চীন নিরপেক্ষ নীতি নিয়েছে এমনটাই প্রমাণ করতে চাইছে। মাঝে মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ করতেও চেষ্টা চালান। তবে চীনের ভূমিকাকে সবসময় একটু বাঁকা চোখেই দেখা হয় যে আদতে চীন রাশিয়ার উপর পরোক্ষভাবে হলেও কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে এই সফর যে এমনি এমনি নয় বা শুধুই সৌজন্য সাক্ষাৎ নয় সেটাও বলা যায়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চিনের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এদিকে এখনও চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। আপাত ভাবে চিনের প্রেসিডেন্টের ফ্রান্স সফরের উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৬০ বছরপূর্তি। ১৯৬৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ফ্রান্সই ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে চিনকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েছিল। এবছরই সার্বিয়ায় চিনা দূতাবাসে মার্কিন বোমাবর্ষণের ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে। আর ইউরোপের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টায় কিছু স্বার্থও রয়েছে। চীন তাদের মধ্যকার সব ভুল বোঝাবুঝির অবসান করে ইউরোপের দেশগুলোর সাথে ঐতিহাসিক বন্ধুত্বকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে বলেই মনে হয়। যেহেতু চীনা পণ্যের বাজার বিশ্বব্যাপী, সেহতু বাণিজ্যগত গুরুত্বও রয়েছে।
একই সাথে ভিয়েতনামের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিযোগীতায় আসা এই সফরের একটি উদ্দেশ্য ছিল। ফ্রান্স ছাড়া বাকি দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। দেশ দুটিও চীনের প্রতি নমনীয়। আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের সহকারী পরিচালক ম্যাট গেরাসিম বলেছেন, তিনটি লক্ষ্য নিয়ে শি জিনপিং ইউরোপ সফর করছেন। সেগুলো হলো- ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধে চীনের সমর্থনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করা, চীনের বিরুদ্ধে ইইউর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এজেন্ডাকে ভোঁতা করে দেওয়া এবং তার শক্তিশালী অংশীদারদের সাথে বেইজিংয়ের দৃঢ় সম্পর্কেও প্রদর্শন করা।
ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয় বরং এটি এখন অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। এই প্রতিযোগিতায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশ^রাজনীতি হলো গিভ অ্যান্ড টেক নীতি। এখানে উদারনীতি বলে কিছু নেই। রয়েছে সম্পর্ক উন্নয়নের তোড়জোড়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক এমন একটি জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে প্রতিনিয়তই দৃশ্যপট পরিবর্তন হচ্ছে। পরাশক্তিগুলো নতুন করে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা করছে।
যে দেশের কাছে যে স্বার্থসংশ্লিষ্ট জড়িত সেখানেই সম্পর্কের তোড়জোড়। স্বার্থ বহুবিধ হতে পারে। তা আঞ্চলিক সুবিধা আদায় হোক, বাণিজ্য স্বার্থ হোক আর তুলনামূলক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্যই হোক। তাছাড়া রয়েছে ক্ষমতায়নের বিশে^ ক্ষমতা দখলের তোড়জোড়। কে পৃথিবীর মুরুব্বি হয়ে খবরদারি করবে, তার সাথে কোন কোন দেশ থাকবে, তাদের স্বার্থ রক্ষার উপায় কী হবে এসব বিষয়েই আন্তর্জাতিক রাজনীতি গরম হয়ে আছে। বিগত কয়েক বছর ধরেই এই প্রতিযোগীতা চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভেতর। এক্ষেত্রে মার্কিন মুলুকের সাথে ইউরোপের দেশগুলোর সম্পর্ক চীনের থেকেও অনেক বেশি শক্তিশালী।
রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইউরোপ একজোট হয়েই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ফ্রান্স তো সরাসরি ইউক্রেনেনে সেনা পাঠানোর ব্যাপারেও ইঙ্গিত করেছিল। এখানে কিছুটা পিছিয়ে চীন। যদিও চীনের মিত্রতার কাঠামোটা আলাদা। কিন্তু প্রতিযোগিতা রয়েছে। সামরিকায়ন, বাণিজ্য, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রতিযোগীতা দৃশ্যমান। রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জালানি নিয়ে নতুন সমিকরণের যুগে প্রবেশ করেছে পৃথিবী। এবার পরিস্থিতি বিবেচনার বিষয়। এটা এমন একসময় যখন পৃথিবী যুদ্ধ-বিগ্রহ, উদ্বাস্তু এবং বহুরৈখিক সমস্যাগ্রস্ত। এতকিছু বিবেচনায় জিনপিংয়ের ইউরোপ সফর যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে চীনের সাথে ইউরোপের সম্পর্ক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার রাখবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক