
X
দিনভর একের পর এক আহত আসে ঢাকা মেডিকেলে। একপর্যায়ে সংঘাতে আহত ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকেই জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল না, বাকিদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় নতুন ভবনে। জরুরি বিভাগের সামনে ভিড় সামলাতে ঢাকা মেডিকেলে কর্তব্যরত আনসার সদস্যরা বাঁশি বাজিয়ে, লাঠি উঁচিয়ে সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিলেন। অ্যাম্বুলেন্স, সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ট্রাকে করে আসছিলেন আহতরা।
বিকাল সাড়ে ৫টায় লাল রঙের একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুজন মিলে দাঁড়িওয়ালা এক তরুণকে ধরে নিয়ে আসেন। তার বাম পায়ে গুলি লেগেছে, পায়ের হাড় গুঁড়িয়ে গেছে, চামড়ার সঙ্গে কোনো রকমে লেগে রয়েছে পায়ের বাকি অংশটা। প্রচুর রক্ত গেছে, রিকশার পাদানিতে জমাট রক্তের পুকুর যেন।
রিকশায় বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন ওই তরুণ। ঢাকা মেডিকেলের কর্মীরা ছুটে এলেন। টিকেট করতে হবে চিৎকার করে কাউন্টার থেকে একজন জানতে চাইলেন নাম, বয়স। কেউ একজন বললেন, লেখেন নয়ন, বয়স ২৩। ঠিকানা শনির আখড়া। লোকজন ধরাধরি করে কোলে করে নামিয়ে নিয়ে গেলেন নয়নকে। টিকেট নিয়ে পিছু পিছু ছুটলেন একজন।
এভাবে একের পর এক আসতে থাকেন আহতরা। সবারই গুলি না হয় ছররা গুলির আাঘাত। এক পর্যায়ে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের অস্ত্রোপচার কক্ষ (ওসেক), অবজারভেশন রুম, আর নিউরো ইমার্জেন্সি বিভাগে কোনো জায়গা ফাঁকা থাকে না। একেকটা বিছানায় তিনজনকে আড়াআড়ি করে বসিয়ে কোনোরকমে স্যালাইন লাগিয়ে রাখা হয়েছে অবজারভেশন কক্ষে।
সন্ধ্যার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে একযোগে তিনজনকে আনা হলে তাদের মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। জরুরি বিভাগে কোনো জায়গা নেই, ট্রলিরও তীব্র সংকট। তাড়াতাড়ি করে নিহতদের দেহগুলো ট্রলি থেকে নামিয়ে মেঝেতে একপাশে রেখেই ট্রলি ছুটলো আরও আহতদের নিয়ে আসতে।
মেঝেতে লাশের পাশেই আবার স্যালাইন লাগানো অবস্থায় শুয়ে ছিলেন কদমতলী থাকা আসা এক আড়তের শ্রমিক; যার পায়ে, তলপেটে গুলি লেগেছে।
কিছুক্ষণ পর পড়ে থাকা লাশগুলো চাদর দিয়ে ঢেকে বুকে নাম হিসেবে ‘অজানা’ লেখা কাগজ এঁটে নিয়ে যাওয়া হয় মরচুয়ারিতে।
সন্ধ্যার পর ঢাকা মেডিকেল যেন আর আহত মানুষ নিতে পারছিল না। সন্ধ্যার আগে পল্টন থেকে মাথায়, বুকে ছররা গুলি নিয়ে হাসপাতালে আসেন বেসরকারি চ্যানেল ডিবিসির সাংবাদিক মাসুদুর রহমান। তাকে জরুরি বিভাগ থেকে নিউরো ইমার্জেন্সিতে রেফার্ড করেন চিকিৎসকেরা। নিউরো ইমার্জেন্সিতে তাকে বসিয়ে চিকিৎসা দিতে না দিতেই হইচই করে স্ট্রেচারে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হয়।
তারও নাম মাসুদ, বয়স ৫২, মাথার ডান পাশে গুলি লেগে খুব গুরুতর ক্ষত হয়েছে। জ্ঞান নেই, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, খালি ঘড়ঘড় শব্দ আসছে। কক্ষে ঢুকেই প্রচুর বমি করলেন, কেবলই রক্ত বের হল। স্ট্রেচারে রেখেই ডাক্তারেরা গজ নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করলেন। প্রচুর রক্ত যাচ্ছে, তার সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা তার রক্তের গ্রুপও জানেন না। পা থেকে রক্ত টেনে নার্সরা ওই ব্যক্তিকে বয়ে নিয়ে আসা লোকজনকে দিয়ে দিলেন পরীক্ষা করে গ্রুপ জানার জন্য, এরপর রক্তও জোগাড় করতে বললেন।
চিকিৎসক খালিদ সাইফুল্লাহ বলে দিলেন, রোগীর অবস্থা খুবই খারাপ যেকোনো সময় এক্সপায়ার করতে পারেন, দ্রুত রক্ত জোগাড় করতে হবে।
এদিকে সাংবাদিক মাসুদুরের সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দেখে ডাক্তাররা বললেন, ছররা গুলিগুলো ওনার খুলি পর্যন্ত যায়নি। ওষুধ দিলেই সেরে উঠবেন তিনি। পাশের ঘরে গিয়ে ড্রেসিং করে নিতে বললেন।
মাসুদুরকে নিয়ে পাশের ড্রেসিং কক্ষের টুলের ওপর বসাতে না বসাতেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে ছয় বছরের রিয়াকে নিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকলেন তার বাবা-মা। মাথার পেছনে একটা ব্যান্ডেজ কোনোরকমে বেঁধে দিয়েছে সেখানকার কোনো হাসপাতাল।
ডাক্তাররা তাকে সেখানেই শুইয়ে ব্যান্ডেজটা খোলা মাত্রই ‘ইয়া আল্লাহ’ বলে চোখ বুঁজে প্রায় কেঁদে ফেললেন চিকিৎসক খালিদ। শিশুটির মাথার পেছনে গুলি লেগেছে, তাতে কিছু মগজও বেরিয়ে এসেছে। ডাক্তাররা প্রথমেই রক্ত বন্ধ করতে ভালোভাবে ব্যান্ডেজ করার চেষ্টা করতে করতেই বাবাকে ডেকে বললেন রক্ত লাগবে।
শিশুটির বাবা-মা কাঁদতে কাঁদতে চিকিৎসকের পা জড়িয়ে ধরলেন। ডাক্তারও কাঁদো কাঁদো। বললেন, ‘দোয়া করেন, আমরা চেষ্টা করছি’। এই শিশুটিরও রক্তের গ্রুপ জানা নেই। বাবা ছুটলেন রক্তের নমুনা নিয়ে। আর মা সামনের বারান্দায় কেঁদেকেটে লুটিয়ে পড়লেন। তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার লোকটিও নেই। মা বলছিলেন, শিশুটি ছাদে উঠেছিল কাপড় তুলতে। সেখানেই হঠাৎ সে পড়ে যায় দেখে তার বাবা ছুটে গিয়ে দেখেন, মাথার পেছনে রক্তের বন্যা, গুলি লেগেছে।
কারও পেটে গুলি, কারও তলপেটে, কারও বুকে, কারও মাথায়। একের পর এক রিকশা, সিএনজিতে করে আনা হচ্ছে আহতদের। সন্ধ্যা ৬টার কিছু পরে সিএনজি অটোরিকশায় করে এক তরুণকে নিয়ে আসা হলো। আসামাত্রই দৌড়ে ছুটে গেলেন ঢাকা মেডিকেলের কর্মীরা, একজন ছুটে গিয়ে জানতে চাইলেন নাম-বয়স।
বলা হল ওমর ফারুক, বয়স ২৩। নামাতে নামাতেই ঢাকা মেডিকেলের একজন বললেন, “এইডা আর নাই, বুকে গুলি”। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওমর ফারুকের নাম দেখা গেল মর্গের (মৃতদের) রেজিস্ট্রারে। কবি নজরুল কলেজের ইসলামের ইতিহাস তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ওমর ফারুক গুলিবিদ্ধ হন ঢাকার বাজার এলাকায়।
হাসপাতালে রক্তের জোগান দিতে একদল তরুণ হাসপাতালের কর্মীদের সহায়তায় বাইরের অ্যাম্বুলেন্স পার্কিংয়ের জায়গায় ‘রক্তদান কেন্দ্র’ খুলে বসেন। মাইকে আনসার সদস্যরা ও তরুণরা বারবারই সব শ্রেণির মানুষকে রক্ত দানের জন্য আহ্বান করতে থাকেন।
হাসপাতালের প্রাঙ্গণে রক্তদানের আহ্বান জানিয়ে প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা যায় নাজিমউদ্দীন রোড থেকে আসা মুক্তা হিজড়াকে। তিনিসহ কয়েকজন হিজড়া এসেছেন। তার সহযোগী হিজড়ারা প্রত্যেকজনের কাছে গিয়ে রক্ত দিতে বলছেন।