ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অবনতি যেসব অঞ্চলে

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফেনীতে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে হলেও বন্যার পানি সরছে ধীরগতিতে।এই তিন জেলায়

2024-08-27T12:42:14+00:00
2024-08-27T12:42:14+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ফেনীতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও অবনতি যেসব অঞ্চলে
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৪, ১২:৪২ পিএম   (ভিজিট : ১৯০)
X

লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ফেনীতে পরিস্থিতি উন্নতির দিকে হলেও বন্যার পানি সরছে ধীরগতিতে। 

এই তিন জেলায় বন্যাকবলিত প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় সুপেয় পানি ও খাবারের সংকট দেখা দিয়েছে। নৌযানের অভাবে স্বেচ্ছাসেবীরা ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাতে পারছেন না।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত রোববার সকাল ৯টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত লক্ষ্মীপুর জেলায় ৪৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অন্যদিকে নোয়াখালী থেকে রহমতখালী খাল হয়ে বন্যার পানি ঢুকছে লক্ষ্মীপুরে। এতে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। জেলার প্রায় সাত লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। দুর্গত এলাকার প্রায় ২৩ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। অন্যদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ কষ্ট করে বাড়িঘরেই রয়েছে। দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে পর্যাপ্ত নৌকার প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক সুরাইয়া জাহান বলেন, জেলায় বর্তমানে ৭ লাখ ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে ২৩ হাজার ৪০৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৯৪৩ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

উজান থেকে আসা পানির চাপ বাড়তে থাকার পাশাপাশি নতুন করে বৃষ্টির ফলে নোয়াখালীর সার্বিক বন্যা পরিস্থিতিরও অবনতি হয়েছে। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে আটটিতেই বন্যার পানি বেড়েছে। পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে সেনবাগ, বেগমগঞ্জ, সদর, সোনাইমুড়ী ও চাটখিল উপজেলায়। এসব উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোয় সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না বলে জানা গেছে।

নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কেশারপাড় ইউনিয়নে বন্যার পানিতে ডুবে মো. আবদুর রহমান (২) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় বন্যায় পাঁচজনের মৃত্যু হলো।

নোয়াখালী জেলা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ পর্যবেক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, রোববার সকাল নয়টা থেকে গতকাল সোমবার সকাল নয়টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মাইজদীতে ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে আগামী ২৪ ঘণ্টায়ও বৃষ্টি হতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

সেনবাগ উপজেলার উত্তর কাদরা গ্রামের ওছমান গণি বলেন, তাঁদের বাড়ির কাছে কাদরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পাশের একটি মাদ্রাসায় ৫০০ বন্যার্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এত দিন চাঁদা তুলে তাদের দুই বেলা খাবার দিয়েছেন। আর খাবার দেওয়ার মতো টাকাও তাঁদের কাছে নেই। ওই এলাকায় দ্রুত ত্রাণসামগ্রীর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

বন্যা ও বৃষ্টির পানির চাপে গতকাল সকালে ধসে পড়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর স্লুইসগেট (রেগুলেটর)। 

পানি উন্নয়ন বোর্ড, নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী আমির ফয়সাল বলেন, উজান থেকে ধেয়ে আসা পানি ও অতিবৃষ্টির চাপ নিতে না পারার কারণে স্লুইসগেটটি ভেঙে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে তাঁরা ধারণা করছেন। এর ফলে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নাঙ্গলকোট, ফেনী সদর, দাগনভূঞা, সোনাগাজীর একাংশ এবং নোয়াখালীর সেনবাগ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার একাংশে জমে থাকা বন্যার পানি দ্রুত নামতে পারবে। পাশাপাশি সাগরে যখন বেশি জোয়ার হবে, তখন লোনা পানিতে আশপাশের এলাকা প্লাবিত হতে পারে।

ফেনীতে বিশুদ্ধ পানি ও খাবারের সংকট
এবার বন্যায় পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয়েছে ফেনীতে। এখানকার ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম, ফেনী সদর, দাগনভূঞা ও সোনাগাজী—এ ছয় উপজেলা পুরোপুরি বন্যাকবলিত।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পানি কমছে ধীরে ধীরে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়টি উপজেলার প্রত্যন্ত ও দুর্গম গ্রামগুলোয় পানি ও খাবারের সংকট রয়েছে। বিশেষ করে কহুয়া, মুহুরী ও সিলোনিয়া নদী–লাগোয়া গ্রামগুলোয় ঢুকতেই পারছেন না স্বেচ্ছাসেবকেরা। ভারী বর্ষণ ও ভারত থেকে আসা ঢলে এ তিন নদীর পানি গত কয়েক দিন বিপৎসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। গ্রামগুলোর দোতলা ভবন পর্যন্ত ডুবে গেছে।

চট্টগ্রাম থেকে ত্রাণ নিয়ে গতকাল ফেনী গিয়েছিলেন একদল স্বেচ্ছাসেবক। তাঁদের একজন নাফিজ উদ্দিন জানান, তাঁরা ২০০ প্যাকেট শুকনা খাবার নিয়ে গেছেন। কিন্তু নৌকা না পাওয়ায় দুর্গম গ্রামে যেতে পারেননি। তাই হেঁটে যত দূর যেতে পেরেছেন, সেখানেই ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

গতকাল সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুহুরী সেতুতে দাঁড়িয়ে ত্রাণবাহী ট্রাক থামানোর চেষ্টা করছিলেন লস্করহাটের শরিফ মিয়া। তিনি বলেন, পানি বেশি হওয়ায় তাঁদের গ্রামে কেউ ত্রাণ নিয়ে যায়নি। বিশুদ্ধ পানি আর খাবারের জন্য মানুষ হাহাকার করছে।

শোয়াব মিয়া জানান, গত বুধবার বিকেলে পানিতে তলিয়ে যায় পুরো গ্রাম। আটকে পড়ে শ খানেক মানুষ। ছোট দোতলা একটি ভবনের ছাদে তাঁরা ১৮ জন আশ্রয় নেন। গত রোববার তিনিসহ গ্রামের আরও চারজন খাবারের খোঁজে বের হন। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় মুড়ি, চিড়া, মোমবাতি, পানির ২০টি প্যাকেট নিয়ে গেছেন।

ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও থেকে পাঁচজনের একটি দল ত্রাণের জন্য মহিপাল শহরে দুই দিন ঘুরেছেন। তাঁদের গ্রামে পানি অনেক বেশি ছিল। আশ্রয়কেন্দ্র থেকে কেউ বের হতে পারেননি। সেখানে ত্রাণ নিয়েও কেউ যাননি। পানি কমে যাওয়ার পর খাবার খুঁজতে তাঁরা বের হন।

সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী রেগুলেটরের ৮ ও ১২ নম্বর গেটের দুটি দরজা উজানের পানির স্রোতে ভেঙে গেছে। আরও আটটি দরজা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঝুলছে। গতকাল দুপুরে পুলিশ মুহুরী প্রকল্প এলাকা থেকে অজ্ঞাতপরিচয় একজনের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে গেছে।

বন্যায় জেলায় আট লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার। তিনি বলেন, দেড় লাখ মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ১ হাজার ৩০০ টন চাল দেওয়া হয়েছে।

পানি কমছে কুমিল্লা, চট্টগ্রামে
কুমিল্লায় গোমতী নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকাগুলো থেকেও একটু একটু করে পানি নামতে শুরু করেছে। তবে এখনো অনেক মানুষ পানিবন্দী হয়ে আছে। কুমিল্লার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহিম জানান, যেখান থেকে যে তথ্য পাচ্ছেন সেভাবে বন্যাদুর্গতদের জন্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলায়ও পানি কমেছে। ফটিকছড়ির আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষজন বাড়িতে ফিরে গেছে। তবে পানি জমে থাকায় হাটহাজারীর কয়েক শ মানুষ এখনো ঘরে ফিরতে পারেনি।

ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, তাঁর উপজেলায় সাড়ে সাত হাজার কাঁচা বসতঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ৬০০ বসতঘর। সড়ক–মহাসড়কেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়। রাউজানের ইউএনও অংগ্যজাই মারমা বলেন, তাঁর উপজেলায় বাড়িঘরের চেয়ে সড়কের ক্ষতি হয়েছে বেশি।

উপকূলীয় দ্বীপ ও নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হওয়া সুস্পষ্ট লঘুচাপের কারণে প্রচুর মেঘ তৈরি হচ্ছে। মৌসুমি বায়ু দ্রুত শক্তি অর্জন করছে। ফেনী–কুমিল্লার পর এবার দেশের উপকূলের অন্য তিন এলাকা চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনায় ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। 

আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আজ দেশের উপকূলীয় এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে নদ–নদীর পানি বাড়তে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পায়রা ও মোংলা বন্দরকে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। লঘুচাপের প্রভাবে উপকূলীয় দ্বীপ ও নিচু এলাকায় জলোচ্ছ্বাস এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে।





Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy