ঢালাও মামলা: বাদী নিজেও জানে না আসামিদের পরিচয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে।মামলার এজাহারে উল্লিখিত ঘটনাস্থল ও আসামি

2024-08-30T15:48:49+00:00
2024-08-30T16:04:36+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ঢালাও মামলা: বাদী নিজেও জানে না আসামিদের পরিচয়
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৪, ৩:৪৮ পিএম  আপডেট: ৩০.০৮.২০২৪ ৪:০৪ পিএম  (ভিজিট : ২৪১)
X

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। 

মামলার এজাহারে উল্লিখিত ঘটনাস্থল ও আসামি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতদের স্বজনরা। কেউ কেউ মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। অনেকে প্রত্যাহারের কথা ভাবছেন।

অনেক মামলার বাদীর অভিযোগ, তারা এমন এজাহার দেননি, এমনকি তারা জানেন না আসামি কারা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আসামিও চেনেন না বাদীকে। পুরোনো শত্রুতা থেকে কাউকে কাউকে ফাঁসাতে এসব মামলা হয়েছে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাবে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটের বিভিন্ন থানা-আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হুকুমের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে কার গুলিতে নিহত হয়েছে, তা সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

কোনো কোনো মামলায় জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও মামলার বাদীরা এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি।

অধিকাংশ মামলায় নিহতদের স্বজনরা বলছেন, সরকারি সহায়তার কথা বলে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। পরিচিতজনরা মামলার আসামি হওয়ার পর টনক নড়ে বাদীর পরিবারের সদস্যদের। কেউ কেউ আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদনে কোনো নিরপরাধ মানুষকে যেন হয়রানি না করা হয়, সেটি তুলে ধরেছেন।

৪ আগস্ট গোলাপগঞ্জে পৃথক ঘটনায় মারা যান ৭ জন। পৌর এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান ঘোষগাঁওয়ের মোবারক আলীর ছেলে গৌছ উদ্দিন। এ ঘটনায় ২০ আগস্ট থানায় মামলা হয়। মামলার বাদী গৌছ উদ্দিনের ভাতিজা রেজাউল করিম। মামলায় সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদসহ ১৩৫ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আড়াইশ জনকে।

এজাহারে বলা হয়, ঘটনার সময় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা গুলি করেছেন। কিন্তু পুলিশের কোনো সদস্যকে আসামি করা হয়নি। বিষয়টি ফেসবুকের মাধ্যমে মামলার বাদী রেজাউল করিম জানতে পারেন। তিনি মামলা দায়েরের বিষয়টি অস্বীকার করেন বলেন, স্বাক্ষর জাল করে থানায় মামলা দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হয়রানি করা হচ্ছে। 

তিনি মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করবেন। এ ব্যাপারে গৌছ উদ্দিনের বড় ভাই আবুল কালামবলেন, ভাতিজা বাদী হয়ে মামলা করেছে, এমন খবর পেয়ে আমরা হতবাক হয়ে পড়ি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি এক নারী তিন সন্তান ও এক নারী চার সন্তান নিয়ে তাদের বাড়িতে হাজির হয়েছেন। 

তারা জানান, তাদের স্বামীকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাদের জানাই, এ মামলা আমরা করিনি। আমাদের পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের কোনো ক্ষতি হবে না বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়। আবুল কালাম জানান, তাঁর ভাতিজাকে ফুঁসলিয়ে মামলাটি করা হয়েছে। তবে কারা মামলাটি করিয়েছে, তা তিনি বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

৫ আগস্ট বিয়ানীবাজার উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন ভবনে আগুন দেওয়া হয় ও ভাঙচুর করা হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধি হয়ে প্রাণ হারান তিনজন, আহত হন অন্তত ৬০ জন। এদিনের ঘটনায় ২০ আগস্ট থানায় একটি মামলা হয়। এতে প্রবাসী, সাংবাদিক, আওয়ামী লীগের ৭৫ নেতাকর্মী এবং অজ্ঞাত আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়। এতে আশ্চর্য হন মামলার বাদী নিহত তারেকের মা ইনারুন নেছা। 

তিনি বলেন, সাহায্য দেওয়ার নাম করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে মামলা করা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য আদালতে আবেদন করেছেন। মামলার আসামির তালিকায় আছেন বিদেশে অবস্থান করা ৯ জন। আছেন স্থানীয় সাংবাদিকও।

সিলেট নগরীর ক্বিন ব্রিজ এলাকায় ৫ আগস্ট পুলিশের গুলিতে মারা যান পাবেল আহমদ কামরুল। তিনি গোলাপগঞ্জের বাসিন্দা। ঘটনার দিন বিকালে কোতোয়ালি থানার পাশে আলী আমজাদের ঘড়ি ঘরের সামনে পুলিশের গুলিতে তিনি নিহত হন। এ ঘটনার পর ২২ আগস্ট আদালতে মামলা হয়। 

আদালতের নির্দেশে দক্ষিণ সুরমা থানা মামলাটি রেকর্ড করে। এ থানায় মামলা রেকর্ড হলেও ঘটনাস্থল কোতোয়ালি থানার পাশে। ঘটনাস্থল ও আসামি নিয়ে পরিবারের লোকজন প্রশ্ন তুলছে। মামলার বাদী রফিক উদ্দিন গত বুধবার আদালতে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। 

সরকারি সহায়তার কথা বলে কামরুলের ভাই রফিকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভুল তথ্য ও ভুয়া ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে মামলাটি করা হয়েছে। তবে যারা স্বাক্ষর নিয়েছে, তাদের নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন রফিক। ঘটনার প্রকৃত বিবরণ দিয়ে রফিকের ছেলে পিপলু আহমদ বাদী হয়ে আদালতে আরেকটি মামলা করেছেন।

৬৭ জনের নাম উল্লেখ করে গত মঙ্গলবার গোয়াইনঘাটের মাতুরতল ফেনাই গ্রামের বাসিন্দা আব্দুন নুর বিলালের নাম ব্যবহার করে একটি মামলা হয়েছে। ৫ আগস্ট সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্পের সামনে আনন্দ মিছিলে হামলা ও গুলি চালিয়ে বিলালের ছেলে সুমন মিয়াকে হত্যার অভিযোগে আদালতে এ মামলা করা হয়। অথচ এ মামলার বিষয়ে কিছু জানেন না ‘বাদী’ বিলাল। 

মামলায় আসামি করা হয় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ, জেলা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান ইমাম উদ্দিন সাদেক, গোয়াইনঘাট থানার ওসি রফিকুল ইসলামসহ ১৫০ জনকে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় ঘটনা ঘটলেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে দৈনিক বাংলার সিলেট প্রধান ও ইমজার সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেবাশীষ দেবুকে। তাঁর সাংবাদিকতা পেশা গোপন করে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠন উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন পেশার লোকজনকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। এর আগে চ্যানেল আই প্রতিনিধি সাদিকুর রহমান সাকী, সাংবাদিক ওলিউর রহমানসহ অনেককে হয়রানিমূলক মামলায় জড়ানো হয়েছে।   

২০ আগস্ট সিলেট জেলা ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জুবের আহমদকে বাদী দেখিয়ে দায়ের করা একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে ৫ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদলকর্মী রেদোয়ান আহমদকে। মামলায় রেদোয়ানের বড় ভাই আলমাছ আহমদ শুকুরকেও আসামি করা হয়। শুকুর ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের দায়ের করা একটি মামলার আসামি ছিলেন। 

বৃহস্পতিবার খোরশেদ আলম নামের আরেক ব্যক্তির দায়ের করা মামলায়ও শুকুরকে আসামি করা হয়। তবে ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি সাদিকুর রহমান সাদিক বলেছেন মামলার বাদী জুবেরকে তিনি চিনেন না।

সিলেট জেলা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আহমদ চৌধুরী আবজাল বলেন, আন্দোলন ঘিরে হত্যাকাণ্ডে যেসব মামলা হচ্ছে, সেগুলোর এজাহারে অস্পষ্টতা রয়েছে। হত্যা মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েকশ আসামি থাকায় সাধারণ মানুষ হয়রানি হতে পারেন। কেউ যদি মামলা করে আবার প্রত্যাহার করে নেয়, তাতে লাভবান হবে প্রকৃত আসামিরা। 

প্রকৃত আসামি দিয়ে পরে যখন মামলা করা হবে, তখন তারা পুরোনো মামলার কথা বলে বেনিফিট নেবে। এ কারণে মামলা করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকতে হবে, নতুবা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

 এ ব্যাপারে সিলেটের আইনজীবী এমাদ উল্লাহ শহিদুল ইসলাম বলেন, মামলার এজাহারে হত্যার ঘটনার স্পষ্টতা, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য থাকতে হয়। যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো দিয়ে আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা বেঁচে যাবে।





Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy