
X
নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়েছে। দলটির নেতাদের একের পর এক পদত্যাগের ঘটনা শুরুর পর থেকে দলের অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ ও বিভক্তির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, জামায়াতে ইসলামীসহ পুরোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য গঠনের পরেই এনসিপির শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগের পরিমাণ বাড়তে শুরু করেছে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন পদত্যাগ করেছেন, এর মধ্যে রয়েছে দলের মুখপাত্র ও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মুশফিক উস সালেহীন এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীন।
এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলামের বিরুদ্ধে, দলের প্রাথমিক আদর্শ থেকে সরে এসে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনি জোটে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের পর ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দলটির জন্য একটি বড় ধরনের ক্ষতি, যা আগামী নির্বাচনে এনসিপির অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে।
শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ
এনসিপির ভেতরে মতবিরোধ এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রায় অধিকাংশ শীর্ষ নেতাই দল ছেড়েছেন বা দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন। দলের প্রথম সারির নেতা খালেদ সাইফুল্লাহ, যিনি পলিসি ও রিসার্চ উইংয়ের প্রধান ছিলেন, পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র এবং যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর প্রার্থী। তার পদত্যাগের পর এনসিপি থেকে আরও অনেক শীর্ষ নেতার পদত্যাগের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান ও শহীদ পরিবারের হতাশা
এদিকে, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ফারহান ফাইয়াজের বাবা শহিদুল ইসলাম এবং অন্যান্য শহীদ পরিবার সদস্যরা জানিয়েছেন, এনসিপি তাদের আত্মবিশ্বাসকে শূন্য করে ফেলছে। তারা বলছেন, এনসিপি একটি আন্দোলনের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল, কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা তাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী। শহীদ পরিবারের সদস্যরা আরও বলেন, "এনসিপি থেকে নেতারা পদত্যাগ করায় আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।"
আদর্শবিরোধী সিদ্ধান্ত
এনসিপির অনেক নেতার অভিযোগ, দলের কিছু শীর্ষ নেতা নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস ও আদর্শকে উপেক্ষা করে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করেছেন। মুশফিক উস সালেহীন বলেন, "নতুন রাজনৈতিক ধারা ও আদর্শ নিয়ে এনসিপি গঠিত হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে দলটি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সঙ্গে আপস করেছে।"
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কী বলছেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, "এনসিপির ভাঙন এবং পদত্যাগ রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। দলটির নেতারা জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনি সমঝোতায় যুক্ত করার ব্যাখ্যা দিলেও, পদত্যাগকারী নেতারা এ সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।"
এনসিপির ভবিষ্যৎ কী?
এনসিপির নাহিদ ইসলাম ২৮ ডিসেম্বর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "কেউ দলে থাকবে কিনা তা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত," কিন্তু এই বক্তব্যের পর দলের আরও নেতা পদত্যাগ করেছেন। বর্তমানে, এনসিপির শীর্ষ নেতারা দলের ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নিতে না পারলে দলের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে। দলটির নেতাদের ওপর এখন বড় ধরনের দায়িত্ব বর্তেছে, যাতে তারা দলের আদর্শিক ঐক্য বজায় রাখতে সক্ষম হন।
এখন পর্যন্ত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেছেন, এবং আরও অনেকে পদত্যাগের চিন্তা করছেন। এদের মধ্যে তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, ফারহাদ আলম ভূঁইয়া, আরিফ সোহেল, আজাদ খান ভাসানী, আসিফ নেহাল, মীর হাবিব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, মীর আরশাদুল হক এবং খালেদ সাইফুল্লাহ অন্যতম।