
X
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে কারও সম্পদ যেমন শতকোটি টাকার বেশি, তেমনি উল্লেখ করার মতো সম্পদ নেই এমন প্রার্থীও রয়েছেন। দলটির শীর্ষ ধনী প্রার্থী ঢাকা-৭ আসনের মো. এনায়েত উল্লাহ। তাঁর রয়েছে ১১৬ কোটি টাকার সম্পদ। এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় সোয়া পাঁচ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন রাজবাড়ী-২ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ। তিনি এক লাখ ১০ হাজার টাকার একটি মোটরসাইকেলসহ সাকল্যে দুই লাখ টাকার মালিক। আর কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের প্রার্থী রমজান আলী তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৫ হাজার টাকা। মাসে যা দাঁড়ায় মাত্র এক হাজার ২৫০ টাকা!
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এতে আরও দেখা যায়, জামায়াতের ২৭৬ প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ১৪৮ জন চাকরিজীবী। এর মধ্যে অন্তত ৯২ জন শিক্ষক। অন্য পেশার মধ্যে চিকিৎসক রয়েছেন ১৭ জন এবং প্রকৌশলী আটজন। বাকিরা আয়ের উৎস চাকরি লিখলেও পেশা উল্লেখ করেননি। আবার কয়েকজন পেশা হিসেবে চাকরি ও ব্যবসা দুটিই দেখিয়েছেন।
১৭ জন চিকিৎসকের মধ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরসহ কয়েকজন তাদের আয়ের উৎস দেখিয়েছেন ব্যবসা। চাকরিজীবীর বাইরে জামায়াতের অবশিষ্ট প্রার্থীরা ব্যবসায়ী ও আইনজীবী।
হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রার্থীর নামে মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৩টি মামলার তথ্য দিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান। ৭৪টি মামলার তথ্য দিয়েছেন আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। শফিকুর রহমান দিয়েছেন ৩৪টি মামলার তথ্য।
কোটিপতি প্রার্থীরা
জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী প্রার্থী মো. এনায়েত উল্লাহর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১১৬ কোটি টাকার। বার্ষিক আয় পাঁচ কোটি ২৩ লাখ ১১ হাজার টাকা। পরিবারের রয়েছে তিনটি গাড়ি। নিজের আগ্নেয়াস্ত্র শটগান, রিভলবার ও রাইফেল রয়েছে। কৃষিজমি রয়েছে দুই হাজার ৫৪৬ শতক। এ ছাড়াও তাঁর নিজ নামে ১৩ হাজার ৫৪৩ অযুতাংশ অকৃষি জমি আছে। পরিবারের ১১৫ দশমিক ৫ শতাংশ অকৃষি জমি রয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ২২ কোটি ৫৬ লাখ ৪৮ হাজার টাকার ভবন এবং ব্যাংক ঋণ আছে ৮২ কোটি ৮৭ লাখ ৫১ হাজার টাকার। এর পরে সম্পদে এগিয়ে ঢাকা-১৭ আসনের প্রার্থী ডা. স. ম. খালিদুজ্জামানের সম্পদ প্রায় ১০ কোটি টাকা। তাঁর বার্ষিক আয় তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা।
টাঙ্গাইল-১ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফীর সম্পদ প্রায় তিন কোটি ১০ লাখ টাকা। এই প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৬৪ লাখ টাকা। নগদ অর্থ সবচেয়ে বেশি গাজীপুর-১ আসনের প্রার্থী শাহ্ আলম বকশীর। এক কোটি ৩১ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ী মীর কাসেম আলীর ছেলে ঢাকা-১৪ আসনের ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান হলফনামায় ১ কোটি ১৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকার সম্পদের হিসাব দিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের আনোয়ার হোসেন মোল্লা ৭ কোটি ৮৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, মাদারীপুর-১ আসনের মো. সারোয়ার হোসাইন ৪ কোটি, ফরিদপুর-১ আসনের মো. ইলিয়াস মোল্লা ২ কোটি ৫৯ লাখ ৮২ হাজার, ফরিদপুর-৪ আসনের সরোয়ার হোসাইন ২ কোটি ২৪ লাখ ৯০ হাজার, শরীয়তপুর-২ আসনের মাহমুদ হোসেন ২ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩৩ হাজার, কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের আব্দুল হালিম খান ১ কোটি ২৭ লাখ ৮৫ হাজার এবং কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মোছাদ্দেক ভূঞা ১ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন আয়কর রিটার্নে।
ঢাকা-১০ আসনের অ্যাডভোকেট মো. জসীম উদ্দিন সরকারের নগদ অর্থ ৯৮ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। স্বর্ণালংকারে সবচেয়ে এগিয়ে ঢাকা-২ আসনের প্রার্থী সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল হক। নিজের স্বর্ণ আছে ১৪ ভরি ও স্ত্রীর ৮০ ভরি।
এরপর ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মো. আব্দুল বাতেনের নিজের ৩০ ভরি আর স্ত্রীর ২০ ভরি। ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল মান্নান শিক্ষক। তাঁর নিজের ১০ ভরি, স্ত্রীর ৫০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে হলফনামা অনুযায়ী।
ঢাকা-১৮ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ আশরাফুল হক। পেশায় শিক্ষক এ প্রার্থীর চাকরি থেকে বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকা। বাসা ভাড়া থেকে বার্ষিক আয় ১৮ লাখ টাকা।
মাত্র ১৫ হাজার টাকা আয় বছরে
সবচেয়ে কম সম্পদের তথ্য দিয়েছেন রাজবাড়ী-২ আসনে মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ। তিনিও শিক্ষক। হলফনামায় তিনি আয়ের কোনো তথ্য দেননি। তাঁর ব্যাংকে জমা আছে মাত্র সাত হাজার ১১ টাকা। এক লাখ ১০ হাজার টাকার মোটরসাইকেলসহ অন্য অস্থাবর সম্পদের মূল্য দুই লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রীর স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকার সম্পদ থাকার তথ্য দিয়েছেন তিনি।
আর বার্ষিক আয় নেই ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী মো. সাইফুল আলম খান মিলনের। তিনি জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদ্যস্য। তাঁর শেয়ার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানত আছে ১ লাখ টাকার। নিজের নগদ অর্থ আছে ৫ লাখ টাকা। স্ত্রীর নগদ অর্থ আছে ১০ লাখ টাকা। নিজের ব্যাংকে আছে ৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা ও স্ত্রীর আছে ৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের রমজান আলী হলফনামায় তথ্য দিয়েছেন, তাঁর বার্ষিক আয় মাত্র ১৫ হাজার টাকা। তিনি কৃষি খাত থেকে এই আয় দেখিয়েছেন। উত্তরাধিকার এবং রেমিট্যান্স সূত্রে ১০ লাখ টাকা পাওয়ার তথ্য জানিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এ শিক্ষক।
অধিকাংশই শিক্ষক
শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের মুহাম্মাদ আবদুল হামীদ মোল্লা। তাঁর বার্ষিক আয় এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। গোপালগঞ্জ-৩ আসনের এমএম রেজাউল করিমও শিক্ষক। পেশা থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ছয় লাখ ৩৭ হাজার ২৪৫ টাকা।
মাদারীপুর-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মো. সারোয়ার হোসাইন পেশায় শিক্ষক। কৃষি খাত থেকে বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকা; বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্টসহ অন্য স্থাবর সম্পত্তি থেকে পাঁচ লাখ ২৮ হাজার টাকা এবং শিক্ষকতা থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। দেশের বাইরে থেকে আয় ৬০ হাজার টাকা। তাঁর কাছে নগদ অর্থ আড়াই লাখ টাকা এবং তিন লাখ ১৫ হাজার ২৫ হাজার বন্ড আছে। সারোয়ার হোসাইনের নামে ৪৯ শতাংশ জমি, বনশ্রীতে তিন অ্যাপার্টমেন্টসহ চার কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ রয়েছে।
শরীয়তপুর-১ আসনের প্রার্থীর মো. মোশাররফ হোসেন পেশায় শিক্ষক। তিনি অস্থাবর মিলিয়ে ৪৯ লাখ ৬৭ হাজার ৪৪০ টাকার সম্পদ দেখিয়েছেন।
ফরিদপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। তিনি জমাকৃত অর্থ, ২৫ ভরি স্বর্ণালংকার, যানবাহনসহ অন্য খাত থেকে বার্ষিক আয় দুই কোটি ৯৪ লাখ ৮১ হাজার ৭৬০ টাকা আয় দেখিয়েছেন। ফরিদপুর-৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মো. সরোয়ার হোসাইন পেশায় শিক্ষক। কৃষি খাত এবং চাকরি থেকে তাঁর বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৯৮৭ টাকা।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনের মুহা. দেলোয়ার হোসাইন, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের একেএম ফখরুদ্দিন রাজী, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মো. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের মো. মোছাদ্দেক ভূঞাসহ সবাই শিক্ষক।
সিলেটের প্রার্থী ব্যবসায়ী, চট্টগ্রামে শেয়ার ব্যবসা
সিলেট-১ আসনের হাবিবুর রহমান, সিলেট-২ আসনের আব্দুল হান্নান, সিলেট-৩ আসনের লোকমান আহমদ, সিলেট-৪ আসনের জয়নাল আবেদীন, সিলেট-৫ আসনের আনওয়ার হোসাইন এবং সিলেট-৬ আসনের মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ব্যবসায়ী।
মৌলভীবাজার-৩ ও ৪ আসনের প্রার্থীরা আইনজীবী, অন্যরা ব্যবসায়ী। মৌলভীবাজার-১ আসনের আমিনুল ইসলাম এক কোটি ৮০ লাখ টাকার সম্পদের মালিক।
চট্টগ্রামের ১৬ আসনের মধ্যে জামায়াতের ৯ প্রার্থী পেশা দিয়েছেন শেয়ার ব্যবসা। দুজন দিয়েছেন সম্মানী থেকে আয়।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামের আয়ের উৎস ব্যবসা ও অন্যান্য। তাঁর কাছে নগদ সাত লাখ ৯৩ হাজার টাকা রয়েছে। স্থাবর সম্পত্তির মূল্য এক কোটি টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ২৭ লাখ টাকার।
চিকিৎসকদের আয় অন্য খাতে
কুমিল্লা-১১ আসনের প্রার্থী ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ব্যবসা ও সম্মানী থেকে বছরে আয় দেখিয়েছেন ১০ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। ঢাকা-১৫ আসনের জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান কৃষি থেকে আয় দেখিয়েছেন তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা।
কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল হালিম খান বাড়ি ভাড়া, সঞ্চয়পত্র, চিকিৎসা পেশা ও পেনশন থেকে তাঁর বার্ষিক আয় দেখিয়েছেন ১৫ লাখ সাত হাজার ২৩০ টাকা। তাঁর সম্পদের পরিমাণ এক কোটি ২৭ লাখ ৮৫ হাজার ৯৬১ টাকা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের আতাউর রহমান সরকারের পেশা সাংবাদিকতা।