নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ততই বাড়ছে সাইবার অপরাধ ও অপতথ্যের বিস্তার। বিশেষ করে নারী প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ছড়ানো হচ্ছে ভুয়া ছবি, এআই-তৈরি ভিডিও এবং মনগড়া গল্প। এতে নারীদের সম্মান, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
অনলাইনে ভুয়া তথ্যের বিস্তার নিয়ে চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৪হাজার ১৯৫টি ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০৯টি নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট এবং ২ হাজার ২৮১টি রাজনৈতিক অপতথ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নির্বাচনকেন্দ্রিক ছবি, বিকৃত ভিডিও এবং ভিত্তিহীন গল্প ছড়িয়ে নারী প্রার্থীদের সম্মানহানি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে।
ইমাম উদ্দিন নামে একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের নাম ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি ফটোকার্ড ছড়ানো হয়। এর একটিতে দাবি করা হয়, বিকাশে টাকা পাঠানোর জন্য মানুষের ভিড় জমেছে তাসনিম জারার বাড়িতে। একই পেজ থেকে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে দেখানো হয়, ভোটের জন্য নৃত্য করছে জামায়াতের নারীরা। তবে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি।
এছাড়া মিয়া সিমান নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ঝালকাঠি-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী ডা. মাহমুদা মিতু রাতে বাসায় ফেরার পথে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। যাচাইয়ে এই তথ্যের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ভোলা খবর কণ্ঠ নামের একটি পেজ থেকে জুবাঈদা রহমানের নামে একটি এআই-তৈরি ভিডিও ছড়ানো হয়, যেখানে ভোটের বিনিময়ে বিকাশে টাকা দেওয়ার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দেখানো হয়।
এছাড়া মো. মাহমুদ মিরন নামের একটি পেজে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, রাজশাহীর এক যুবদল নেতা এক বৃদ্ধ নারীকে থাপ্পড় দিচ্ছেন। ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে দেখা যায়, ভিডিওটি ভারতের একটি পুরোনো ঘটনার এবং এর সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
এ বিষয়ে রিউমার স্ক্যানারের সিনিয়র ফ্যাক্ট-চেকার তানভীর মাহতাব আবীর বলেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসে, রাজনৈতিক স্বার্থে কিছু রাজনীতিবিদ ও কর্মী পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও সম্মানহানিকর কুৎসিত রাজনীতি শুরু করে।
তিনি আরও বলেন, এআই কনটেন্টে আমরা বেশি শনাক্ত করি রাজনীতিবিদ ও পরিচিত ব্যক্তিদের। তারা যেহেতু পাবলিক ফিগার, স্বাভাবিকভাবে তাদের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার কথা। কিন্তু যদি কোনো ভিডিও বা বক্তব্য ভাইরাল হলেও তা গণমাধ্যমে না পাওয়া যায়, তাহলে সেটি ভুয়া হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ করা উচিত।
এই ডিজিটাল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের মতে, এসব অপপ্রচারের উদ্দেশ্য শুধু ভোটের ফলাফল প্রভাবিত করা নয়; বরং নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আত্মবিশ্বাস এবং জনপরিসরে তাদের উপস্থিতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।
তিনি বলেন, নারীদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ, হেয় প্রতিপন্ন করা কিংবা অ্যাডাল্ট কনটেন্ট ছড়ানোর ফলে প্রথমেই যে ক্ষতিটা হয়, এগুলো তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়।