
X
জনগণের আমানতের টাকা পরিশোধ না করেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী। এ তালিকায় রয়েছেন বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইনের দোহাই দিয়ে দায় এড়াতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এবং আইনের অপব্যবহারেই পার পেয়ে যাচ্ছেন প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড আসন থেকে এমপি পদপ্রার্থী বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা জনগণের প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার ঋণ পরিশোধ না করেও তিনি প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বারবার পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবুও নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন,‘কমিশনের কাছে প্রমাণ থাকার পরও মনোনয়নপত্র বৈধ করা হয়েছে। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন—এটাই বলা হয়েছে।’
নির্বাচন কমিশনের এই অবস্থান নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকের মতে, নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ জরুরি প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে তুলতে না পারলেও বড় ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র যেন উদার ভূমিকা পালন করছে।
প্রশ্ন উঠেছে—প্রতিটি নির্বাচনের আগে ঋণখেলাপি শনাক্তে যে তৎপরতা দেখা যায়, তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় না কেন?
সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল বলেন,‘আদালত অনেক সময় ইকুইটির বিষয়টি বিবেচনায় নেয়। ব্যবসা হঠাৎ বন্ধ হলে কী হবে—সেই বিবেচনায় ১০ শতাংশ পরিশোধের শর্তে সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এই সুযোগই অনেক সময় অপব্যবহার করা হয়।’
উল্লেখ্য, নানা অভিযোগের মধ্যেও এবারের নির্বাচনে মাঠপর্যায়ের রিটার্নিং কর্মকর্তারা ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে ৮২ জন এমপি প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করেছিলেন। পরবর্তীতে আপিল ও আদালতের আদেশে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৪৫ জনে। এর মধ্যে অন্তত ৩০ জন উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে প্রার্থীতা ফিরে পেয়েছেন।
স্থগিতাদেশ পাওয়া ৩০ জন ঋণখেলাপির মধ্যে ১৪ জন বিএনপির প্রার্থী। শুরুতে জামায়াত ইসলামীর দুই প্রার্থী তালিকায় থাকলেও একজন ঋণ পরিশোধ করেন, অন্যজন আদালতের আদেশে বৈধতা পান। নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্না আদালতের আদেশে সুযোগ পান। জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির একজন করে প্রার্থী রয়েছেন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন ১১ জন ঋণখেলাপি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই বড় খেলাপিরা বেরিয়ে যাচ্ছেন। তবে অনিচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে সীমিত সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত রয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,‘ঋণখেলাপি নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের। আবার কেউ কেউ আদালতের রায় নিয়ে আসেন।’
অর্থনীতিবিদ ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন,‘যারা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন, তাদের ক্ষেত্রে কোনো কোনো সময় সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।’
তবে ভিন্নমত পোষণ করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান মুকুল। তার মতে,‘স্টে অর্ডার থাকলেই কেউ ব্যাংকঋণখেলাপি থেকে মুক্ত হয়ে যায় না। এটি সাময়িক সুরক্ষা মাত্র। বিদ্যমান আইনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা আছে—খেলাপিদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার।’
বিশ্লেষকদের মতে, আদালতের স্থগিতাদেশ ও নির্বাচন কমিশনের ছাড় পেলেও ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমেই শেষ সিদ্ধান্ত দেবেন। তারা মনে করেন, জনগণই শেষ পর্যন্ত ঋণখেলাপিদের লাল কার্ড দেখাবে।