বিশ্বাস, সেবা ও ‘ফ্যাক্টর ভোট’-এর ত্রিমুখী লড়াই

বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

রাজনীতি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ হাওরবেষ্টিত হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং–আজমিরীগঞ্জ) আসনে। বাইরে থেকে

2026-02-07T16:18:13+00:00
2026-02-07T16:18:13+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
হবিগঞ্জ-২ আসন
বিশ্বাস, সেবা ও ‘ফ্যাক্টর ভোট’-এর ত্রিমুখী লড়াই
বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৪:১৮ পিএম   (ভিজিট : ১৬৫)
X

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তাপ হাওরবেষ্টিত হবিগঞ্জ-২ (বানিয়াচং–আজমিরীগঞ্জ) আসনে। বাইরে থেকে শান্ত, স্নিগ্ধ গ্রামবাংলার চিরচেনা ছবি দেখা গেলেও ভেতরে ভেতরে জমে উঠেছে ভোটের জটিল এক সমীকরণ। 

চায়ের দোকানের আড্ডা, হাটবাজারের কথাবার্তা, মসজিদের বারান্দা কিংবা সংখ্যালঘু পল্লীর নীরব উঠোন—সবখানেই ঘুরে ফিরে একটাই প্রশ্ন, “এইবার সংসদে যাবে কে?” এই আসন এখন আর শুধু একটি সংসদীয় এলাকা নয়; এটি যেন বিশ্বাস, সেবা, ভয়, আশা ও হিসাবের এক অদৃশ্য মানচিত্র। হাওরের জল যেমন উপর থেকে শান্ত দেখালেও ভেতরে থাকে গভীর স্রোত, তেমনি হবিগঞ্জ-২-এর ভোটের চিত্রও বাইরে থেকে নির্লিপ্ত হলেও ভেতরে প্রবল রাজনৈতিক ঢেউ বয়ে চলেছে।

এবারের নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও গণ-অধিকার জোটের প্রার্থী ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন (ধানের শীষ), ইসলামী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় আমীর মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ (ঘড়ি), জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুল মোক্তাদির চৌধুরী (লাঙ্গল), বাসদের প্রার্থী লোকমান আহমেদ তালুকদার (মই) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সাংবাদিক আফসার আহমেদ রূপক (ফুটবল)। 

যদিও প্রার্থী পাঁচজন, স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে মাঠের বাস্তবতায় লড়াই শেষ পর্যন্ত আবর্তিত হচ্ছে দুই বিপরীত মেরুর দুই চরিত্রকে ঘিরে। এই আসনে মোট ভোটার প্রায় চার লাখ হলেও এবারের নির্বাচনে সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ভোটের প্রকৃতি ও ভোটারের মনস্তত্ত্ব।

একদিকে রয়েছেন মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ‘গরীবের ডাক্তার’ ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, অন্যদিকে বানিয়াচংয়ের ধর্মীয় অঙ্গনে গভীর আস্থার প্রতীক ‘বড় হুজুর’ মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে প্রচারণা রূপ নিয়েছে এক ধরনের নীরব স্নায়ুযুদ্ধে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, পথসভা ও ঘরে ঘরে ভোট প্রার্থনা। অন্য প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় থাকলেও ভোটের হিসাবের দৌড়ে তারা অনেকটাই পিছিয়ে।

বানিয়াচং উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরেই আলেম সমাজ ও ইসলামি দলগুলোর প্রভাব সুদৃঢ়। মসজিদ, কওমি মাদ্রাসা ও ধর্মীয় জলসায় গভীর বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয় ‘বড় হুজুর’-এর নাম। ইসলামি দলগুলোর ঐক্য যদি শেষ পর্যন্ত অটুট থাকে, তবে এই সংগঠিত ভোট ঘড়ি প্রতীকের দিকেই ঝুঁকবে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এক প্রবীণ আলেমের ভাষায়, “মানুষ এখন ধর্মীয় নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা মনে করে, নৈতিকতার প্রশ্নে আলেমরা আপস করেন না।” উল্লেখযোগ্য যে, ২০১৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করা মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ এবার সেই ধানের শীষেরই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী।

অন্যদিকে ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবনের রাজনীতির ভিত্তি গড়ে উঠেছে সেবা ও দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের কাজের ওপর। গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বিনামূল্যের চিকিৎসা ক্যাম্প, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মামলা ও নির্যাতনের মধ্যেও মাঠ না ছাড়ার কারণে তিনি অর্জন করেছেন ব্যতিক্রমী জনপ্রিয়তা। তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ১৪টি মামলার মধ্যে ১৩টিই আদালতে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় অনেক ভোটারের চোখে তিনি হয়ে উঠেছেন নির্যাতিত অথচ দৃঢ়চেতা এক নেতা। বানিয়াচং সদরের এক বৃদ্ধ ভোটারের ভাষায়, “রাজনীতি অনেকেই করে, কিন্তু বিপদে পড়লে ডাক্তারের নামই আগে মনে পড়ে।” গত দেড় দশকে ৪৮৬টি গ্রাম ঘুরে সংগঠন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা তাঁকে সাধারণ মানুষের আরও কাছে এনে দিয়েছে।

এই দুই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারিত হবে শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় নয়, বরং সেই সব ভোটের মাধ্যমে, যেগুলো প্রকাশ্যে কথা বলে না। বিশেষ করে আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোটার রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই ভোট এখন দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। এক সংখ্যালঘু নারী ভোটার আবেগভেজা কণ্ঠে বলেন, “আমরা শুধু চাই নিরাপদে থাকতে। যে আমাদের কথা শুনবে, তাকেই ভোট দেব।” আরেক প্রবীণ ভোটারের মন্তব্য, “এইবার দল দেখি না, কে আমাদের নিরাপত্তা দেবে সেটাই দেখব।”

ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৪৫ থেকে ৪৭ শতাংশ ভোট এখন ‘ফ্যাক্টর ভোট’, যা যেদিকে ঝুঁকবে সেদিকেই ফলাফল নাটকীয়ভাবে পাল্টে যেতে পারে। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর পোস্টাল ভোটও নীরবে গভীর প্রভাব রাখছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এক শিক্ষকের ভাষায়, “এবার মানুষ কম কথা বলছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সিদ্ধান্ত পাকা করছে।”

হবিগঞ্জ-২ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাসও এবারের লড়াইকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১১টি নির্বাচনের মধ্যে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে আটবার, জাতীয় পার্টি দুইবার এবং বিএনপি মাত্র একবার। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে দলটির অনুপস্থিতি এবারের নির্বাচনে পুরো রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দিয়েছে। ফলে প্রায় অর্ধেক ভোট এখন স্থায়ী ঠিকানাহীন অবস্থায় রয়েছে।

এই নির্বাচন তাই আর কেবল দল বনাম দলের লড়াই নয়। এটি বিশ্বাস বনাম সেবা, সংগঠন বনাম আবেগ এবং অতীতের অভ্যাস বনাম ভবিষ্যতের প্রত্যাশার এক গভীর সংঘর্ষ। শেষ পর্যন্ত বড় হুজুরের ধর্মীয় আস্থা, গরীবের ডাক্তারের মানবিক সেবা, সংখ্যালঘু ভোটের দোলাচল ও পোস্টাল ভোটের নীরব সমর্থন এই চার শক্তির যে সমীকরণ তৈরি হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে হবিগঞ্জ-২ আসনের আগামী দিনের রাজনৈতিক পথচলা। শেষ হাসি কে হাসবেন, তা এখনও অজানা। উত্তর লুকিয়ে আছে ব্যালট বাক্সে। হাওরপাড়ের মানুষ তাকিয়ে আছে ইতিহাসের নতুন পাতার দিকে নিঃশব্দে, কিন্তু গভীর প্রত্যাশায়।






Loading...
Loading...


রাজনীতি এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy