প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চাষাবাদে ফিরছেন গাজার কৃষকরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতির মাঝেও গাজার কৃষকরা ফের মাঠে ফিরেছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গ্রিনহাউজ, ক্ষতিগ্রস্ত সেচব্যবস্থা ও বাফার

2026-02-22T19:24:53+00:00
2026-02-22T19:24:53+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে চাষাবাদে ফিরছেন গাজার কৃষকরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:২৪ পিএম   (ভিজিট : ৫৩)
X




ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতির মাঝেও গাজার কৃষকরা ফের মাঠে ফিরেছেন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গ্রিনহাউজ, ক্ষতিগ্রস্ত সেচব্যবস্থা ও বাফার জোনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে ফসল ফলানোয় মন দিয়েছেন তারা। যদিও কয়েকশ মিটার দূরে ট্যাংক ও গুলির শব্দের মধ্যে চাষাবাদ করা মানে প্রতিদিন মৃত্যুঝুঁকি নেয়া। আর ইসরায়েলি অবরোধ, কৃষি সরঞ্জামের সংকট ও অস্থির বাজার পরিস্থিতি আরো কঠিন করে তুলেছে। খবর আল জাজিরা।

গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরু হতেই জেইতুন এলাকার খামারে ছুটে যান ফিলিস্তিনি কৃষক মোহাম্মদ আল-স্লাখি ও তার পরিবার।

মাটির ওপর জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতেই তাদের কয়েক মাস লেগে যায়। যুদ্ধের সময় গাজা শহরের অসংখ্য ভবনের মতো তাদের গ্রিনহাউজগুলোও মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। খুব সীমিত সম্পদ নিয়েই তারা জমি প্রস্তুত করেন এবং লাউজাতীয় সবজি জুকিনি রোপণ করেন। আশা করছেন, বসন্তের শুরুতেই ফসল ঘরে তুলতে পারবেন।

চাষাবাদের এই সীমিত চেষ্টাও ঝুঁকিমুক্ত নয় বলে জানান মোহাম্মদ আল-স্লাখি। নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলেই খেতে কাজ করেন তিনি। কয়েকশ মিটার দূরেই অবস্থান করছে ইসরায়েলি ট্যাংক। গুলির শব্দ শোনাও এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের আগে মোহাম্মদ আল-স্লাখির খামারে বিপুল পরিমাণ সবজি উৎপাদিত হতো। তিনি বলেন, ‘বাবা ও দাদার কাছ থেকে আমি কৃষিকাজ শিখেছি। আমাদের খামারে প্রচুর ও উচ্চমানের ফসল হতো, যা স্থানীয় বাজার ছাড়াও অধিকৃত পশ্চিম তীর ও বিদেশে রফতানি হতো। এখন যুদ্ধ সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছে।’

ফিলিস্তিনি এ কৃষকের ৭ দশমিক ৫ একর গ্রিনহাউজ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ধ্বংস হয়েছে পুরো সেচব্যবস্থা, নয়টি কূপ, দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও দুটি লবণমুক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্র।

ইসরায়েলি হামলায় গাজার অন্য কৃষকরাও মোহাম্মদ আল-স্লাখির মতো ক্ষতির শিকার হয়েছে। গত জুলাইয়ে জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ৮০ শতাংশের বেশি আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৫ শতাংশেরও কম জমি চাষযোগ্য অবস্থায় রয়েছে।

এদিকে ‘যুদ্ধবিরতি’ থাকলেও গাজার সাধারণ মানুষের ক্ষতি থামেনি। বাফার জোন বা নিরাপত্তা অঞ্চল সম্প্রসারণ করছে ইসরায়েল, যেখানে সেনারা অবস্থান করছে।

অনেক ফিলিস্তিনি আশঙ্কা করছেন, বাফার জোন স্থায়ী হলে গাজার কৃষিজমি জোরপূর্বক দখল হয়ে যেতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিসের’ প্রকাশিত নকশায় অনেক কৃষিজমি মুছে ফেলার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

বর্তমানে গাজার প্রায় ৫৮ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে, যা তারা পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ অংশে নিরাপত্তা বাফার জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর বেশির ভাগই ফিলিস্তিনি কৃষিজমি।

যুদ্ধের আগে গাজা সিটিতে ৫৪ একর জমিতে চাষাবাদ করত মোহাম্মদ আল-স্লাখির পরিবার। এখন তিনি মাত্র আড়াই একর জমিতে ফিরতে পেরেছেন। বাকি ২১ হেক্টর বাফার জোনের মধ্যে পড়েছে, যেখানে তার প্রবেশাধিকার নেই।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি ট্যাংক পার্শ্ববর্তী সালাহ আল-দীন সড়কে ঢুকে গুলি চালায়। এতে দুজন ফিলিস্তিনি নিহত ও অন্তত চারজন আহত হন। তখন মোহাম্মদ নিজের জমিতেই ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমরা খেতে কাজ করছিলাম, হঠাৎ একটি ট্যাংক এগিয়ে এসে আমাদের দিকে গুলি চালায়। আমি একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের আড়ালে আশ্রয় নিই এবং দেড় ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে লুকিয়ে থাকার পর পশ্চিম দিকে পালাতে সক্ষম হই।’

মধ্য গাজার দেইর এল-বালাহ এলাকায় ৭৫ বছর বয়সী ঈদ আল-তাবানও একইভাবে শঙ্কিত। তার জমি হলুদ রেখা ও ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধবিরতির পর আমরা উন্মুক্ত মাঠে বেগুন রোপণ করেছি। কিন্তু বাফার জোন সম্প্রসারণের কারণে ফসল কাটতে যেতে পারছি না।’

ঈদ আল-তাবান বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের এলাকায় ইসরায়েলি ভারী মেশিনগানের শব্দ শোনা যায়। আমার ছেলেরা যখন গ্রিনহাউজে সেচ দিতে যায়, আমি শুধু প্রার্থনা করি তারা যেন জীবিত ফিরে আসে।’

পূর্ব দেইর এল-বালাহ এলাকায় জমিতে কাজ করার সময় ৬ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে কৃষক খালেদ বারাকা নিহত হন। তিনি ঈদের প্রতিবেশী ও বন্ধু ছিলেন।

ঈদ আল-তাবান বলেন, ‘খালেদ বারাকা ছিলেন অসাধারণ কৃষক। তিনি সারাজীবন চাষ করেছেন এবং সন্তানদের কৃষিকাজ শিখিয়েছেন।’

ফিলিস্তিনি কৃষকদের মতে, গাজায় ইসরায়েলি অবরোধ তাদের কৃষি পুনরুদ্ধারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে কৃষিযন্ত্র ও সরঞ্জাম প্রবেশে ব্যাপকভাবে বাধা দিয়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে রয়েছে বীজ, কীটনাশক, সার, সেচব্যবস্থা ও ট্র্যাক্টর। ফলে গাজায় কৃষি সরঞ্জামের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। যা পাওয়া যাচ্ছে, তা বোমা হামলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে পড়ছে। সীমিত সরবরাহের কারণে দামও আকাশছোঁয়া।

সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গাজার কৃষকরা হাল ছাড়েননি। কারণ ঘনবসতিপূর্ণ গাজার মানুষের কাছে কৃষিজমি এক ধরনের আশ্রয়। ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ ও অবিরাম যুদ্ধের মাঝেও কিছুটা মুক্তির অনুভূতি দেয়।

মোহাম্মদ আল-স্লাখি বলেন, ‘কৃষিই আমাদের জীবন ও জীবিকা। এটি আমাদের ফিলিস্তিনি পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ধ্বংস আর বিপদের মাঝেও আমরা জমি আঁকড়ে থাকব এবং যতটুকু পারি পুনরায় চাষ করব। আমাদের সন্তানরা আমাদের পর এই কাজ চালিয়ে যাবে।’

ঈদ আল-তাবানের কাছে কৃষিকাজ মানে পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকার বহন করা। ১৯৪৮ সালের নাকবার আগে তার দাদা বীরশেবায় বসবাস করতেন, পেশায় ছিলেন কৃষক। যদিও এখন সেখানে যেতে পারেন না তার উত্তরসূরিরা। ঈদ আল-বাতান বলেন, ‘তিনি আমার বাবাকে শিখিয়েছেন, বাবা আমাকে শিখিয়েছেন, আর এখন আমি আমার নাতি-নাতনিদের কৃষিকাজ শেখাচ্ছি। জমি ও কৃষির প্রতি ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে যায়। আমাদের কাছ থেকে এটি কেউ কেড়ে নিতে পারবে না।’






Loading...
Loading...


আন্তর্জাতিক এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy