রোগের ঝুঁকি কমাতে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য

অনলাইন ডেস্ক

স্বাস্থ্য

বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাস থেকে কিউলেক্স মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করছে। ডিসেম্বর

2026-03-09T11:47:13+00:00
2026-03-10T17:01:40+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
রোগের ঝুঁকি কমাতে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম  আপডেট: ১০.০৩.২০২৬ ৫:০১ পিএম  (ভিজিট : ৯৪)
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকা শহরে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাস থেকে কিউলেক্স মশার উপদ্রব চরম আকার ধারণ করছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারী মাসের তুলনায় বর্তমানে মশার ঘনত্ব ৪০ শতাংশ বেশি । বিশেষজ্ঞরা বলছেন ফেব্রুয়ারী থেকে কিউলেক্স মশা ব্যাপকভাবে বাড়ছে, যা মার্চে আরো ভয়ানক অবস্থা ধারন করবে বলে জানিয়েছেন। 

বর্তমানে ৯৫ শতাংশেরও বেশি কিউলেক্স প্রজাতির মশা। কিউলেক্স মশার বৈজ্ঞানিক নাম (Culex Pipiens) এটি সাধারণত কমন হাউস মাসকিউট বা সাধারন ঘরের মশা নামে পরিচিত। প্রথমেই কিউলেক্স মশাটি দেখতে কেমন তা জেনে নিই । কিউলেক্স (Culex) মশাটি মূলত মাঝারি আকারের (৪-১০ মি.মি.), বাদামী বা ধূসর বর্ণের, লম্বা পা বিশিষ্ট হয়ে থাকে।

কিউলেক্স মশা মূলত ফাইলেরিয়া ( গোদ রোগ), জাপানি এনসেফালাইটিস, ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস, সেন্ট লুইস এনসেফালাইটিস ও এভিয়ান ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়। শীতের শেষে ও বসন্তের শুরুতে (ফেব্রুয়ারী-মার্চ) এদের বংশবৃদ্ধি ও উপদ্রব কয়েকগুন বেড়ে যায়। এরা সাধারণত বদ্ধ স্থানে, দূষিত পানি, ড্রেন, সেপটিক ট্যাংক, জলাশয়, ডোবা-নর্দমায় ডিম পাড়ে। কিউলেক্স মশা সাধারণত সন্ধ্যা থেকে শুরু করে ভোর পর্যন্ত বিশেষ করে গভীর রাতে সবচেয়ে বেশি কামড়ায়। দিনের বেলা এরা ঘর বা ঝোপঝাড়ের অন্ধকারে, ঠান্ডা ও আর্দ্র স্থানে লুকিয়ে থাকে।

 কিউলেক্স ফাইলেরিয়া (গোদ রোগ) ও এনসেফালাইটিসের মতো রোগ ছড়ানোর পাশাপাশি তীব্র চুলকানি ও অ্যালার্জি সৃষ্টি করে। কিউলেক্স মশা সাধারণত সব বয়সের মানুষকে কামড়ায়, নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই রোগের লক্ষণ বেশি দেখা যায়। এছাড়া যারা ৫০ বছরের বেশি বয়সী তাদের মধ্যে সংক্রমনের তীব্রতা বেশি হতে পারে।

কিউলেক্স মশার কামড়ের প্রধান উপসর্গগুলো হলো: জ¦র, মাথাব্যথা, শরীরের অন্যান্য অংশে অস্বাভাবিক ফুলে যাওয়া যেমন (হাত ও পা), কামড়ানো স্থানটি লাল হয়ে ফুলে যায় এবং প্রচন্ড চুলকায়। কামড়ানোর কয়েক মিনিট বা ঘন্টা পর ছোট শক্ত চাকার মতো দাগ হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে মশার লালার কারণে তীব্র অ্যালার্জি  প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যাকে স্কিটার সিনড্রোম বা তীব্র প্রতিক্রিয়া বলে। এতে চামড়া বেশি ফুলে যায়, ফোস্কা পড়তে পারে বা প্রদাহ হতে পারে। অনেক সময় কামড়ানোর স্থান ব্যথাদায়ক হয়ে উঠতে পারে।

কিউলেক্স মশা দ্বারা ছড়ানো প্রধান রোগসমূহ: ফাইলেরিয়া (গোদ রোগ) মূলত লসিকা তন্ত্রের (Lymphatic system) প্রদাহের কারনে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, বিশেষ করে পা ফুলে যায়। এছাড়াও হাত, অন্ডোকোষ, স্তন এবং যৌনাঙ্গ এই রোগে ফুলে যেতে পারে। জাপানিজ এনসেফালাইটিস (Japaness Encephalitis) এটি একটি ভাইরাস জনিত রোগ, মস্তিষ্কে সংক্রমন ঘটায়। ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস (West Nile virus) এতে জ¦র, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তি দেখা দিতে হবে।

সেন্ট লুইস এনসেফালাইটিস (Saint louis Encephalitis) জ¦র, তীব্র মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি এবং ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের টিস্যু ও প্রতিরক্ষামূলক ঝিল্লির প্রদাহ (এনসেফালোমেনজাইটিস) ঘাড় শক্ত, বিভ্রান্তি, মাথা ঘোরা, কাপুনি এবং অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। যদিও বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না তবে বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই রোগ মারাত্বক আকার ধারন করতে পারে।

রোগের ঝুঁকি কমাতে কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রয়ণ অপরিহার্য: ১। বাড়ীর ছাদ, স্কুলের মাঠ, রাস্তার ভাঙ্গা, নবনির্মিত বাড়ীর চারপাশ, বাড়ীর আশেপাশে ড্রেন, ডোবা, নর্দমা পরিষ্কার রাখতে হবে এবং কোনভাবেই পানি বা নোংরা আবর্জনা জমতে দেয়া যাবে না 

২। পুকুর, নদী বা জলাশয়ে কচুরিপানা, শ্যাওলা বা ময়লা জমতে দেয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে এটা ওদের বংশবিস্তারের প্রধান স্থান ৩। বাড়ির আশেপাশে জমে থাকা পানি, জলাশয় বা নর্দমায় লার্ভা মারার জন্য অবশ্যই পরীক্ষিত লার্ভিসাইড বা মশা মারার জন্য কার্যকর স্প্রে ব্যবহার করতে হবে ৪। পরিবারের সকলকে হাতাওয়ালা জামা ও প্যান্ট পরিধান করাতে হবে বিশেষ করে শিশুদের ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বিশেষ সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে ৫। অবশ্যই মশারী ব্যবহার করতে হবে। 

এছাড়া কয়েল, ইলেক্ট্রিক মশা মারার ব্যাট, স্প্রে, অ্যারোমেটিক তেল, ভেপোরাইজার, মাসকিউটো ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে ৬। বাজারে কিছু লোশন বা ক্রীম আছে যেগুলোকে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিরুৎসাহিত করবো তবে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে ।

৭। অব্যবহৃত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র, চিপসের প্যাকেট, জুসের বোতল. ডাবের খোসা যেখানে সেখানে না ফেলাই ভালো। সেখান থেকে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। যত্রতত্র না ফেলে বীনে ফেলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে ৮। বাড়ীর আশেপাশে, ছাদে, বাগান, ঘন ঝোপঝাড় থাকতে দেখা যায় সেখানে নিয়মিত ঝোপঝাড় ছাটা, পরিষ্কার করা ও ফগিং করানো উচিত ৯। পাড়া-মহল্লা গুলোকে স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা সকলের দায়িত্ব।
কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে উড়ন্ত মশা মারার চেয়ে লার্ভা নিধন অনেক বেশি বিজ্ঞানসম্মত এবং সাশ্রয়ী। কিউলেক্স মশা মূলত ড্রেন, ডোবা এবং পচা ও স্থবির পানিতে বংশবিস্তার করে । লার্ভা অবস্থায় তারা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে বলে এদের ধ্বংস করা সহজ এবং এটি পরবর্তী প্রজন্ম তৈরিতে বাধা দেয়। 

লার্ভা নিধন জরুরী কারণ- লার্ভা নিধন করলে মশা আর উড়ন্ত অবস্থায় যেতে পারে না, ফলে রোগের ঝুঁকি শুরুতেই কমে যায় । উড়ন্ত মশা দ্রুত এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু লার্ভা ড্রেন বা ডোবার পানিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যা লক্ষ্য করা সহজ। ফগিং বা স্প্রে করলে শুধু উড়ন্ত মশা সাময়িকভাবে কমে এবং এতে প্রচুর খরচ হয়। লার্ভিসাইড ব্যবহারে প্রায় ৯০% পর্যন্ত খরচ বাঁচানো সম্ভব। 

কিউলেক্স মশার লার্ভা নিধনের কার্যকরী পদ্ধতি: 

১। কিউলেক্স মশা মূলত ময়লা পানিতে ডিম পাড়ে। তাই নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি ২। সরকার কর্তৃক অনুমোদিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ করে লার্ভা ধ্বংস করা যায় ৩। জমে থাকা পানির উপরিভাগে কেরোসিন বা বিশেষ তেল দিলে লার্ভা অক্সিজেন পায় না এবং মারা যায় ৪। ছোট ছোট গর্ত বা জমে থাকা পানিতে ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানি দিলে লার্ভা দ্রুত মারা যায়।

যেকোনো লার্ভিসাইড (লার্ভা নাশক) ব্যবহারের আগে সঠিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ ভুল প্রয়োগ পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে ড্রেন, জলাশয় বা নর্দমাতে লার্ভিসাইড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ বা সংস্থার পরামর্শ নেওয়া উচিত। 

লার্ভিসাইড ব্যবহারের সময় জরুরি সতর্কতা নেয়া প্রয়োজন তা হলো:

 ১। লার্ভিসাইড ব্যবহারের আগে প্যাকেটের গায়ের নির্দেশাবলী এবং ডোজ (মাত্রা) ভালো করে দেখে নিতে হবে ২। পরিবেশবান্ধব লার্ভিসাইড ব্যবহার করতে হবে ৩। পানযোগ্য পানি বা মাছের জলাশয়ে কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের মতামত নিতে হবে। অবশ্যই নিয়মিত মনিটরিং খুব প্রয়োজন।

ফাইলেরিয়া রোগে আক্রান্ত হলে সাধারনত সুষম খাবার যেমন: শাকসবজি, ফলমূল, প্রেটিনযুক্ত খাবার, ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া প্রয়োজন। এছাড়া অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও মসলাযুক্ত খাদ্য না খাওয়াই ভালো। শরীর ফুলে যাওয়ার প্রবণতা থাকলে অতিরিক্ত লবণ না খাওয়াই ভালো। শরীরকে আর্দ্র রাখতে প্রচুর পরিমানে বিশুদ্ধ পানি বা পানীয় খেতে হবে। রাস্তার ধারের খোলা খাবার বা অস্বাস্থ্যকর খাবার সম্পূর্ণ পরিহার করতে হবে। ফাইলেরিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে দেরী না করে অবশ্যই রেজিস্ট্রার্ড ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে হবে।

 ডাঃ সামিনা আরিফ
সহযোগী অধ্যাপক
অধ্যক্ষ-কাম-অধীক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)
বি.ফার্ম (অনার্স), এম.ফার্ম, এমবিএ (এইচআরএম), ডি.এইচ.এম.এস
ফেডারেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা






Loading...
Loading...


স্বাস্থ্য এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy