
X
ফাইল ছবি
বিএনপির যুব অঙ্গসংগঠন যুবদল দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের দেড় বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত না হওয়া এবং ত্যাগী নেতাকর্মীরা বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। বিষয়টি নিয়ে সংগঠনটির ভেতরে-বাইরে অস্বস্তি, হতাশা এবং ক্ষোভ ক্রমেই দৃশ্যমান। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, দায়িত্ব বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। ফলে মহানগর, জেলা ও থানা পর্যায়ে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা পেতে বিলম্বের অভিযোগও তুলেছেন নেতারা।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত যুবদলের ৬ সদস্য বিশিষ্ট বর্তমান আংশিক কমিটির ১ বছর ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এতে সংগঠনের কার্যক্রম মূলত ওই ছয়জন নেতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে, ২০২২ সালের ২২ মেসুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে সভাপতি ও এম মোনায়েম মুন্নাকে সাধারণ সম্পাদক করে ৮ সদস্যের আংশিক কমিটি করে দেয় বিএনপি। এর ৯ মাস পর ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জাতীয়তাবাদী যুবদলের ২৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে অনেকে স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে গ্রেপ্তার, রিমান্ড, মামলা, এমনকি গুমের আতঙ্কের মধ্য দিয়ে সময় পার করেছেন। অনেকে বছরের পর বছর কারাভোগ করেছেন, হারিয়েছেন জীবিকা, পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন থেকেছেন দীর্ঘ সময়। কঠিন সময়ে দলের পক্ষে মাঠে থেকে নানা ঝুঁকি মোকাবিলা করা এসব নেতাকর্মীদের অনেকেই বর্তমান কমিটিতে কোনো পদ-পদবী পাননি।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ও এম মোনায়েম মুন্নার নেতৃত্বাধীন যুব দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করলেও বর্তমানে তারা চরম অবহেলার শিকার হচ্ছেন। সাংগঠনিক কার্যক্রম, সভা-সমাবেশ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের ডাকা হয় না। এছাড়া সংগঠনে কোনো পদ পদবী না থাকায় সাংগঠনিক কোনো কাজেও ডাক পান না তারা। গেল ঈদুল ফেতরের ঈদে যমুনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সর্ব সাধারণের শুভেচ্ছা বিনিময় সাক্ষাতেও যুবদলের আগের কমিটির অনেকে ডাক পাননি। এতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনের ভেতরে এক ধরনের নীরব ক্ষোভও তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আমরা কার্যত পরিচয়বিহীন রাজনীতি করছি। কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা না থাকায় দায়িত্ব স্পষ্ট নয়, ফলে কাজেও গতি নেই। সংগঠনের এই স্থবিরতা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হলে কর্মীদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে যাদের হাতে যুবদলের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তারা নিজেরাই একটি সিন্ডিকেট করে কমিটি আটকে রেখেছে। তাদের নিজস্ব লোক ছাড়া কেউ দাওয়াত পায় না।
এদিকে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, নেতৃত্বের অভাব এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণঙ্গ থাকলে একেক জন একেক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। যুবদল গতিশীল না হওয়ায় বিভিন্ন ইউনিটে সম্মেলন, কমিটি গঠন কিংবা আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে।
যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও খুলনা বিভাগীয় টিমের প্রধান আলী আকবর চুন্নু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বর্তমান নেতারা একটি গুছানো সংগঠনের ওপর বসে আছেন কিন্তু নিজেরা নতুন কিছু করতে পারছেন না। ছাত্রদল থেকে অবসরপ্রাপ্তদের যুবদলে অন্তর্ভুক্ত করার যে সাংগঠনিক নিয়ম, তা বর্তমানে যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে না।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দলের জন্য এত ত্যাগ স্বীকার করা সত্ত্বেও আমার মতো অনেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় কার্ড পর্যন্ত পায়নি।’
জানতে চাইলে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা শাহীন বলেন, ‘আমাদের অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যুবদলের বিষয়ে তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই চূড়ান্ত।’
বর্তমান কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার বিষয়ে জানতে চাইলে যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ ৩ বছর। এসময়ের মধ্যে একটি সুসংগঠিত যুবদল উপহার দিতে আমরা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছি। দীর্ঘদিন আন্দোলন সংগ্রামের ভেতরে থাকায় অনেক জায়গায় কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হলেও নতুন কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। এখন কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার পাশাপাশ ওয়ার্ড থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, মহানগর সব ইউনিটকে ঢেলে সাজানোর কাজ চলমান। আমরা সব ইউনিটকে নতুন করে সাজাতে চাই।’