বোরো উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে ‘ডিজেল সংকট’

মন্তোষ চক্রবর্তী

জাতীয়

বোরো মৌসুমে দেশের কৃষকরা ডিজেল সংকটের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। সেচের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হলে পুরো ফসল নষ্ট

2026-04-02T19:53:39+00:00
2026-04-02T19:53:39+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
বোরো উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে ‘ডিজেল সংকট’
মন্তোষ চক্রবর্তী
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০২৬, ৭:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ৭৪)
ফাইল ছবি
X

ফাইল ছবি

বোরো মৌসুমে দেশের কৃষকরা ডিজেল সংকটের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। সেচের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হলে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন হাওরাঞ্চল থেকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা। বিশেষ করে হাওরাঞ্চল এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষি এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব। সে কারণে ডিজেল সংকট সরাসরি বোরো ধানের উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে সরকার বলছে, ডিজেলের প্রয়োজনীয় মজুদ আছে। সেচে কোনো সংকট হবে না। কাজাখাস্তান থেকে আরও  ডিজেল আমদানি করা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যাুষিত  উপজেলার অষ্টগ্রামের কৃষক মফিজুর রহমান জানান, ডিজেলের দাম সরকার না বাড়ালেও বাজারে ডিজেল পাওয়াও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

এই উপজেলায় তো ডিজেল পাওয়ায় যাচ্ছে না বাধ্য হয়ে পাশ্ববর্তী উপজেলা বাজিতপুর থেকে টুকটাক এনে কাজ চালাচ্ছে। এর ফলে তাদের প্রয়োজনমতো সেচ দিতে সমস্যা হচ্ছে।

তিনি জানান, তার সেচ মেশিনের আওতায় যত জমি আছে, সেগুলোতে সেচ দিতে যা ডিজেল লাগে, তার তুলনায় তিনি অনেক কম তেল পাচ্ছেন। ফলে সেচকাজ অনেকটাই ব্যাহত হচ্ছে। 

একই এলাকার আরেক কৃষক বাদশা মিয়া জানান, এই হাওর এলাকাজুড়ে কোন পাম্প নেই, সেই সাথে নেই কোন বড় ডিজেলের ডিলার টুকটাক খুচরা ডিজেল বিক্রেতারা তাদের আত্মীয় স্বজন এবং কাছের লোকজনদের কাছে ডিজেল বিক্রি করছে তিনি আরো বলেন, হাওরপাড়ের কৃষকেরা এবার অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছে। 

একই জেলার ইটনা উপজেলা কৃষক মোহসিন মিয়া জানান, এর আগে ডিজেলের এত সংকট কখনো তিনি দেখেন নাই, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে বোরো মৌসুমে তারা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের বড় অংশ আসে বিদেশ থেকে। সিঙ্গাপুর ৪১ শতাংশ, মালয়েশিয়া ২৪ শতাংশ, ভারত ১৪ শতাংশ এবং বাকি ২১ শতাংশ আসে অন্যান্য দেশ থেকে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের  তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প আছে। এ সবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। আর বিশেষ করে হাওর এলাকায় ডিজেল ছাড়া সেচ প্রায় অসম্ভব।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রবি মৌসুমে প্রায় ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচনির্ভর ফসলের চাষ হয়। চলতি মৌসুমে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর। এর মধ্যে ৮ মার্চ পর্যন্ত ৪৮ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে। শুধু রংপুর অঞ্চলেই পাঁচ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে, যার ৩৫-৪০ শতাংশ পুরোপুরি ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল।

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ফজেল্লাহ্ পুরের কৃষক  জিতু মিয়া জানান, তিনি ৪ একর জমিতে বোরো ধান রোপণ করেছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত ডিজেল না পাওয়ায় জমিতে সেচ দিতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি জানান, তার এলাকায়সহ প্রায় ৪০-৫০ কিলোমিটার জুড়ে কোনো তেলের পাম্প নেই। খুচরা দোকান থেকে আগে বেশি দামে ডিজেল কিনতেন। খুচরা দোকানে এখন দামও বেড়েছে।

বোরো ধান পুরোপুরি সেচনির্ভর। ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে জমিতে নিয়মিত এক দিন পরপর সেচ দিতে হয়। এলাকাভেদে ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত বোরো ধানের চাষাবাদ হলেও, এই সময়কালই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডিজেল সংকট থাকলে সেচ অনিয়মিত হয়, যা সরাসরি ধানের ফলন হ্রাস করতে পারে।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকরা একই শঙ্কায়। নেত্রকোনা,সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ,  টাঙ্গাইল, রংপুরসহ বেশ কয়েকটি জেলাতে  ডিজেল সংকটে ফসল ঝুঁকিতে রয়েছে বলে একাধিক কৃষকদের সাথে আপলাপকালে তারা জানান, যদি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হয়, তাহলে বোরো মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে এবং মাঠের ফসল নষ্ট হয়ে গেলে অনেক পরিবারকে অনাহারে ও আর্থিক সংকটে পড়তে হবে।

মেইন সেচের যেই সময়টা সেটা আমরা অতিবাহিত করে ফেলেছি আর এবার বৈশাখের আগেই বেশ কয়েকবার  আগাম বৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে সেচের পরিমাণটা কম লাগছে বলে জানান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক  আব্দুর রহিম সাংবাদিকদের কে বলেন, ‘তবুও আমারা মাঠ পর্যায়ে বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করছি। কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

অন্যদিকে ৩০ মার্চ সোমবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব মুনির হোসেন জানান, দেশে এক লাখ ৩৩ হাজার টন ডিজেলের উদ্বৃত্ত মজুত রয়েছে। 

তিনি বলেন, “ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু কার্গো বিলম্বিত হওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে একাধিক ডিজেলের চালান দেশে পৌঁছায়নি, যা সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করেছে।”

জানা গেছে, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজাখস্তান থেকে প্রতি ব্যারেল ৭৬ টাকা দরে ১ লাখ টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সমর্থনের কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার জটিলতা এড়িয়ে এই তেল আমদানির পথ প্রশস্ত হয়েছে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম ৯০ থেকে ১১৫ ডলার।

সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক নাসরুল আনোয়ার মনে করেন, সরকার বলছে জ্বালানি তেলের ঘাটতি নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, কৃষক তার জমিতে সেচের জন্য জ্বালানি তেল বিশেষ করে ডিজেল সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। আসলে মজুদদাররা তেল মজুদ রেখে সৃষ্টি করেছে কৃত্রিম সংকটের। এরকম পরিস্থিতিতে দেড়গুণ এমনকি কোথাও কোথাও প্রায় দ্বিগুণ মূল্যে তাদের ডিজেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। ফলে বোরো চাষাবাদ মৌসুমের শেষে এসে হাওরের কৃষক হোচট খাচ্ছে। এতে ফলনে কিছুটা হলেও বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং কৃষক ক্ষতির শিকার বলে মনে আমি করি। 

গত ৩০ মার্চ বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন জ্বালানি তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের মজুদ ছিল ২ লাখ ৬ হাজার মেট্রিক টন। আর আজ (৩০ মার্চ) ডিজেলের মজুদ ২ লাখ ১৮ হাজার মেট্রিক টন।

তিনি বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত ৪১ দিনে ডিজেল বিক্রি হয়েছে ৪ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন। এই বিপুল সরবরাহের পরও মজুদ বৃদ্ধি পাওয়া প্রমাণ করে যে, সরকার আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ধারাবাহিক আমদানি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা দৃঢ়ভাবে অব্যাহত রেখেছে।

কিশোরগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিক মোস্তফা কামাল বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে মুখ্য ভূমিকা পালন করে বোরো ধান। আর বোরো আবাদের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ সেচ।  আর অধিকাংশ সেচযন্ত্র চলে ডিজেলে। এখন কৃষকরা হন্যে হয়ে ঘুরছেন, ডিজেল পাচ্ছেন না। জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে এবারের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হব।





Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy