বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে, সচেতনতায় মিলতে পারে সমাধান

চৌধুরী তানভীর আহম্মেদ:

লাইফস্টাইল

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদের হার সমাজের জন্য এক নীরব সংকেত হয়ে উঠছে। নগরজীবনের চাপ, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং পারস্পরিক

2026-04-19T18:30:26+00:00
2026-04-19T18:30:26+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
বিবাহবিচ্ছেদ বাড়ছে, সচেতনতায় মিলতে পারে সমাধান
চৌধুরী তানভীর আহম্মেদ:
প্রকাশ: রোববার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৬:৩০ পিএম   (ভিজিট : ৭২)
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বিবাহবিচ্ছেদের হার সমাজের জন্য এক নীরব সংকেত হয়ে উঠছে। নগরজীবনের চাপ, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ঘাটতি সব মিলিয়ে দাম্পত্য সম্পর্কে ফাটল ধরছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে এই প্রবণতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে পরিবার বরাবরই একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিবাহবিচ্ছেদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এই ভিত্তি কিছুটা নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনধারা এবং ব্যস্ততা সম্পর্কের গভীরতা কমিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ দাম্পত্য ভাঙনের পেছনে রয়েছে পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভাব। বিয়ের আগে ছেলে-মেয়ের মধ্যে পর্যাপ্ত আলোচনা বা মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে পরবর্তীতে ছোটখাটো বিষয়ও বড় দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। তাই বিবাহের আগে পারস্পরিক মূল্যবোধ, জীবনধারা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা অত্যন্ত জরুরি।

দাম্পত্য জীবনে যোগাযোগের ঘাটতি একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। অনেক দম্পতি নিজেদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন না, ফলে ভুল বোঝাবুঝি জমতে জমতে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ে। তাই মনে রাখার দরকার, নিয়মিত আন্তরিক কথোপকথন ও অনুভূতির প্রকাশ সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে।

অন্যদিকে, পারিবারিক হস্তক্ষেপও অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যৌথ পরিবারে ব্যক্তিগত পরিসরের অভাব কিংবা শ্বশুরবাড়ির অতিরিক্ত চাপ সম্পর্ককে দুর্বল করে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সীমারেখা নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অর্থনৈতিক চাপও বিবাহবিচ্ছেদের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে, যা দাম্পত্য সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই সুষ্ঠু আর্থিক পরিকল্পনা ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানীরা আরও বলেন, নারী-পুরুষের ভূমিকার পরিবর্তনও সম্পর্কের নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। নারীরা এখন শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমানভাবে অংশগ্রহণ করছেন, ফলে পারিবারিক দায়িত্ব ভাগাভাগির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার অভাব থাকলে দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টিও এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। ব্যক্তিগত হতাশা, উদ্বেগ বা মানসিক চাপ দাম্পত্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। এ কারণে প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিং বা বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চাও দাম্পত্য জীবনকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মান এই গুণগুলো সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে।

আইনি সচেতনতার অভাবও অনেক সময় হঠাৎ বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। তাই বিবাহ ও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি, যাতে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকা যায়।

সবশেষে, সন্তানদের ভবিষ্যতের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিবাহবিচ্ছেদের ফলে শিশুদের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই সন্তানের কল্যাণে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা উচিত যদিও তা কোনোভাবেই নির্যাতন বা অমানবিক পরিস্থিতিকে সহ্য করার কারণ হতে পারে না।

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবি এ্যাডভোকেট জিয়াউল হক চৌধুরী বাবু বলেন- “বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ শুধুমাত্র একটি সামাজিক ইস্যু নয়, এটি একটি আইনগত প্রক্রিয়াও, যা নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে হয়। বিশেষ করে Muslim Family Laws Ordinance, 1961 অনুযায়ী, স্বামী কর্তৃক তালাক প্রদান বা স্ত্রীর খোলা (divorce) কার্যকর হওয়ার আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। আইন অনুযায়ী তালাক কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ বা সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে একটি সালিশি (Arbitration) প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যার উদ্দেশ্য হলো দাম্পত্য সম্পর্ক রক্ষা করা। অর্থাৎ, আইন নিজেই বিবাহবিচ্ছেদ নিরুৎসাহিত করে এবং পুনর্মিলনের সুযোগ সৃষ্টি করে।
এছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তাৎক্ষণিক বা আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্তে তালাক দেয়া হয়, যা পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি করে। তাই বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে, যদি দাম্পত্য জীবনে নির্যাতন, অমানবিক আচরণ বা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয় থাকে, তাহলে Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939 অনুযায়ী স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বৈধভাবে বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন। ফলে ‘সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা’ কখনোই নির্যাতন সহ্য করার সমার্থক হতে পারে না।

সন্তানের কল্যাণের বিষয়টিও আইনের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে Family Courts Ordinance, 1985 অনুযায়ী অভিভাবকত্ব, ভরণপোষণ ও হেফাজতের বিষয়গুলো আদালত সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে নির্ধারণ করে। সর্বোপরি, বিবাহবিচ্ছেদ রোধে শুধু সামাজিক নয়, আইনি কাঠামোর সঠিক প্রয়োগ, প্রি-ম্যারিটাল কাউন্সেলিং এবং সালিশি ব্যবস্থাকে কার্যকর করা অত্যন্ত প্রয়োজন।” পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক সহনশীলতা এবং সামাজিক উদ্যোগের সমন্বয়েই এ সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব। দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও বোঝাপড়ার চর্চাই পারে একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল পরিবার গড়ে তুলতে।





Loading...
Loading...


লাইফস্টাইল এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy