
X
প্রতীকী ছবি
বর্তমান সময়ে নীরবে কিন্তু ভয়ংকরভাবে বাড়ছে মুখ ও গলার ক্যানসারের প্রকোপ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে সাধারণত ওরাল ও থ্রোট ক্যানসার বলা হয়, যা মুখগহ্বরের ক্যানসার এবং গলার ক্যানসার এই দুই ধরনের রোগের অন্তর্ভুক্ত। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই ক্যানসারগুলোর বড় অংশই আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতার অভাব, ক্ষতিকর অভ্যাস এবং দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়াই এই রোগকে আরও জটিল করে তুলছে।
কেন বাড়ছে এই ঝুঁকি?
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মুখ ও গলার ক্যানসারের হার তুলনামূলক বেশি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো জীবনযাত্রার কিছু ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস, যা অনেকেই সাধারণ বিষয় বলে মনে করেন।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার। ধূমপান যেমন সিগারেট, বিড়ি বা পাইপের মাধ্যমে ক্ষতি করে, তেমনি জর্দা, গুল, সাদাপাতা, পান-সুপারির সঙ্গে তামাক গ্রহণও সমানভাবে বিপজ্জনক। নিয়মিত তামাক ব্যবহার মুখের ভেতরের কোষগুলোর পরিবর্তন ঘটায়, যা ধীরে ধীরে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।
অ্যালকোহল গ্রহণও একটি বড় ঝুঁকির কারণ। যারা নিয়মিত মদ্যপান করেন এবং একই সঙ্গে ধূমপান করেন, তাদের ক্ষেত্রে ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব মুখ ও গলার কোষের ওপর মারাত্মক ক্ষতি করে।
রোজকার যে অভ্যাসগুলো ঝুঁকি বাড়াচ্ছে:
অনেকেই মনে করেন ক্যানসার হঠাৎ করেই হয়। কিন্তু বাস্তবে, দীর্ঘদিনের কিছু অভ্যাসই ধীরে ধীরে শরীরকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়।
১. অপরিষ্কার মুখগহ্বর; দাঁত ও মুখ পরিষ্কার না রাখলে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে মুখে ঘা বা ইনফেকশন থাকলে তা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, প্রক্রিয়াজাত খাবার, কম ফল ও শাকসবজি খাওয়া—এসব অভ্যাস শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ভিটামিন এ, সি ও ই-এর অভাব মুখগহ্বরের কোষকে দুর্বল করে তোলে।
৩. অতিরিক্ত গরম খাবার খাওয়া: খুব গরম চা বা খাবার নিয়মিত খেলে মুখ ও গলার ভেতরের নরম টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
৪. মুখে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা ঘা অবহেলা করা: মুখে কোনো ঘা বা আলসার যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে থাকে, তাহলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
৫. মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণ: বিশেষ করে গলার ক্যানসারের ক্ষেত্রে HPV একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি সাধারণত অনিরাপদ যৌন আচরণের মাধ্যমে ছড়ায়।
লক্ষণগুলো কী কী?
মুখ ও গলার ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে খুব একটা লক্ষণ প্রকাশ করে না। ফলে অনেকেই দেরিতে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ আছে, যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি-
মুখে বা জিহ্বায় দীর্ঘদিনের ঘা, গিলতে সমস্যা বা ব্যথা, গলায় কিছু আটকে থাকার অনুভূতি, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন বা ভাঙা গলা, মুখে সাদা বা লাল দাগ, চোয়াল বা ঘাড়ে অস্বাভাবিক ফোলা, এই লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দীর্ঘদিন থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
দেরিতে ধরা পড়লে কী হয়?
এই ধরনের ক্যানসারের বড় সমস্যা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটি ধরা পড়ে দেরিতে। তখন চিকিৎসা জটিল হয়ে যায় এবং রোগীর জীবনঝুঁকি বেড়ে যায়।
প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কিন্তু দেরিতে শনাক্ত হলে অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির মতো জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
প্রতিরোধের উপায় কী?
সুখবর হলো, এই ক্যানসারের একটি বড় অংশ প্রতিরোধযোগ্য। কিছু সচেতনতা ও অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
তামাক বর্জন: ধূমপান ও তামাকজাত সব ধরনের পণ্য সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অ্যালকোহল নিয়ন্ত্রণ: মদ্যপান থেকে বিরত থাকা বা সীমিত রাখা উচিত।
মুখের যত্ন: নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা, ডেন্টাল চেকআপ করা এবং মুখ পরিষ্কার রাখা জরুরি।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: প্রচুর ফল, সবজি ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: মুখে বা গলায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।
HPV প্রতিরোধ: নিরাপদ আচরণ ও প্রয়োজনীয় টিকা গ্রহণ ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
সচেতনতা কেন জরুরি?
বাংলাদেশে এখনও অনেক মানুষ ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে অবগত নন। ফলে রোগটি যখন ধরা পড়ে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়। চিকিৎসকরা বলছেন, গণসচেতনতা বাড়ানোই এই সমস্যার অন্যতম সমাধান।
স্কুল, কলেজ, কর্মক্ষেত্র- সব জায়গায় স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমেও নিয়মিত এ বিষয়ে প্রচার প্রয়োজন। মুখ ও গলার ক্যানসার কোনো হঠাৎ হওয়া রোগ নয় এটি আমাদেরই তৈরি করা ঝুঁকির ফল। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই ধীরে ধীরে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই এখনই সময় সচেতন হওয়ার। ক্ষতিকর অভ্যাস ত্যাগ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রাথমিক লক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে এই মারাত্মক রোগ থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।