
X
প্রায় চার বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেই মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত খেললেন ক্যারিয়ার সেরা ইনিংস।
মিরপুরে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে শুরুর দিকে দ্রুত তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়েছিল স্বাগিতক বাংলাদেশ দল। তবে মিডল অর্ডারে তাওহিদ হৃদয় ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত দলকে টেনে তোলার চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যাটে ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরছে স্বাগতিকরা। দীর্ঘ প্রায় চার বছর পর জাতীয় দলে ফিরে ফিফটির দেখা পেয়েছেন মোসাদ্দেক।
ফিফটি পেরোনোর পর মাঠে প্রায় সব দর্শকেরই করতালি পেলেন মোসাদ্দেক হোসেন। তখনো অবশ্য তার কাঁধে দায়িত্ব ছিল অনেক। তবু মোসাদ্দেক ততক্ষণ পর্যন্ত যা করেছেন, তা-ই বা কম কী! মাঝে বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে একরকম বিস্মৃতই হয়ে পড়েছিলেন। খোদ প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুও বলে দিয়েছিলেন, মেহেদী হাসান মিরাজ থাকতে দলে সুযোগ নেই তার। তবু মোসাদ্দেক হাল ছাড়েননি।
ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে গেছেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের চলতি মৌসুমে আবাহনীর হয়ে ৭ ইনিংসে ৬৭.৩৩ গড় ও ১৩৩.৩৩ স্ট্রাইক রেটে ৩৩৬ রান করেন মোসাদ্দেক। বল হাতেও নেন ১২ উইকেট। মিরাজের অধিনায়কত্বেই মঙ্গলবার প্রায় ৪ বছর পর ওয়ানডেতে ফিরলেন মোসাদ্দেক। এই প্রত্যাবর্তনকে রঙিনও করলেন আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ক্যারিয়ার-সেরা ইনিংসে। ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজে ২৭ বলে ৫২ রান ছিল এতদিন তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ।
এদিন টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে সাইফ হাসান ও তানজিদ তামিমের বিদায়ের পর জুটি বাঁধেন লিটন দাস ও নাজমুল হোসেন শান্ত। তবে ২২তম ওভারে লিটন আউট হন। ম্যাট রেনশর বলে ব্যাটের ভেতরের দিকে লেগে সহজ ক্যাচ দেন লিটন। রেনশ নিজেই দারুণ ক্যাচটি তালুবন্দি করেন। মাত্র ৭ রান যোগ করেন তিনি।
এরপর ২৬তম ওভারে নাজমুল হোসেন শান্ত বড় শট খেলতে গিয়ে উইকেট বিলিয়ে দেন। অফ স্টাম্পের বল মারতে গিয়ে টাইমিং মিস করেন তিনি। কুপার কনোলির হাতে সহজ ক্যাচ তুলে দেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। ৮৬ বলে ৬৭ রান করেন শান্ত। প্রায় ৪ বছর পর জাতীয় দলে ফেরা মোসাদ্দেক ও হৃদয় এরপর জুটি গড়েন। ৩২তম ওভারে রেনশর বলে জীবন পান মোসাদ্দেক। ক্যাচ তালুবন্দি করতে পারেননি কুপার কনোলি। সেই সময় মোসাদ্দেক ছিলেন ২১ রানে।
ধীরে ধীরে চাপ সামলে জুটি গড়েন সৈকত-হৃদয়। ৩৪তম ওভারে তাদের জুটিতে ৫০ বলে ৫০ রান আসে। তবে ব্যক্তিগত ৩১ রানে ন্যাথান এলিসের বলে আউট হন হৃদয়। সহজ ক্যাচ তোলেন বার্টলেট। হৃদয় ফিরে গেলেও ফিফটির দেখা পান মোসাদ্দেক। দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের বাহিরে থেকে ফিরেই নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন এই ডানহাতি। ওয়ানডেতে এটা তার চতুর্থ অর্ধশতক।
মোসাদ্দেকের ফিফটির আনন্দ উদযাপনের আগেই ফিরতে হয় অপরপ্রান্তে থাকা মেহেদী হাসান মিরাজকে। রিভিউ নিয়েও রক্ষা হয়নি। স্কটের বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে পড়ে বিদায় নেওয়ার আগে মিরাজের ব্যাট থেকে আসে মাত্র ৩ রান। ৫ রান করে ফিরেছেন লোয়ার অর্ডার ব্যাটার তানভির ইসলাম।
মঙ্গলবার নাজমুল হোসেন আউট হওয়ার পর তিনি যখন উইকেটে যান, তখন দল ২৫.৩ ওভারে ১৪০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে। ৩৪ রানের মধ্যে পড়েছিল ৩ উইকেট। আর সেখান থেকে তাওহিদ হৃদয়কে সঙ্গে নিয়ে দলকে টেনে তোলার কাজটা শুরু করেন মোসাদ্দেক। তার সঙ্গী হৃদয় অবশ্য খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন না— ৫১ বলের ইনিংসে ৩১ রান করার পথে তাঁর ব্যাটে বাউন্ডারি ছিল কেবল একটি।
আরেকপ্রান্তে মোসাদ্দেক বাউন্ডারিতে রানের চাকা সচল রাখেন। হৃদয় আউট হওয়ার পর ৪৯ বলে পেয়ে যান ফিফটি। এরপর দায়িত্বটা আরও বেড়ে গিয়েছিল মোসাদ্দেকের জন্য। কারণ ১২ বলে ৩ রান করে তাঁর ফিফটির পরের বলেই আউট হয়ে যান অধিনায়ক মিরাজ।
একদিকে উইকেট বাঁচিয়ে পুরো ৫০ ওভার খেলতে হবে, সমান তালে তুলতে হবে রানও। কাজটা ভালোভাবেই করেছেন মোসাদ্দেক। ফিফটি পাওয়ার পরের ওভারেই অ্যাডাম জাম্পাকে টানা তিন বলে বাউন্ডারি মারেন। তাসকিনকে সঙ্গে নিয়ে পুরো ৫০ ওভার পর্যন্তই টেনে নিয়েছেন বাংলাদেশের ইনিংস। মিডল অর্ডারের বাকি ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় দলের রান তিন শ না পেরোলেও ৮ উইকেটে থেমেছে ২৮৪ রানে। ৭০ বলের ইনিংসে ৭ চার ও ৩ ছক্কায় মোসাদ্দেক অপরাজিত থেকেছেন ৮৬ রান করে।
৬-৭ এ ব্যাট করবেন, সঙ্গে করতে পারবেন বোলিং- এমন একজন ক্রিকেটারের খোঁজ বাংলাদেশ করছে অনেকদিন ধরেই। সর্বশেষ দুটি সিরিজে সেই চেষ্টা হয়েছিল আফিফ হোসেনকে দিয়ে। তবে তার ব্যর্থতার পর দুশ্চিন্তা বেড়ে যায় বাংলাদেশের। বিকল্প খুঁজতে খুঁজতে নির্বাচকরা আস্থা রাখেন মোসাদ্দেকের ওপর। প্রথম ম্যাচেই অন্তত ব্যাট হাতে প্রতিদান দিয়েছেন তিনি। এখন বোলিংয়ে কী করেন, সেটিই দেখার। একজন অলরাউন্ডার যে এই দলে ভীষণ দরকার!