
X
প্রতীকী ছবি
যান্ত্রিক এই ব্যস্ত শহরে মানুষের জীবন যখন ঘড়ির কাঁটায় বন্দি, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘লাইক-কমেন্ট’ আর কৃত্রিম চ্যাটিংয়ের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে আবেগের আদিম গভীরতা, ঠিক তখনই কিছু অনুভূতি আমাদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। মনে করিয়ে দেয় ভালোবাসার প্রকৃত রূপকে।
কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সেই বিখ্যাত পঙক্তি “হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে, মন বাড়িয়ে ছুঁই...” যেন আজকের এই গতিময় যুগে এসে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, আরও বেশি আকুলতায় ভরা। শারীরিক দূরত্বের দেয়াল ভেঙে কীভাবে কেবল তীব্র অনুভূতির জোরে দুটি মানুষ একে অপরের অস্তিত্বকে অবিরাম ছুঁয়ে যেতে পারে, তা সত্যিই এক পরম বিস্ময়।
আধুনিক সময়ে সম্পর্কগুলো যেখানে প্রায়শই দৃশ্যমান উপস্থিতি, নিয়মিত দেখা করা আর জাগতিক আদান-প্রদানের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে, সেখানে এক নীরব ও পবিত্র ভালোবাসার সমান্তরাল গল্প প্রতিনিয়ত রচিত হচ্ছে আমাদের চারপাশে। এই অনুভূতি কোনো বাহ্যিক স্পর্শের অপেক্ষা রাখে না, কোনো ভৌগোলিক সীমানার কাছে হার মানে না। এটি এমন এক অদৃশ্য টান, যা শরীরের স্পর্শ পেরিয়ে সরাসরি আঘাত করে আত্মার গভীরে। জীবনের প্রয়োজনে কিংবা নিয়তির কোনো অদ্ভুত নিয়মে প্রিয় মানুষটি হয়তো আজ মাইলের পর মাইল দূরে অবস্থান করছে, কিন্তু মনের অতল কোণে তার আসনটি রয়ে গেছে একদম অটুট, অবিকল।
রাতের নিঝুম নীরবতায় যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, যখন জানালার বাইরে আকাশের একলা চাঁদটা রূপোলি আলো ছড়ায়, ঠিক তখনই মন বাড়ানোর এই খেলাটা শুরু হয়। চোখ বন্ধ করলেই অনুভূতির ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে ওঠে প্রিয় মুখটি। এক কাপ চা হাতে নির্জন বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, কিংবা বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দে প্রিয় মানুষের চেনা কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়া এ সবই তো মন বাড়িয়ে ছুঁয়ে যাওয়ার একেকটি অনবদ্য রূপ। এই ছোঁয়া কোনো জাগতিক বা শারীরিক স্পর্শের চেয়েও অনেক বেশি তীব্র, অনেক বেশি নিবিড়। এতে কোনো ক্লান্তি নেই, নেই কোনো মলিনতা।
মনোবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দূরত্ব কখনো সত্যিকারের ভালোবাসাকে ম্লান করে না; বরং তা অনুভূতিগুলোকে আরও বেশি পরিপক্ব, খাঁটি ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। হাত বাড়িয়ে কাউকে ছুঁতে না পারার যে ব্যাকুলতা, তা-ই মূলত মন বাড়িয়ে ছোঁয়ার আকুলতাকে এক রাজকীয় রূপ দেয়। এটি এক প্রকার আত্মিক সাধনা, যেখানে ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়ার চেয়ে তার ভালো থাকা এবং তাকে মনে মনে অনুভব করাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়ায়।
দূর আকাশের ওই মায়াবী চাঁদের মতোই সুন্দর এই অনুভূতি যাকে হাত দিয়ে স্পর্শ করা যায় না সত্য, কিন্তু মন বাড়িয়ে তার আলোয় নিজের পুরো অস্তিত্বকে ভিজিয়ে নেওয়া যায় অনায়াসে।
আজকের এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে যেখানে স্পর্শের সংজ্ঞা প্রায়শই শরীরী সীমানায় আটকে যায়, সেখানে ‘মন বাড়িয়ে ছোঁয়া’র এই শাশ্বত দর্শন আমাদের শেখায় কীভাবে ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় কেবল অটুট বিশ্বাস আর অনুভবের ওপর ভর করে। দিনশেষে, সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখতে শরীরের চেয়ে মনের দূরত্বের অবসান ঘটানোই সবচেয়ে বেশি জরুরি।
তাই হাতের নাগাল থেকে দূরে থেকেও যারা হৃদয়ের খুব গভীরে চিরস্থায়ী রাজত্ব করে যান, তাদের জন্য এই এক লাইনের অনুভূতিই এক পরম আশ্রয়। ভালোবাসা তো আসলে সেটাই, যা কোনো দূরত্ব বা মহাকালের পরোয়া না করে মনের টানে সবসময় অমলিন, চিরসবুজ আর জীবন্ত থাকে।