মরুভূমিতে সুঁই খোঁজার মতো এক হত্যার রহস্য উন্মোচন

অনলাইন ডেস্ক

জাতীয়

‘ভারতে ঘুরতে যাচ্ছি, আমাদের জন্য দোয়া করবেন’—বাবার বাড়িতে এটিই ছিল মার্জিয়া কান্তার শেষ ফোন। এরপর হঠাৎ করেই নিখোঁজ

2026-07-09T15:57:54+00:00
2026-07-09T15:57:54+00:00
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬ ২৩ শ্রাবণ ১৪৩৩
শুক্রবার ৭ আগস্ট ২০২৬
   
মরুভূমিতে সুঁই খোঁজার মতো এক হত্যার রহস্য উন্মোচন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৩:৫৭ পিএম   (ভিজিট : ২৭)
মার্জিয়া কান্তা (বাঁ পাশে), স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরের সঙ্গে কান্তা
X

মার্জিয়া কান্তা (বাঁ পাশে), স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগরের সঙ্গে কান্তা

‘ভারতে ঘুরতে যাচ্ছি, আমাদের জন্য দোয়া করবেন’—বাবার বাড়িতে এটিই ছিল মার্জিয়া কান্তার শেষ ফোন। এরপর হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়ে যান তিনি। কয়েকদিন পর স্বামী শহিদুল ইসলাম সাগর কান্তার পরিবারের সদস্যদের জানান, ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় কান্তার মৃত্যু হয়েছে। 

কিন্তু মরদেহ কোথায়, দাফন কোথায় করা হয়েছে—এমন কোনো প্রশ্নেরই উত্তর না দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন সাগর।

পরে জানা যায়, ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় নয়, স্বামী সাগর নিজের স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধে হত্যা করেছিলেন কুয়াকাটার একটি হোটেলকক্ষে। প্রথমে মরদেহ লুকিয়ে রাখা হয় বক্স খাটের ভেতরে।

দুদিন পর হোটেল কর্তৃপক্ষ সেটি উদ্ধার করলেও ঘটনার কথা গোপন রাখতে রাতের আঁধারে মোটরসাইকেলে করে নিয়ে সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয় মরদেহ।

ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছিল না মরদেহের কোনো অস্তিত্ব; সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কিংবা প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও নেই। 

এমনকি মামলার তদন্তের শুরুতে এজাহারেও কোনো আসামি শনাক্ত করতে পারেনি থানা পুলিশ। মরুভূমিতে সুঁই খোঁজার মতো পাঁচ বছর পর এই হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

তথ্যপ্রযুক্তি, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড, ল্যাক ও সেল আইডি বিশ্লেষণ, হোটেল রেজিস্ট্রার, জিডির তথ্য, জব্দকৃত আলামত এবং পরবর্তী সময় গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, স্বামী সাগরই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে মার্জিয়া কান্তাকে।

২০১৮ সালে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে থানা-পুলিশ প্রথমে কোনো কুলকিনারা করতে পারেন। পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। এরপর ১১ মাসের তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দীর্ঘ বিচার শেষে ২০২৩ সালে প্রধান আসামির আমৃত্যু কারাদণ্ডসহ পাঁচজনের সাজা নিশ্চিত হয়।


পিবিআই সূত্র জানায়, নরসিংদীর বেলাব উপজেলার বাসিন্দা এবং আশুলিয়ার কান্তা বিউটি পার্লারের মালিক মার্জিয়া কান্তা ভালোবেসে বিয়ে করেন শহিদুল ইসলাম সাগরকে। 

সংসার শুরুর কিছুদিন পর কান্তা জানতে পারেন, সাগরের আগেও একটি বিয়ে ছিল এবং তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত। বিষয়টি নিয়ে দাম্পত্য কলহ শুরু হলে কান্তা বাবার বাড়ি ফিরে যান। 

কিছুদিন পর সাগর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে কান্তাকে ফিরিয়ে নেন। সবাইকে বলেন, স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে বেড়াতে যাবেন। কান্তাও পরিবারের সদস্যদের ফোন করে একই কথা বলেন। এর পরই তার সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

অনেক চেষ্টা করে কান্তার পরিবার একসময় সাগরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি দাবি করেন, ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় কান্তা মারা গেছেন এবং তিনি একাই দেশে ফিরেছেন। পরে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়। কান্তার পরিবার কুড়িগ্রামে সাগরের বাড়িতে গেলেও তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়। তখনই পরিবারের সন্দেহ দৃঢ় হয় যে, কান্তাকে হত্যা করা হয়েছে।

এরপর কান্তার বাবা বেলাব থানায় অপহরণ করে হত্যা ও মরদেহ গুমের অভিযোগ দিলেও থানা প্রথমে মামলা নেয়নি। 

পরে আদালতের নির্দেশে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হয়। থানা পুলিশ প্রায় তিন মাস তদন্ত করেও কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি। পরে আদালতের অনুমতি ও পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি পিবিআইর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তদন্তের শুরুতেই পিবিআই দেখতে পায়, মামলায় কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই, মরদেহ নেই, সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন নেই। ফলে পুরো তদন্ত নির্ভর করতে হয় প্রযুক্তিনির্ভর ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর।

তদন্তকারীরা কান্তা ও সাগরের মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে জানতে পারেন, ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তারা শরীয়তপুরের একটি হোটেলে অবস্থান করেছিলেন। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ল্যাক ও সেল আইডি বিশ্লেষণ করে ওই হোটেলের রেজিস্ট্রার উদ্ধার করা হয় এবং সেখানে তাদের অবস্থানের তথ্য মেলে।

সেই সূত্র ধরে শনাক্ত করা হয় তৃতীয় এক ব্যক্তিকে। তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বেরিয়ে আসে হত্যার পরিকল্পনার তথ্য এবং আরেক সহযোগীর পরিচয়। পরবর্তী সময়ে তিনজনের অবস্থান পটুয়াখালীতে শনাক্ত হয়।

এরপর গ্রেপ্তার করা হয় কান্তার স্বামী সাগরকে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, স্ত্রী তার আগের বিয়ে ও পরনারীতে আসক্তির বিষয়টি প্রকাশ করতে চাইছিলেন। তাই তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

প্রথম পরিকল্পনা ছিল শরীয়তপুরে নদীভাঙন দেখানোর সময় নদীতে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করা। এজন্য নিজের এলাকার ছোট ভাই মাসুদকে সঙ্গে নেওয়া হয়। কিন্তু মাসুদ শরীয়তপুরের হোটেলে নিজের প্রকৃত পরিচয় ব্যবহার করায় ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সেই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়। পরে তারা কুয়াকাটায় গিয়ে ভুয়া নাম-পরিচয়ে একটি হোটেলে ওঠেন। সেখানেই শ্বাসরোধ করে কান্তাকে হত্যা করা হয়। মরদেহ বক্স খাটের ভেতরে রেখে তারা পালিয়ে যান।

হোটেল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘ সময় কক্ষটি তালাবদ্ধ দেখে স্থানীয় থানায় খবর দেয়। পুলিশ এসে কক্ষ ভেঙে কাপড়চোপড়, ব্যাগ ও একটি চাপাতি জব্দ করলেও বক্স খাটের ভেতরে থাকা মরদেহ খুঁজে পায়নি। দুই দিন পর কক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে রুম ক্লিনার মরদেহ দেখতে পান। কিন্তু হোটেলের সুনাম রক্ষার অজুহাতে ম্যানেজারের নির্দেশে কর্মচারীরা রাতের আঁধারে মরদেহ সাগরে ফেলে দেন।

পরে পিবিআই অভিযান চালিয়ে হোটেলের দুই মালিক ও ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে। পাঁচ আসামির মধ্যে তিনজন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তদন্তকারীরা হোটেল রেজিস্ট্রার, জিডি, জব্দকৃত আলামত, ব্যবহৃত কাপড়চোপড়সহ বিভিন্ন দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহ করেন। এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যায় সরাসরি জড়িত দুজন এবং আলামত নষ্টের অভিযোগে আরও তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পিবিআই।

দীর্ঘ বিচার শেষে আদালত সাগরকে আমৃত্যু কারাদণ্ড, ভাড়াটে খুনি মামুনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং হোটেলের মালিক-ম্যানেজারসহ তিনজনকে সাত বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন।

পিবিআই জানায়, এ মামলাটি প্রমাণ করেছে হত্যা মামলায় মরদেহ, সুরতহাল বা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন না থাকলেও প্রযুক্তিনির্ভর ও বিজ্ঞানসম্মত তদন্তের মাধ্যমে পারিপার্শ্বিক ও দালিলিক সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা যায়। অপরাধ প্রমাণ করে আদালতের মাধ্যমে দণ্ড নিশ্চিত করা সম্ভব।

একই সঙ্গে মামলাটি তদন্তের প্রাথমিক ধাপের দুর্বলতারও উদাহরণ। শুরুতেই অভিযোগ গ্রহণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ঘটনাস্থলগুলোতে দ্রুত তদন্ত করা হলে কান্তা হত্যার রহস্য আরও আগেই উদ্ঘাটন করা এবং মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হতে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তারা।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর পরিদর্শক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মরদেহ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের বিষয়টি খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। এমন মামলার ঘটনাও খুব একটা পাওয়া যায় না। সব চ্যালেঞ্জ নিয়েই মামলাটি তদন্ত করে আসামিদের শনাক্ত করা হয়।’





Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : bulletinadbd@gmail.com
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy