
X
সেরনিয়াবাত খোকন আব্দুল্লাহ
গণ-আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের কয়েক ঘণ্টা আগে বরিশাল ছাড়েন সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) সাবেক মেয়র ও শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই সেরনিয়াবাত খোকন আব্দুল্লাহ।
পালিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে যান প্রায় ১৬ কোটি টাকা। পরে ওই টাকা মালয়েশিয়া আর সিঙ্গাপুর হয়ে পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ছেলে প্রত্যুষ সেরনিয়াবাতের কাছে। মাঝে তার ৩ কোটি টাকা মেরে দেওয়া হয়।
৪ আগস্ট গভীর রাতে বরিশাল ছাড়লেও ২০২৪ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনি খুলনায় প্রভাবশালী এক বিএনপি নেতার বাসায় অবস্থান করেন। পরে তামাবিল সীমান্ত দিয়ে প্রথমে আসাম ও পরে কলকাতা যান খোকন।
সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী লুনা আব্দুল্লাহ। পরে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর আর পেট্রোল পাম্প খুলে নিজেকে বিনিয়োগকারী প্রমাণ করে সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো-খুলনায় পালিয়ে থাকা অবস্থায় বিসিসির বেশ কয়েকজন ঠিকাদারের পাওনা প্রায় ২৭ কোটি টাকার চেকে ব্যাক ডেটে সই করেন খোকন।
বরিশাল থেকে চেক খুলনায় নিয়ে সই করিয়ে আবার বরিশালে আনার কাজটি করেন খোকনের তৎকালীন এপিএস রুবেল। তাকে সহায়তা করেন বিসিসির প্রকৌশল (সিভিল) ও হিসাব শাখার দুই কর্মকর্তা। তাদের একজন বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদের নেতা।
আর চেক সই করার বিনিময়ে মোট বিলের শতকরা ২০ থেকে ৪০ পার্সেন্ট টাকা নেন শেখ মুজিবের ভগিনীপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পুত্র সাবেক এই মেয়র। টাকা হাতে পাওয়ার পর চেকে সই করেন তিনি।
যেভাবে পালান খোকন আব্দুল্লাহ : আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও কেবল শেখ পরিবারের কোটায় লোকদেখানো নির্বাচন করে মেয়র বানানো হয় খোকনকে।
মাত্র ৭ মাসের দায়িত্ব পালনকালে নানাভাবে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগের তদন্ত করছে দুদক। ৪ আগস্ট সকালে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে গুলি ছুড়তে গিয়ে গণপিটুনিতে মারা যান বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা টুটুল চৌধুরী। ওই ঘটনায় ভীত হয়ে পড়েন খোকন।
রাতে তার আলেকান্দা সড়কের ভাড়া বাসায় ডেকে নেন আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন এক ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও যুবলীগের দুই নেতাকে। তখনই বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
ওই রাতে খোকনের বাসায় থাকা ওই ৩ নেতার একজন জানান, ‘একসঙ্গে বসে আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হলেও যাওয়ার সময় কাউকে কিছু না বলে চুপচাপ চলে যান খোকন। রাত ৩টা নাগাদ বিশেষ একটি বাহিনীর দুটি গাড়ি সামনে পেছনে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যায় সাবেক এই মেয়র ও তার স্ত্রীকে বহনকারী গাড়ি।
তার বেড়িয়ে যাওয়ার অন্তত আধা ঘণ্টা পর আমরা জানতে পারি যে তিনি চলে গেছেন। বরিশাল থেকে সোজা খুলনায় গিয়ে ওঠেন সোনাডাঙ্গা এলাকায় শ্যালক মিঠুর বাড়িতে। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর আশ্রয় নেন খুলনা বিএনপির প্রভাবশালী এক নেতার বাসায়।
আওয়ামী শাসনামলের দীর্ঘ সময় ওই নেতাকে মোংলা বন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়তা করেছিলেন খোকন। তিনি নিজেও ছিলেন মোংলা বন্দর স্টিভেডর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।
প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করতেন সমুদ্রগামী জাহাজে। রাতের বাকিটা সময় আমরা ওই বাসায় থেকে খুব ভোরে চলে আসি।’
পালানোর সময় সঙ্গে ছিল গাড়িভর্তি টাকা : ৪ আগস্ট রাত ১২টায় বরিশাল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন খোকন আব্দুল্লাহ।
৩ ঘণ্টা চলে প্রস্তুতি। ওই রাতে তার বাসায় থাকা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘এই ৩ ঘণ্টায় ঘরে থাকা নগদ টাকা আর স্বর্ণালংকার ব্যাগে ভরেন তিনি। তাকে সহায়তা করা তৎকালীন এপিএস রুবেলের কাছে পরে শুনেছি যে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ছিল সেখানে।
তবে কোনো কাপড়চোপড় সঙ্গে নেননি তিনি বা তার স্ত্রী। বিপুল অঙ্কের ওই টাকা নিয়েই তারা ওঠেন খুলনায় শ্যালক মিঠুর বাসায়। সেখান থেকে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো হয় ৫ আগস্টের পর মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়া এক যুবলীগ নেতার কাছে। মালয়েশিয়া থেকে পরে তা পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে মেয়র খোকনের পুত্র প্রত্যুষের নামে থাকা একাধিক নামসর্বস্ব কোম্পানির হিসাবে।
প্রত্যুষ আগে থেকেই মার্কিন নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রে টাকা নিতে হলে যেহেতু অর্থের উৎস জানাতে হয়, তাই সিঙ্গাপুরে খোলা নামসর্বস্ব কোম্পানির মাধ্যমে সেখানে টাকা পাঠাতেন খোকন। মেয়র হওয়ার পর থেকে ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত যত টাকা হাতিয়েছেন, তার সিংহভাগ এভাবেই পাচার হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
এছাড়া মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্য করে আয় করা অর্থও পাচার হয়েছে সেখানে। তবে শেষ চালানের ১৬ কোটি টাকা পাঠাতে গিয়ে ৩ কোটি খোয়ান তিনি। মালয়েশিয়ায় যার কাছে হুন্ডি করে বাংলাদেশ থেকে টাকা পাঠানো হয়, সিঙ্গাপুরে পাঠানোর ক্ষেত্রে সেখান থেকে ৩ কোটি টাকা মেরে দেন তিনি। এ নিয়ে ওই ব্যক্তির সঙ্গে ঝগড়াও হয় খোকনের।’-যুগান্তর