
X
দেশের নানা বিষয়ে বিদেশিদের প্রবল আগ্রহ দেখা দিয়েছে। রাজনীতি, মানবাধিকার, নির্বাচন এমন কী সুশীল সমাজের ভূমিকা নিয়েও তাঁরা কথা বলতে শুরু করেছেন। জাতীয় নির্বাচনের আরো ১৪ মাস বাকি থাকতেই বিদেশি কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ ও দেশগুলোর নেতাদের অব্যাহত বাংলাদেশ সফর সেই বার্তাই বহন করছে।
সর্বশেষ গত বুধবার ৪ দিনের সফর শেষে বিদায় নেয়ার পূর্বে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক এক প্রতিনিধি নানা অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের আগ্রহ দেখিয়ে গেছেন। দেশটির অর্থনীতিসহ নানা কারণে বিদেশিদের এমন আগ্রহ বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, উন্নয়নশীল ও সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও নির্বাচন নিয়েও তাদের প্রবল আগ্রহ রয়েছে। তবে এটিকে ভালো চোখে দেখছেন না ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। গত আড়াই মাসে বিদেশি কূটনীতিকদের এমন দৌড়ঝাঁপের বিষয়ে সংসদে ও সংসদের বাইরে কঠোর সমালোচনা করে তারা বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে ‘বিদেশিদের কাছে ধরনা দেয়া রাজনৈতিক দৈন্যতার বহিঃপ্রকাশ’।
গত কয়েক মাস থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন মিশনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনাররা সরকারের মন্ত্রী পর্যায়ে, নির্বাচন কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠকও করেছেন। তাদের বৈঠকে গুরুত্ব পায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন পদ্ধতি। বিরোধীদলীয় নেতাদের বাসভবনে রাতের ডিনারেও অংশ নিতে দেখা যায় কূটনীতিকদের।
বিশেষ করে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের পর গত ৮ জুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ২৬ জুন সাক্ষাৎ করেন অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার জেরেমি ব্রুর। এরপর গত ৩ জুলাই একসঙ্গে ১৪টি দেশের রাষ্ট্রদূত যান ইসিতে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাইকমিশনের নেতৃত্বে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন এ্যান্ড ডেভেলপমেন্টভুক্ত (ওইসিডি) ৩৮টি দেশের মধ্যে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, তুরস্ক এবং জাপানের রাষ্ট্রদূত ইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সর্বশেষ স্বাধীন ও বিশেষায়িত নতুন একটি সংস্থার মাধ্যমে গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট। গত বুধবার বাংলাদেশ সফরের শেষ দিনে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
তার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে গতকাল আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ‘মিশেল ব্যাচেলেটের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছিল। তাঁকেও আমাদের এখানকার যে অবস্থা, সেটা জানিয়েছি। বলেছি, কেউ যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে, তার বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিই। যেটা নারায়ণগঞ্জের ঘটনা (র্যাবের হাতে সাত খুন), সেটা বলেছি। আমরা তাদের (র্যাব) বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। এখানে একটা প্রশ্ন এসেছে, নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা গঠন।
আমি বলেছি, আমাদের আইনের মধ্যে যে তদন্তের কথা বলা আছে, সেখানে আমাদের যে তদন্তকারী সংস্থা আছে, সেগুলোকেই তদন্ত করার ক্ষমতা দেয়। এর বাইরে আমরা তদন্ত করতে পারব না। আর আন্তর্জাতিক তদন্তের কথা যেটা বলা হয়, সেটার ক্ষেত্রে বলব- বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। এখানে আইন ও আদালত আছে, এখানে আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা করার সুযোগ নেই। আমরা আমাদের আইন দিয়েই চলব। তবে এখানে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে যদি কেউ প্রশ্ন করেন, তাহলে সেগুলোর জবাব আমরা দেব।’
এর আগে গত ৭ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করেছেন মার্কিন আন্তর্জাতিক সংস্থা বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিশেল জে সিসন। মিশেল জে সিসন বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ঢাকা-ওয়াশিংটন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবাধিকার, রোহিঙ্গা ইস্যু, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, র্যাবের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, শান্তি রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বিদেশিদের ধারাবাহিক দৌড়ঝাঁপে সর্বশেষ যুক্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিনিধি চারদিনের সফরে রোববার ঢাকায় আসার পর সরকারের মন্ত্রীদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে বৈঠক করেন তিনি। তার এই সফরের মধ্যেই জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার কার্যালয়ের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান ররি মুনগোবেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল।
এই সফরে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিনিধি ব্যাচেলেট। সফরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সঙ্গেও বুধবার বৈঠক করেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান। সোমবার নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে গুম নিয়ে কাজ করা ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলাম তুলিও উপস্থিত ছিলেন। হাই কমিশনারের সফরে বিভিন্ন বৈঠকে মানবাধিকার পরিস্থিতির পাশাপাশি গুম-বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষয়টি উঠে আসে বলে জানিয়েছিলেন মন্ত্রীরা। সংবাদ সম্মেলনে মিশেল ব্যাচেলেটের বক্তব্যের বড় অংশজুড়েও ছিল এসব বিষয়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের কেন্দ্রও ছিল গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের অবস্থান ঘিরে।
এসময় হাইকমিশনার বলেন, ‘আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশে মেরূকরণ ও উত্তেজনার শঙ্কা দেখছে জাতিসংঘ। এ কারণে শুধু নির্বাচন নয়; সব সংকট সমাধানে রাজনৈতিক দলসহ সমাজের সব পক্ষের মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাচেলেট। তিনি বলেন, ‘আগামী বছর বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ সময়ে বাংলাদেশে মেরুকরণ ও উত্তেজনা বাড়ে। এ পরিস্থিতিতে সমাজের সবার মতামত শুনতে হবে। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, যা সরকারের ব্যবহার করা উচিত। সমালোচনা শুনলে সমস্যা চিহ্নিত এবং আলোচনার মাধ্যমে তা সমাধানে কাজ করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, ‘এটা বাংলাদেশে যারা যখন বিরোধীদলে থাকে, তারাই তখন কূটনীতিকদের কাছে ধর্না দেয়। তারা চায় সরকারের ওপর এভাবে চাপ তৈরি করতে। আর বিদেশি কূটনীতিকরাও এর সুযোগ নেন। কিন্তু আমি মনে করি, তারা এটা বাংলাদেশের কল্যাণে নয়, নিজেদের স্বার্থে করেন। তিনি বলেন, ‘বিদেশি কূটনীতিকরা সারাক্ষণই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার, নির্বাচন নিয়ে তারা কথা বলেন। কিন্তু তারা তাদের দেশের ব্যাপারে এটা করতে দেবেন না। তারা কি ভারতে এটা পারবে? আমরা কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গান ফাইট বন্ধের কথা বলতে পারবো? তারা পরাশক্তি, তাই তাদের ব্যাপারে বলা যাবে না। কিন্তু আমরা দুর্বল, তাই তারা আমাদের ব্যাপারে বলবে। ’ মিশেলের সফর ও বক্তব্য প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন ‘তারা যা বলার বলুক, যা করার করুক। আমাদের ব্যস্ততা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যস্ততা এ দেশের জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের। আমরা সেটাই করার চেষ্টা করছি।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকা ও জাতিসংঘের কাছে পজিটিভ মনোভাব আশা করি না।’
-বাবু/শোভা