
X
মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ যখন হাঁসফাঁস করছে ঠিক তখন আলোর রেখা হিসেবে সুসংবাদ নিয়ে এলো দেশের খাদ্য পরিস্থিতির ভালো চিত্র। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ খাদ্য ঘাটতি অনুভব করেনি, খাদ্য ঘাটতির আশঙ্কাও নেই। সংস্থাটি বলেছে, শ্রীলঙ্কায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮০ শতাংশ, পাকিস্তানে ২৬ শতাংশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশে বেশ কম মাত্র ৮.৩ শতাংশ। গত সোমবার বিশ্বব্যাংকের ফুড সিকিউরিটি আপডেট শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির হিসেব যেমনিই হোক কমলাপুরের সাইফুল ইসলামের হিসাবের সাথে তা মিলে না। কারণ তাকে রীতিমতো খাদ্য তালিকা ছোট করে আনতে হয়েছে। সাইফুল ইসলাম তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বেশ ভালোই কাটছিলো জীবন। চলতি বছরের শুরু থেকে আয় এবং ব্যায়ের মধ্যে দুরত্ব বাড়ার বিষয়টি টের পান। গতকাল রাজধানীর কমলাপুর এলাকায় ডিপোর পাশে সড়কে অবস্থিত দোকানে বসে তিনি জানান, ‘বছরের শুরু থেকেই সংসারের খরচ, দুই সন্তানের পড়ালেখা, দোকান ভাড়া সব মিলিয়ে হাতের টাকায় টান পড়তে শুরু করে। এর মধ্যে স্ত্রীর কাছে কিছু টাকা ছিলো তা নিয়েও সংসার চালিয়ে গেছি তবে তেলের দাম বাড়ার পর খুব কষ্টে চলতে হচ্ছে। আগের মতো বিক্রিও নেই তাই দোকানের আয় কমেছে অন্যদিকে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে টাকায় কুলাচ্ছে না। সব মিলিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার অবস্থা। শুধু সাইফুল ইসলামই নয়- যাওয়া আসার পথে গতকাল মধ্যবিত্ত শ্রমজীবি এমন কয়েকজনের সাথে কথা হয় তাদের সবার মুখেই হতাশার ছায়া, অভিন্ন কথা।
পল্টন কালভার্ট এলাকায় ছোট ব্যবসায়ী নুর নবী নিজের পরিবারকে গতমাসেই গ্রামের বাড়ী চাঁদপুরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তার সাথে কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পরিবার নিয়ে থাকতাম একসাথে কিন্তু বাসা ভাড়া বাড়িয়েছে, এর সাথে সব খরচই বেড়ে গেছে অনেকগুন তাই আর পারছি না। স্ত্রী ও দুই মেয়েকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিকে বুকটা ফেটে গেছে কিন্তু করার কিছুই ছিলো না। এখনো নিজে মেচে উঠলেও বাড়িতে চাহিদামতো টাকা পাঠাতে পারছি না। সমানে কী হবে আল্লায় জানে।’
এই সড়কে মনতাজ উদ্দিন কেবল দুপুরে ভাত খান বাকী দুই বেলা নাস্তাতেই সেরে নেন। বাজারের চড়া মুল্যের কারণে নিজের খাদ্য তালিকা ছোট করে এনেছেন এরকম অনেকের সাথেই কথা হয়। তাদের একজন রিক্সা চালক মতিন তিনি গত ১০ বছর ধরে রিকশা চালান ঢাকায়। চার সন্তানের জনক তিনি। ছেলে মেয়ে বৃদ্ধ মাবা-বাবা সহ প্রতিমাসেই ১০ হাজার টানা না হলে গ্রামের বাড়িতে চলে না। অথছ এখন সেই টাকাও পাঠাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
ঢাকা শহরে ছোট খাটো চাকরি করে যারা সংসারের যোগান দেন তাদের অবস্থা একেকটা করুন গল্পের মতো। এরকম কয়েকজনের সাথে কথা হলে তাদের মাসের হিসাব প্রায় একই দেখা যায়। ‘বাসাভাড়াসহ বিভিন্ন বিলের পেছনে ১২/১৩ হাজার টাকা চলে যায়। দুই বাচ্চার পড়ালেখার পেছনে যায় প্রায় ৭ হাজার টাকা। বাজারখরচ ১০ হাজার টাকা। যাতায়াতসহ হাতখরচ ৫ হাজার টাকা। মাসে ৩ হাজার টাকার ডিপিএস করি। এছাড়া অন্য কেনাকাটা আছে; মাঝেমধ্যে বাড়িতে কিছু টাকা পাঠাই। তবে সাধারণত সব সময়ের এ হিসেবে এখন চিড় ধরেছে।
হঠাৎ করেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাড়তে শুরু করেছে সব পণ্যের দামই। ডিমের হালি ৫৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম ২০০ টাকা কেজি। কাঁচা মরিচের দামে আগুন। চাল, ডাল, আটা, তেল, দুধ, ফলমূল, মাছ-মাংস সব পণ্যের দামই বাড়ছে হু হু করে। বাসভাড়া তো বেড়েছেই। আগে যে রিকশাভাড়া ছিল ২০ টাকা এখন তা ৩০ টাকা। এ অবস্থায় গত রবিবার রংপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘অর্থনৈতিক মন্দা এখন বিশ্বজুড়ে। সারাবিশ্বেই নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আমাদের দেশেও। সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে, এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। মানুষের কষ্ট যাতে না থাকে, সেজন্য সরকার কাজ করে যাচ্ছে।’
গত বছর জানুয়ারিতে প্রকাশিত বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৪২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে (হায়েস) ২০১৬-এর চূড়ান্ত রিপোর্টে (মে, ২০১৯) জানিয়েছিল, এ হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, করোনায় দেশের দারিদ্র্যের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিশ^ অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষ আরও কাহিল হয়ে পড়েছে। ধারাবাহিকভাবে জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও মানুষের তেমন আয় বাড়েনি। চাকরিজীবীর বেতন যা ছিল, তাই আছে। বরং বৈশ্বিক মন্দায় অনেকে চাকরি হারানোর শঙ্কায় আছে।
গত ২৪ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে ‘সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ: কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?’ শীর্ষক সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক সংকট স্বল্পমেয়াদী নয় বলে মন্তব্য করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘এ সংকট মধ্যমেয়াদী হবে এই অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ পর্যাপ্ত নয়। বর্তমান সংকট স্বল্পমেয়াদী নয়, মধ্যমমেয়াদী। এভাবে চললে দেশ দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে যাবে। আইএমএফ বলেছে ২০২৩ সালেও অর্থনৈতিক সংকট থাকতে পারে। সেখানে শ্রীলংকার অবস্থা বেশি খারাপ বলা হয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা ভালো হলেও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সরকারকে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, সহজে সংকট থেকে মুক্তি মিলবে না। সরকারের বর্তমান ব্যবস্থাগুলো বেশিরভাগই স্বল্পমেয়াদী প্রকৃতির। কার্যকরী পদক্ষেপ খুঁজে বের করতে হবে। যার মধ্যে রয়েছে স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, মুদ্রাস্ফীতি ব্যবস্থাপনা, বর্ধিত রাজস্ব উৎপাদন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি কর্মসূচি বৃদ্ধি করা।
অর্থনীতিবিদ ও ব্র্যাকের চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, তবে এ মুহূর্তের সংকট শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির অস্থিতিশীলতা নয়। ব্যাষ্টিক অর্থনীতিতে একটা অবিচারের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। স্বার্থের দ্বন্দ্ব এখন অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে কাজ করছে। এর শিকার হচ্ছে দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা। তিনি বলেন, সুস্পষ্ট অবিচারের চেহারায় নতুন করে দরিদ্র হচ্ছে। মাধ্যমিক শিক্ষা নানানভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিগত কয়েক যুগের মধ্যে দেশের মানুষ এতটা সঙ্কটে কখনও পড়েনি। কারণ এখন যেভাবে সব দিক দিয়ে সঙ্কট ঘিরে ধরেছে, সে রকমটা অতীতে কখনও দেখা যায়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিকেও কখনও মোকাবিলা করতে হয়নি দেশের মানুষকে। এখন শুধু ধনী পরিবারগুলো বাদে দেশের আর কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ ভালো নেই। কেন ভালো নেই, চোখ বুজে একবার ভাবলেই চোখের সামনে কারণগুলো স্পষ্ট আকারে ভেসে উঠবে।
-বাবু/শোভা