
X
জুয়েনা শবনম থিয়েটার নিয়ে ব্যস্ততা, ব্যক্তিজীবন ও অন্যান্য প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বুলেটিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তৌফিকুল ইসলাম
‘হেলেন কেলার’-এর আগামী প্রদর্শনী নিয়ে বলুন...
স্বপ্নদলের ১৭তম প্রযোজনা অপূর্ব কুমার কুণ্ডু রচিত এবং জাহিদ রিপনের নির্দেশনাকৃত মনোড্রামা ‘হেলেন কেলার’-এর দেশ-বিদেশে ইতোমধ্যে ৩৯টি মঞ্চায়ন হয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে ‘হেলেন কেলার’-এর ৪০তম মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ভারতের আমন্ত্রণে ‘হেলেন কেলার’-এর পরপর তিনটি প্রদর্শনী রয়েছে। ১৬ই সেপ্টেম্বর ভারতের অন্যতম নাট্যদল সবুজ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ‘৬ষ্ঠ নাট্যসম্পর্ক ২০২২’ আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে নৈহাটি ঐকতান মঞ্চে ১৭ সেপ্টেম্বর বোলপুরের (শান্তিনিকেতন) বোলপুর নৃত্যনিকেতন ডান্স গ্রুপ ও স্কুলের আয়োজনে আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে এবং ১৯ সেপ্টেম্বর অশোকনগর নাট্যমুখের আমন্ত্রণে অমল আলো মিলনায়তনে ‘হেলেন কেলার’-এর মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হবে। একই মাসে বাংলাদেশ ও ভারতে আমার একক অভিনীত ‘হেলেন কেলার’-এর চারটি প্রদর্শনী করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।
অনেক দিন ধরেই চরিত্রটা করছেন. এ নাটকটিতে অভিনয় করতে কেমন অনুভব করেন?
২০১৬-এর ডিসেম্বরে ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই)-এর ‘২য় ঢাকা আন্তর্জাতিক মনোড্রামা ফেস্টিভ্যাল’-এ ‘হেলেন কেলার’-এর উদ্বোধনী মঞ্চায়ন হয়। তারও আগে আমরা স্বপ্নদল প্রায় দেড় বছর ধরে ‘হেলেন কেলার’ নির্মাণের প্রস্তুতি ও নির্মাণে কাজ করেছি। সে হিসেবে অনেক বছর ধরেই আমি ‘হেলেন কেলার’-এর ঘোরের মধ্যে আছি। বলা যায়, শিল্পে ও ব্যক্তিগত জীবনে আমি ও মহীয়সী হেলেন কেলার একাকার হয়ে গেছি। দর্শকেরা প্রায়ই বলেন, তারা নাকি আমার এবং বাস্তবের হেলেন কেলারের চেহারা ও অবয়বে অভাবনীয় মিল খুঁজে পান। এ বিষয়টি আমাকে খুব আনন্দ দেয়। আমি মনে করি ‘হেলেন কেলার’ প্রযোজনায় অভিনয়ের সুযোগ পেয়ে আমার জীবন ধন্য হয়েছে।
মনোড্রামাটি এর আগেও বিদেশে করেছেন, বিদেশে নাটকটি মঞ্চায়ন করার সময় কেমন সাড়া পেয়েছেন?
‘হেলেন কেলার’ প্রযোজনাটি দেশে নিয়মিতভাবে দর্শকনন্দিত মঞ্চায়নের পাশাপাশি ২০১৮-এ জাপানের টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের আমন্ত্রণে, ২০১৮-এ ভারতের কলকাতায় প্রাচ্য নিউ আলিপুর আয়োজিত ‘পূবের নাট্যগাথা আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব’-এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এছাড়া দেশের সীমা ছাড়িয়ে ছয়টি আন্তর্জাতিক ভার্চুয়াল থিয়েটার ফেস্টিভ্যালে সফল সম্প্রচারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও স্মরণীয় গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ‘হেলেন কেলার’ প্রযোজনাটি কুয়েতের বিশ্বখ্যাত একটি নাট্যোৎসবে মঞ্চায়নের জন্যও আমন্ত্রিত হয়েছে। আর এই যে এবার ভারতে আমন্ত্রিত হয়ে ‘হেলেন কেলার’-এর পরপর তিনটি প্রদর্শনী করতে যাচ্ছি সেটিও আসলে এ প্রযোজনার আন্তর্জাতিক খ্যাতিরই প্রমাণ।
বর্তমান সময়ে নানাবিধ সংকটে হেলেন কেলারকে উপলব্ধি প্রসঙ্গে বলুন...
দৃষ্টি-বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী হওয়া সস্তে¡ও অসংখ্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রকাশিত ও বিকশিত হয়েছিলেন হেলেন কেলার। তাই তো মার্ক টোয়েন তাকে মূল্যায়ন করেছেন ঊনিশ শতাব্দীর সেরা দুই চরিত্রের অন্যতম হিসেবে। আমাদের ‘হেলেন কেলার’ প্রযোজনার একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হচ্ছে পাশ্চাত্যের হেলেন কেলারের জীবনে প্রাচ্যের রবীন্দ্রনাথ তথা রবীন্দ্রদর্শনের প্রবল প্রভাবের স্বরূপ উন্মোচন। হেলেন কেলার অমৃত্যু কাজ করে গেছেন নারীজাগরণ-মানবতাবাদের পক্ষে। সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন যুদ্ধ-ধ্বংস-সহিংসতা-বর্ণবাদ আর আণবিক অন্ত্রের বিরুদ্ধে। এ প্রযোজনাটি আসলে কারিগরি সুবিধার নানাবিধ প্রয়োগের মাধ্যমে বাঙলা নাট্যরীতির আধুনিক উপস্থাপন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন পুরো পৃথিবীর পরিস্থিতির এক ডকুমেন্টেশন। তাই আজ যখন চারিদিকে নানা অনাচার, নারীর অপমান, মানবতার অপমান প্রভৃতি দেখি কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও এর প্রভাবে সারাবিশ্বের ধারাবাহিক ক্ষতি দেখতে থাকি তখন যুদ্ধবিরোধী এ প্রযোজনাকে খুবই অপরিহার্য বলে মনে হয়। এসব কারণেই স্বপ্নদল ‘হেলেন কেলার’-কে দলের নিয়মিত প্রযোজনা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ স্বপ্নদলের প্রযোজনাসমূহে থাকে শৈল্পিক উৎকর্ষের পাশাপাাশি দর্শককে ভাবানোর মতো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য।
ব্যক্তিজীবনে শিক্ষকতার পাশাপাশি মঞ্চ নাটকে সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখেন?
আমি সরকারি তিতুমীর কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। স্বপ্নদলের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য ও বর্তমান প্রশিক্ষণ সম্পাদক। এ ছাড়াও আমি তিতুমীর কলেজের একমাত্র নাট্যসংগঠন ‘তিতুমীর নাট্যদল’-এর মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। আমি বিশ্বাস করি, পরিকল্পনা করে সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে সবই সম্ভব। আমার জীবনসঙ্গী নাট্যজন জাহিদ রিপন, আমার কন্যা নিসর্গ শবনম ও পুত্র অনিন্দ্য অন্তরিক্ষ সবাই নিয়মিত থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত। আসলে আমাদের পরিবারের সকল কার্যক্রমই পরিচালিত হয় থিয়েটারের কার্যক্রম ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে।
বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের বর্তমান অবস্থান নিয়ে আপনার বক্তব্য...
বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক এখন আসলে একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোভিডকালে নাট্যচর্চা তথা নাট্যকর্মীদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে যে সমস্যা শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গন প্রকৃতপক্ষে এখনও সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক বিশ্বমানের বলে আমরা গর্ব করি, কিন্তু বিশ্বজোড়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কালে ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক কারিগরি নানাবিষয়ের সমন্বয় তথা নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে থিয়েটারকে দেখাও জরুরি আমাদের মধ্যে। আর এ আধুনিককালে পেশাদার হওয়া ছাড়া কোনো শিল্পেরই চূড়ান্ত উৎকর্ষে পৌঁছানো সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পার হয়ে গেছে, এখন সরকারবেই এগিয়ে আসতে হবে দেশের থিয়েটারকে পেশাদার করার জন্য।
সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
আপনাকেও ধন্যবাদ।
বাবু/তৌফিক