কোটি টাকা আত্মসাৎ

ইমরান আলী

অর্থনীতি

# ডিজিটাল প্লাটফর্ম ঘিরে সক্রিয় প্রতারকরা# সম্ভ্রম হারান অনেক নারী# র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার চক্রের ৭ সদস্যচাকরি দেওয়ার নামে

2023-04-02T15:10:30+00:00
2023-04-02T15:10:30+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
ভুয়া বিজ্ঞপ্তিতে নিয়োগ প্রতারণা
কোটি টাকা আত্মসাৎ
ইমরান আলী
প্রকাশ: রোববার, ২ এপ্রিল, ২০২৩, ৩:১০ পিএম   (ভিজিট : ১৯৫)
X


# ডিজিটাল প্লাটফর্ম ঘিরে সক্রিয় প্রতারকরা 
# সম্ভ্রম হারান অনেক নারী
# র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার চক্রের ৭ সদস্য

চাকরি দেওয়ার নামে ডিজিটাল প্লাটফর্মে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে আসছিল উত্তরখানের নামসর্বস্ব সিনথিয়া সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠান। তারা অনলাইনে গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবলের জন্য আকর্ষণীয় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিতো। আগ্রহীরা টাকার বিনিময়ে যোগ দেওয়ার পর জানতে পারেন বেতন নয়, নতুন চাকরিপ্রত্যাশীকে এনে কমিশন আদায় করতে হবে। সেটাই তার বেতন। এভাবে সাতশ’ থেকে আটশ চাকরি প্রত্যাশীর কাছ থেকে অভিনব এই প্রতারণায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

রাজধানীর উত্তরখান এলাকা থেকে অর্থ আত্মসাতকারী এক চক্রের সাত সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতারের পর এমন তথ্য জানায় র‌্যাব-১। র‌্যাব বলছে, গ্রেফতারকৃতদের কোম্পানি আইন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই এবং সরকারি অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন নেই।

অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মোমেন বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল প্লাটফর্মে চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আসছিল। অনলাইনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে একটি চক্র প্রতারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে বলে জানা যায়। তারা পরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে তাদের এমএলএম কোম্পানির বিভিন্ন প্রজেক্টে সাধারণ মানুষকে নিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়ে প্রতারণা করে আসছিল।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়ার পর র‌্যাব-১ ছায়া তদন্ত ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ায়। এরই ধারাবাহিকতায়  র‌্যাব-১ এর একটি দল ডিএমপির উত্তরখান থানাধীন আটিপাড়া বাজারের ‘মা মনোয়ারা সুপার মার্কেটের’ ৪র্থ তলায় সিনথিয়া সিকিউরিটি সার্ভিস লি. এর অফিসে অভিযান পরিচালনা করে সাতজনকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- এমএলএম প্রতারক চক্রটির এমডি সামসুন্নাহার ওরফে মায়া (৩৩), জিএম মো. জুয়েল ভূইয়া (২৬), ডিজিএম কামরুজ্জামান ওরফে ডেনিস (২৪), রিসিপশনিস্ট  ফারহানা ইয়াছমিন ওরফে সুবর্ণা আক্তার (২৩), মার্কেটিং অফিসার মেহেদী হাসান (২১), মার্কেটিং অফিসার আল মামুন ওরফে মাসুদ (২১) ও তাজবির হাসান ওরফে লোহান (১৯)।

এসময় অভিযুক্তদের কাছ থেকে ৫টি ভুয়া নিয়োগপত্র, ৮০টি জীবন বৃত্তান্ত ফরম, ১ বক্স ভিজিটিং কার্ড, ১টি মানি রিসিট বই, ১০১টি ভর্তির ফরম ও অঙ্গীকারনামা, ২টি সিল, ১৫টি আইডি কার্ড, ৩টি রেজিস্টার, ৮টি মোবাইল ফোন, ৮ পাতা চাকরি বিজ্ঞাপনের স্ক্রিনশট এবং নগদ ২০ হাজার ৪০০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

অভিযুক্তদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন এ কর্মকর্তা জানান, তারা একটি সংঘবদ্ধ এমএলএম প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। সিনথিয়া সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড নামে তারা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।

প্রতারক চক্রটি ডিজিটাল প্লাটফর্মে তাদের প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে। তাদের কোম্পানিতে ম্যানেজার, অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এবং তাদের অধীনে বিভিন্ন অফিস, ব্যাংক, এটিএম বুথ, থ্রি স্টার অ্যাপার্টমেন্ট, গার্মেন্টস-টেক্সটাইল, মিল-ফ্যাক্টরি, বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্ট, মেট্রোরেল হেড অফিস, চায়না প্রজেক্টসহ আরও কিছু জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক প্রতিষ্ঠানের লাভজনক পদে কিছু কর্মচারী নিয়োগের জন্য ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দিতো।

তিনি জানান, তাদের অফিস থেকে চাকরি প্রার্থীদের মোবাইলে ফোন দিয়ে একটি নির্দিষ্ট তারিখে অফিসে এসে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য বলা হয়। নির্দিষ্ট তারিখে চাকরি প্রার্থীরা ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য অফিসে আসার পর তাদের কাছ থেকে ভর্তি ফরম, ট্রেনিং এবং আইডি কার্ড বাবদ ১২ হাজার ৫০০ টাকা জামানত আদায় করা হতো। তাদের জানানো হতো পদ অনুসারে তাদের মাসিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে।

পরে সিকিউরিটি অফিসে যোগ দিলে তাদের নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা হতো প্রতি মাসে নতুন নতুন চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করতে হবে এবং নতুন প্রার্থী সংগ্রহের ভিত্তিতে কমিশন হিসেবে তাদের বেতন দেওয়া হবে।

প্রতারণার বিষয়ে বুঝতে পেরে জামানতের টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্ন টালবাহানা করতো এবং টাকা ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানাত। এভাবে অভিযুক্তরা গত ৬ মাসে প্রায় ৭০০/৮০০ জন চাকরি প্রার্থীকে তাদের কোম্পানির নিয়োগ ফরম পূরণ করে হাতিয়ে নিয়েছে কোটি টাকা।

র‌্যাব জানায়, গত ৮ মাস ধরে সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগের নামে কোম্পানি চলছিল। কিন্তু তারা কোনো সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ দেয়নি। অভিযুক্ত সামসুন্নাহার মায়া ও জুয়েল ভূইয়া একটি সংঘবদ্ধ এমএলএম প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। সামসুন্নাহার মায়া ২০২০ সালে রাজধানী ঢাকার দক্ষিণখান থানার মধ্য আজমপুর, সংগ্রামী সরণী রোড বি এলার্ট সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেডের মার্কেটিং অফিসার পদে চাকরি করতো। পরে গত ৮ মাস ধরে ‘সিনথিয়া সিকিউরিটি সার্ভিস লি.’ নামক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা শুরু করে এবং চাকরি প্রত্যাশীদের টার্গেট করে প্রতারণা করে আসছিল।

শুধু এই গ্রুপ নয়, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চাকরির চটকদার বিজ্ঞাপণ দিয়ে প্রতারণার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিভিন্ন ভূয়া প্রতিষ্ঠান ফেসবুকে পেজ খুলে চাকরির বিজ্ঞাপণ দিয়ে বুষ্ট করে। বুষ্টের ফলে হাজার হাজার লোকের ফেসবুক ওয়ালে চলে যায় বিজ্ঞাপনটি। অনেক চাকরি প্রত্যাশী সেখানে দেয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে শুরু হয় প্রতারণার কৌশল। এক পর্যায়ে টাকা নেয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় প্রতারক চক্র। এভাবেই দেশে লক্ষ লক্ষ বেকার চাকরি প্রত্যাশী যুবক-নারীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

এদিকে একইভাবে অনলাইনে সাবেক আর্মি অফিসারের বডিগার্ড, বাসা-বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীসহ বিভিন্ন পদে চাকরির নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারণা করে আসছে আরেকটি চক্র। চাকরিপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে সালমা আক্তার মুন্নি নামের এক নারীকে আটক করে র‌্যাব।

র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মুন্নি জানান, তিনি সংঘবদ্ধ এমএলএম প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। ‘বিডি জবস বিডি’ নামে তার একটি পেজ থেকে বিভিন্ন পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। তারা সাধারণ মানুষের বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া নিয়োগপত্র দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

যেভাবে প্রতারণা করা হতো :
র‌্যাব জানায়, অনলাইনে তাদের বিজ্ঞাপন দেখে কেউ সিভি পাঠালে অফিস থেকে চাকরিপ্রার্থীদের মোবাইল ফোনে একটি নির্দিষ্ট তারিখে অফিসে যেতে বলা হতো। এরপর কথিত ইন্টারভিউ নিয়ে অফিসের ফরম বাবদ ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। এরপর চাকরিপ্রার্থীদের ইন্টারভিউ নিয়ে চাকরি নিশ্চিত হয়েছে জানিয়ে যোগদানের আগে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা জামানত নেওয়া হতো। এছাড়া পদ অনুযায়ী মাসিক বেতন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো।

পরে সেখানে যোগ দিলে তাদের নিয়োগপত্রে উল্লেখ করা হতো, প্রতি মাসে অন্তত ১০ জন নতুন চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহ করতে হবে। নতুন চাকরিপ্রার্থী সংগ্রহের ভিত্তিতেই তাদের বেতন দেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করতেন। এসময় ভুক্তভোগীরা প্রতারণার বিষয় বুঝতে পারলে জামানতের টাকা ফেরত চাইলেও তা আর দেওয়া হতো না। এভাবে গত ছয় মাসে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় এক হাজার ২৫০ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

র‌্যাব জানিয়েছে, অভিযুক্ত সালমা আক্তার মুন্নির বাড়ি মাদারীপুরে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের এই তরুণির রয়েছে উচ্চাভিলাসী মনোভাব। এইচএসসি পাসের পর ২০২০ সালে হাবিবুর রহমান নামে এক প্রতারকের মাধ্যমে ‘এনএইচ সিকিউরিটি সার্ভিস লিমিটেড’ চালু করেন। চাকরিপ্রত্যাশী দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের টার্গেট করেই মূলত তার প্রতারণা চলছিল।

জানা যায়, সম্প্রতি বিদেশি কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে শারিরিক পরীক্ষার নামে নগ্ন ছবি তোলে প্রতারণার ঘটনায় আটক করা হয় ফাহাদ নামের এক যুবককে। র‌্যাবের হাতে আটক ফাহাদের মোবাইল ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রায় ৫শ’ নারীর নগ্ন ভিডিও উদ্ধার করা হয়। ফাহাদ এই সকল নারীদের ভিডিও ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দিয়ে নিয়মিত টাকা আদায় করতো।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেন, সচেতনতার বিকল্প কিছু নাই। বিজ্ঞাপন দেখলেই সেখানে আবেদন করে টাকা দিতে হবে এমন না। আগে যাচাই বাছাই করা প্রয়োজন। তারপরও অগ্রসর হতে হবে। যারা প্রতারিত হয়েছেন তাদের র‌্যাব অথবা পুলিশের স্মরাণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, দিন দিন এ প্রতারণার সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের সাইবার টিম মনিটরিংও করছে। যারা প্রতারিত তারা সরাসরি অভিযোগ দিলে এ সকল প্রতারকদের আইনের আওতায় আনতে আরো সুবিধা হবে।

-বাবু/এ.এস






Loading...
Loading...


অর্থনীতি এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy