উপকারী ধানচিল : কৃষকের বন্ধু, ইঁদুরের যম

বুলেটিন ডেস্ক

ফিচার

বিকেলবেলা নদীর ধারের চরে জমে উঠত ফুটবল খেলা। গ্রামের শিশুদের খালি গায়ে খালি পায়ে সেই খেলার মজাই ছিল

2023-04-12T12:18:09+00:00
2023-04-12T12:18:09+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
উপকারী ধানচিল : কৃষকের বন্ধু, ইঁদুরের যম
বুলেটিন ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৩, ১২:১৮ পিএম   (ভিজিট : ৫০৭)
X


বিকেলবেলা নদীর ধারের চরে জমে উঠত ফুটবল খেলা। গ্রামের শিশুদের খালি গায়ে খালি পায়ে সেই খেলার মজাই ছিল আলাদা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, খেলাধুলায় আমার কোনোকালেই কোনো আগ্রহ ছিল না, আগ্রহ ছিল অন্য কিছুতে। তাই বন্ধুরা যখন খেলায় মেতে উঠত, আমি তখন নদীর ধারে বসে তাকিয়ে থাকতাম বাতাসের দোলায় দুলতে থাকা সবুজ ধানখেতগুলোর দিকে। সেদিকে একমনে তাকিয়ে থাকতে গিয়ে একটা পাখিকে প্রায়ই ধানখেতের উপর উড়ে বেড়াতে দেখতাম।

পাখিটার চালচলন ছিল অন্যান্য পাখিদের চাইতে ভিন্ন। সে এক জায়গায় অনেকক্ষণ স্থির হয়ে উড়ে থাকতে পারত। কিছুক্ষণ এক জায়গায় স্থির থাকার পর হঠাৎ সে বিদ্যুৎগতিতে নেমে আসত ধানখেতের বুকে। অল্প সময়ের জন্য সে অদৃশ্য হয়ে যেত ধানখেতের ভিতর। কয়েক মুহূর্ত পর যখন সে খেতের ভিতর থেকে আকাশে উড়ে যেত, তখন তার পায়ের নখে ছটফট করতে দেখা যেত মেঠো ইঁদুরের দেহ। মাঝেমধ্যে গিরগিটিও চোখে পড়ত।

শিকার মুখে নিয়ে পাখিটা কাছাকাছি কোনো গাছের ডালে গিয়ে বসত। তারপর তীক্ষ্ণ ঠোঁটের সাহায্যে শিকারের দেহ ছিঁড়ে সেটাকে ভক্ষণ করে আবার উড়ে আসত ধানখেতের উপর।

পাখিটার শিকার করার কৌশল আর এর ক্ষিপ্র গতি দেখে আমি মোহিত হয়ে যেতাম। একদিন আমার এক বন্ধু গুলতি নিয়ে ধানখেতের উপর উড়তে থাকা পাখিটাকে মারতে গিয়েছিল। মাঠের কয়েকজন কৃষক গুলতি তাক করে পাখিটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় আমার বন্ধুকে বাধা দেয়। তাদের কাছ থেকে জানতে পারলাম এই পাখি কৃষকের পরম বন্ধু। অনিষ্টকারী ইঁদুর ও ক্ষতিকারক পোকামাকড় খেয়ে এরা মাঠের ফসল রক্ষা করে থাকে।

এই পাখিরা সবচেয়ে বেশি উপকার করে ধানখেতগুলোর। প্রতিনিয়ত ইঁদুর নিধন করে ধানগাছগুলোকে এদের অত্যাচার থেকে রক্ষা করে থাকে। কৃষকদের কাছে পাখিটার উপকারিতার কথা শুনে আমার শিকারি বন্ধুটি গুলতি হাতে মাঠ থেকে ফিরে আসে। ছেলেবেলায় দেখা সেই উপকারী পাখিটিকে বড় হওয়ার পর আমি বাংলাদেশের বহু স্থানে দেখেছি। দেশের বিভিন্ন স্থানে এরা বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোনো কোনো স্থানে এদেরকে বলা হয় ধানচিল। কারণ বেশিরভাগ সময় এদের ধানখেতের উপর উড়তে দেখা যায়। আর আমার মনে হয় এটাই ওদের সার্থক নাম।

কোনো কোনো স্থানে এরা আবার ধলা চিল নামেও পরিচিত। ধলা মানে সাদা। যেহেতু এর শরীরের বেশিরভাগ অংশের রং সাদা, তাই হয়তো এই নামকরণ। অনেকে এদের কাটুয়া চিল, মেঠো চিল কিংবা আদাবাজ বলেও ডাকে। ইংরেজিতে এরা পরিচিত Black Winged Kite নামে, আর এদের বৈজ্ঞানিক নাম Elanus caeruleus.


বাংলাদেশের অনেক গ্রামে এখনো ধানচিলদের দেখা যায়। তবে আগের চাইতে সংখ্যা অনেক কম। এই পাখিদের শিকার ধরার সময় আকাশের এক জায়গায় স্থির হয়ে উড়তে থাকাকে ইংরেজিতে বলা হয় হোভারিং। আমাদের দেশের হাতেগোনা মাত্র কয়েক প্রজাতির পাখি হোভারিং করে শিকার ধরে থাকে। এদের মধ্যে অন্যতম দক্ষ এবং দুঃসাহসী পাখি হচ্ছে ধানচিল। গাছের মগডালে কিংবা বিদ্যুতের খুঁটির উপর এরা চুপ করে বসে থেকে শিকারের অবস্থান খুঁজতে থাকে।

ধানচিলের দৃষ্টিশক্তি খুবই প্রখর। ইঁদুর বা পোকামাকড়ের নাড়াচাড়া চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে উড়তে শুরু করে। শিকারের অবস্থানের ঠিক উপরে গিয়ে হোভারিং করতে থাকে। তারপর সুযোগ বুঝে হঠাৎ বিদ্যুৎগতিতে মাটিতে নেমে এসে শক্ত থাবা দিয়ে শিকারকে আঁকড়ে ধরে। এরা খুবই দুঃসাহসী এবং হিংস্র পাখি। যেসব ইঁদুরকে বিড়াল পর্যন্ত দেখলে ভয় পাবে, সেসব মেঠো ইঁদুরকেও তারা আক্রমণ করে মাটিতে চেপে ধরে হত্যা করে। তারপর ভক্ষণের উদ্দেশ্যে সেটাকে নিয়ে কোনো গাছের ডালে গিয়ে বসে। এদের খাদ্য তালিকায় অবশ্য ছোট আকৃতির গিরগিটিও রয়েছে।

ধানচিল দেখতে খুবই সুন্দর। এদের ডানাগুলোর রং কালো, মাথা ও বুক ধবধবে সাদা। পিঠ ছাইরঙা। তবে এদের দেহের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হচ্ছে এদের চোখ। টকটকে লাল সেই চোখ দেখেই বুঝা যায় এরা খুবই রাগী স্বভাবের পাখি। প্রজননকালে একটি পাখি অন্যটিকে ছেড়ে খুব বেশি দূরে যায় না।

অন্যান্য পাখিদের মত অহেতুক ডাকাডাকি করার স্বভাব এদের নেই। তবে কোনো কারণে সঙ্গী পাখিটি যদি অনেক দূরে চলে যায় কিংবা কোনো শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয় তবে এরা তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে, সেই ডাক বহুদূর থেকে শুনতে পাওয়া যায়।

শীতের শেষে এরা বাসা বানাতে শুরু করে। উঁচু গাছের মগডালে এরা বাসা তৈরি করতে পছন্দ করে। এদের বাসার আকার অনেকটা পাতি কাকের বাসার মত। বাসা তৈরি করতে এরা বেশ কিছুদিন সময় ব্যয় করে। বাসা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর স্ত্রী পাখিটি ডিম পাড়তে শুরু করে। এদের ডিমের সংখ্যা তিন থেকে চারটি। ডিমের রং সাদাটে ধরনের, হালকা বাদামি ছোপ থাকে। 
বাসা তৈরির সময় স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দুজনে যেমন একসাথে কাজ করে, তেমনি উভয়ে মিলে ডিমে তা দেয়। একসময় ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে আসে। দুজনেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে বাচ্চা লালনপালনে। গুইসাপ কিংবা সাপ এদের বাসার ধারেকাছেও ঘেঁষতে সাহস পায় না। কারণ ধানচিলের নখের তীব্র আক্রমণের কথা শিকারি প্রাণীদের ভালো করেই জানা আছে।

বর্তমান সময়ের প্রকৃতিতে ধানচিলের সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে গিয়েছে। বিগত সময়ে এয়ারগানের যথেচ্ছ ব্যবহারে দেশজুড়ে শত শত ধানচিলের মৃত্যু হয়েছে। তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে বাসা তৈরির উপযোগী উঁচু গাছের সংখ্যা কমে যাওয়া। মানুষ তাদের প্রয়োজনে একে একে প্রাচীন সব বৃক্ষ আগেই নিধন করে ফেলেছে, এখন গাছ একটু বড় হলেই তা কেটে ফেলা হয়। জমিতে অবাধে কীটনাশক ব্যবহার করার ফলে অর্ধমৃত কীটপতঙ্গ খেয়ে বহু ধানচিলের মৃত্যু হয়েছে। যে পাখি ফসলখেতের অনিষ্টকারী ইঁদুর ও পোকামাকড় খেয়ে এত উপকার করে থাকে, তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। দেশের অনেক স্থানে কৃষকেরা এখনও এই পাখিকে তাদের বন্ধু বলে মনে করেন। বর্তমান সময়ে পাখিটি বিপন্ন অবস্থায় প্রকৃতিতে টিকে আছে।

কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে, ধানচিল বেঁচে থাকলে কৃষক সমৃদ্ধ হবে। কৃষকের এই বন্ধুকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। যে প্রতিনিয়ত আমাদের উপকার করে কেন সে এগিয়ে যাবে বিপন্নতার পথে? এমন পরম বন্ধুকে সকল প্রকার বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। দেশের পরিবেশ আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে হবে, যাতে করে আবার আমরা দেখতে পাই, প্রতিটি ধানখেতের উপর নির্ভয়ে উড়ে চলেছে ধান চিল।

-বাবু/এ.এস





  বিষয়:   কৃষক  ধানচিল 



Loading...
Loading...


ফিচার এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy