বাঙ্গালীর প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ কাল। উৎসব উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীতে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। উড়োচিঠিতে হুমকি এবং নাশকতার বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো রমনা এলাকা কঠোর নিরাপত্তার আওতায় আনা হচ্ছে। পুরো এলাকাজুড়ে রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। আকাশপথে থাকবে র্যাবের হেলিকপ্টার টহল। গতবারের চেয়ে এবারের পহেলা বৈশাখের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো কঠোর হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এছাড়াও সারাদেশে উৎসবের এই আয়োজনকে ঘিরে সতর্ক থাকবে নিরাপত্তাবাহিনী।
‘শোভাযাত্রা’ কাজটা শিরকের এখানে এসে ক্ষতি করোনো তোমাদের। হামলা হতে পারে এনিটাইম। ওইদিনের দাজ্জালি বাহিনী পাবে না টের মোদের’
এরই মধ্যে গতকাল বুধবার ঢাবির চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে একটি উড়ো চিঠি আসে। এ নিয়ে থানায় জিডিও করা হয়েছে। জিডির সার্বিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যে পহেলা বৈশাখের নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশ সদর দফতর ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ একাধিকবার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক আজ বৃহস্পতিবার পহেলা বৈশাখের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে নগরবাসীকে অবহিত করবেন। একই সঙ্গে র্যাবের মহাপরিচালক এম খুরশিদ হোসেন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবক্ষেণ করে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ন কমিশনার বিপ্লব কুমার বিশ্বাস (ক্রাইম) জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও পহেলা বৈশাখেও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ রাজধানীর নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো রমনা এলাকায় নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা করবে।
তিনি জানান, রাজধানীর রমনা পার্ক ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে অর্ধশতাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) বসানো হচ্ছে। এগুলো সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করার জন্য একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। সিসিটিভিগুলো সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিংয়ের জন্য একটি কন্ট্রোল রুম থাকবে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জানান, পহেলা বৈশাখের আগের দিন বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে র্যাব ও পুলিশ রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, শাহবাগ চত্বর এলাকায় মেটাল ডিটেক্টর এবং ডগ স্কোয়ার্ড দিয়ে নিরাপত্তামূলক সুইপিং করবে। বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যে সুইপিং শেষে পার্কে প্রবেশের সব গেট বন্ধ করে দেয়া হবে। গেটে অবস্থান নেবে পুলিশ। এবারো রমনা পার্কে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হবে। প্রতিবারের ন্যায় এবারো জনসাধারণকে নিরাপত্তা তল্লাশির পর নির্ধারিত ৪টি গেট দিয়ে পার্কের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হবে। একইভাবে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবর এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। সেখানেও চলবে নিরাপত্তা তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি।
কর্মকর্তারা জানান, পহেলা বৈশাখের প্রথম প্রহরে চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে বের হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার ওপর বিশেষ নজর রাখা হবে। চারুকলার ছাত্রছাত্রীরা বর্ণিল সাজে সেজে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করবে। জঙ্গি বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যরা শোভাযাত্রার ভিড়ের মধ্যে ঢুকে যেন নাশকতা ঘটাতে না পারে সে দিকে গোয়েন্দারা সতর্ক নজরদারি চালাবে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দারা শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করেছে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক খন্দকার আল মঈন জানান, গত বছরের মতো এবারো পহেলা বৈশাখের নিরপত্তায় র্যাব বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। র্যাবের প্রায় তিন হাজার সদস্য এইদিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত রাজপথে থাকবে। আরো থাকবে বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ টিম ও ডগ স্কোয়াড।
তিনি বলেন, রমনা পার্কের ভেতরে ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করে বাইনোকুলার এবং ভিডিও ক্যামেরার মাধ্যমেও র্যাবের পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের সদস্যরা নজরদারি চালাবে। সকাল থেকে রাজধানীর আকাশে র্যাবের হেলিকপ্টার টহল দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া পুরো রমনা এলাকায় র্যাবের টহল অব্যাহত থাকবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পহেলা বৈশাখ রাজধানীর কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হবে। শাহবাগ থেকে টিএসসি, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মোড়, কদম ফোয়ারা, মৎস্য ভবন মোড়, হয়ে রূপসী বাংলা মোড় পর্যন্ত সড়কগুলোতে কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেয়া হবে না।
এদিকে শুধুমাত্র রাজধানী নয় সারাদেশের মানুষ যেন বাঙ্গালীর এই প্রাণের উৎসব নির্বিঘ্নে করতে পারে সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে। দেশজুড়েই র্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও সতর্ক থাকবে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) মঞ্জুরুল আলম বলেন, পুলিশ সদর দফতরে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানকে ঘিরে সারাদেশের পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন। সব ধরনের হুমকি মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিটিটিসি ইউনিটের প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রার নিরাপত্তায় সোয়াট কাজ করবে। এছাড়াও সাদা পোশাকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা-সদস্য মোতায়েন থাকবে। গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হারুনুর অর রশিদ বলেন, পহেলা বৈশাখের নিরাপত্তায় ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে গোয়েন্দা বিভাগ। কাল শুক্রবার নববর্ষের দিনও গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিটি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সদস্যরা মাঠে কাজ করবে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি হবে না বলেও জানান এ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এদিকে পয়েলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রায় হামলার হুমকি দিয়ে চিরকুট পাঠানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের এক শিক্ষার্থীর কাছে। চিরকুটে বলা হয়েছে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ কাজটা শিরকের। এখানে এসে ক্ষতি করো না তোমাদের। এ ঘটনায় আবতাহী রহমান (২৫) নামে এক শিক্ষার্থী শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডি নং ১৫২৭।
জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযোগকারীর নাম আবতাহী রহমান। তিনি শাহবাগ থানাধীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা উপলক্ষ্যে গঠিত অর্থ ও নিরাপত্তা কমিটির সদস্য। গত মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) রাত পৌনে ১০টার দিকে চারুকলা অনুষদ পশ্চিম পার্শ্বের দেয়ালে রঙের কাজে তদারকিকালে একটি প্লাস্টিক চেয়ারের ওপর সাদা কাগজে একটি পঞ্চাশ টাকার নোট পাই। ওই কাগজে লেখা দেখতে পাই ‘শোভাযাত্রা’ কাজটা শিরকের এখানে এসে ক্ষতি করোনো তোমাদের। হামলা হতে পারে এনিটাইম। ওইদিনের দাজ্জালি বাহিনী পাবে না টের মোদের’, লিখা ছিল। পরে এ বিষয়ে আমাদের চারুকলা অনুষদের প্রক্টরিয়াল টিমের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সাধারণ ডায়েরি করেন আবতাহী রহমান। এ ব্যাপারে রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. শহিদুল্লাহ বলেন, একটা উড়ো চিরকুট এসেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রায় হামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখছি।