আড়াইশ দোকান পুড়ল নিউ সুপার মার্কেটে

ইমরান আলী

জাতীয়

মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে বঙ্গবাজারের পর এবার পুড়ল নিউমার্কেট। ঈদের আগে কপাল পুড়ল শত শত ব্যবসায়ীর। ধূম কেনাকাটায়

2023-04-16T12:35:20+00:00
2023-04-16T13:41:09+00:00
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬ ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
শনিবার ৮ আগস্ট ২০২৬
   
নাশকতা কিনা খতিয়ে দেখছে র‌্যাব পুলিশ
আড়াইশ দোকান পুড়ল নিউ সুপার মার্কেটে
ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করে সেনা নৌ-বিমান, বিজিবি র‌্যাব ও পুলিশ
ইমরান আলী
প্রকাশ: রোববার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৩, ১২:৩৫ পিএম  আপডেট: ১৬.০৪.২০২৩ ১:৪১ পিএম  (ভিজিট : ১৬৫)
X


মাত্র দশ দিনের ব্যবধানে বঙ্গবাজারের পর এবার পুড়ল নিউমার্কেট। ঈদের আগে কপাল পুড়ল শত শত ব্যবসায়ীর। ধূম কেনাকাটায় যখন ব্যবসায়ীদের দম ফুরানোর সময় ঠিক এই সময়ে আগুন কেড়ে নিল সবই। পুড়ে যায় আড়াইশ দোকান আর ক্ষতিগ্রস্থ হয় আরো প্রায় হাজার খানেক। ভোর ৫ টা ৪০ মিনিটে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে সকাল সোয়া ৯ টার দিকে। ফায়ার সার্ভিসের ৩২ টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করে। একের পর এক বিস্ফোরণ আর ধারাবাহিক আগুনের ঘটনা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন এ কোন অভিশাপের আগুন!

আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিও উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাব মহাপরিচালক থেকে শুরু করে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার পর থেকে মানুষের মুখে মুখে প্রশ্ন উঠেছে- এই আগুন কী দুর্ঘটনার নাকি প্রতিহিংসার!

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বলেন, ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিস দ্রুত ঘটনাস্থলে আসে। ৩২ টি ইউনিটের চেষ্টায় সকাল ৯ টা ১০ মিনিটের দিকে নিয়ন্ত্রণে আসে।

এদিকে আগুন লাগার পর থেকে সময় যত বাড়তে থাকে আগুনের ভয়াবহতাও বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটের সংখ্যাও। একে একে ৩২ টি ইউনিট যোগ দেয়। এক পর্যায়ে ঢাকা কলেজের পুকুর থেকে পানি নিয়ে এসে নিয়ন্ত্রণের কাজ করতে দেখা যায়। এছাড়াও ওয়াসাও গাড়িতে করে পানি এনে ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তা করে। ফায়ার সার্ভিসকে সহায়তায় এগিয়ে আসে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। এছাড়াও পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবিও এগিয়ে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর দেখা যায় আড়াইশ’র বেশি দোকান পুড়ে গেছে। আর ক্ষতিগ্রস্থ হয় আরো প্রায় হাজার খানেক দোকান। ঘটনাস্থলে আসেন ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকসহ ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, রাজধানীর নিউ সুপার মার্কেটের আগুনের ঘটনা দুর্ঘটনা নাকি অন্যকিছু তা খতিয়ে দেখা হবে। 
তিনি বলেন, আপনারা জানেন আমাদের মার্কেটগুলো যেভাবে তৈরি করা, যার বেশিরভাগই ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিস অনেকগুলো মার্কেট ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে তদন্ত করব। এগুলো নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও কারণ আছে তা খতিয়ে দেখা হবে।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, আগে সায়েন্সল্যাব ও গুলিস্তানে দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, এরপর বঙ্গবাজারে একটি বড় আগুনের ঘটনা ঘটলো। গতরাতে হাজারীবাগের ট্যানারিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আজকে ভোরে আবার এ নিউ সুপার মার্কেটে আগুন লেগেছে। বিস্ফোরণের দুটি ঘটনাতেই আমরা মামলা নিয়েছি। বঙ্গবাজারে আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আর আমরা ইন্টারনাল তদন্ত করেছি।

আমাদের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিস্ফোরণের দুটি ঘটনা প্রাকৃতিক গ্যাস জমার কারণে হয়েছে। আমাদের তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনও নাশকতার আলামত খুঁজে পাইনি। আর দুটি আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্ত প্রতিবেদন দেখলে বুঝতে পারব এগুলো নাশকতা নাকি দুর্ঘটনা।

ডিএমপি কমিশনার বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বের পাশাপাশি মানবিক পুলিশিংটাও আমরা করে থাকি। কোনও ঘটনা ঘটলে আমাদের সবার আগে বলা থাকে ফায়ার সার্ভিস যেন নির্বিঘ্নে আগুন নেভানোর কাজ করতে পারে। মানুষজন যেন ফায়ার সার্ভিসের যাতায়াতের পথে কোনও প্রকার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে না পারে সেই ব্যবস্থা করা।

তারপর কোনো জিনিসপত্র কেউ যেন লুটপাট না করে সেই বিষয়টা দেখা এবং মানবিক পুলিশিং আমাদের তিন নম্বর কাজ। এর জন্য যদি আমাদের ঝুঁকি নিতে হয়, তবে আমরা সেই ঝুঁকি নিতে রাজি আছি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই র‌্যাবের মহাপরিচালকের নির্দেশনায় র‌্যাব ফোর্সেস এর ঢাকাস্থ ব্যাটালিয়নসমূহ হতে টহল দল ও সাদা পোষাকের দল দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করে। র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করে ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে উৎসুক জনতাদের নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বক্ষণিক কাজ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন দোকান হতে মালামাল বের করে দোকান মালিকদের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করতে সহযোগিতা করে র‌্যাব সদস্যরা। এছাড়াও, আগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আসা বিভিন্ন সংস্থার সদস্য ও ভলান্টিয়ারদের খাবার পানি সরবরাহ করে র‌্যাব সদস্যরা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোন ধরনের নাশকতা রয়েছে কিনা- এ বিষয়ে র‌্যাবের গোয়েন্দারা কাজ করছে।

অন্যদিকে দুই মার্কেটেই আগুন লাগার সময় মোটামুটি একই। বঙ্গবাজারে আগুন লেগেছিল ভোর ৬টা ১০ মিনিটে, আর আজ নিউ সুপার মার্কেটে আগুন লাগে ভোর ৫টা ৪০ মিনিটে। দুই মার্কেটেই ক্ষতির চিত্রেও মিল রয়েছে। ঈদের আগে বেচাকেনার জন্য আলাদাভাবে প্রস্তুতি নেওয়া ছিল ব্যবসায়ীদের। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। আগুন কেড়ে নিয়েছে সব। নিউ সুপার মার্কেট মূলত কাপড়ের মার্কেট। এখানে শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস, শার্ট-প্যান্ট এবং পাঞ্জাবিসহ নানা ধরনের কাপড় ছিল। এছাড়াও খেলনা এবং আসবাবপত্র সহ নানা ধরনের পণ্য ছিল।

এই মার্কেটের তৃতীয় তলার ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বলেন, গত রাত ২টা পর্যন্ত দোকানে ছিলাম। ভোরে খবর শুনি, আগুন লেগেছে। এসে দেখি মার্কেটের তৃতীয় তলায় আগুন জ্বলছে। কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তিনি আরও বলেন, আগুনে আমার দোকানের সব কিছু পুড়ে গেছে। আমার স্বপ্ন শেষ ভাই। আমি এখন কী করব? ঈদ উপলক্ষ্যে ঋণ করে ১০ লাখ টাকার মাল এনেছি, আজকে সব পুড়ে ছাই।

নোঙর ফ্যাশন নামে একটি দোকানের মালিক রফিকুল ইসলাম রোকন বলেন, আমার আর কিছুই শেষ হওয়ার বাকি নেই। যা কিছু ছিল সব আগুনে শেষ হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে দেখছি আমার সব সম্পদ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। কিছুই করতে পারছি না। মালামাল বের করতে পারছি না। স্ত্রীর গহনা বিক্রি করে টাকা দিয়ে মালামাল উঠিয়েছি। এখন আমি কী জবাব দেব তাকে?

ব্যবসায়ী নূপুর বেগম বলেন, আমাদের তিন দোকান ছিল, এর মধ্যে একটা দোকানের অর্ধেক মাল নামিয়েছি। আর সব পুড়ে গেছে। আমার ভাই কথা বলছে না, পাগলের মতো হয়ে গেছে। আমার ভাই ফকির হয়ে গেছে। লাখ লাখ টাকার মাল সব গেছে। তিন দোকানই শেষ আমাদের। আবু সাঈদ নামে একজন ব্যবসায়ী বলেন, নিউ সুপার মার্কেটে আমাদের চারটি দোকান ছিল। এই চার দোকানের সব মালামাল আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। এখন আমরা কী করব? কোথায় যাব, কার কাছে বিচার চাইব?

এই আগুনের জন্য সিটি করপোরেশনকে দায়ী করছেন নিউ সুপার মার্কেটের মালিক সমিতির সভাপতি মো. শহিদুল্লাহ। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের লোক রাত ৩টার দিকে ব্রিজ ভাঙার কাজ করছিল। ব্রিজের ওখানে আমাদের কারেন্টের লাইন আছে সেটা তারা খেয়াল করেনি। ওই লাইনের ওপর বুলডোজার চালানোর সময়ই আগুনের সূত্রপাত হয়। তারা কোনো পরিকল্পনা না করে এই ব্রিজ ভাঙার কারণে আজ এই দশা হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মার্কেট খোলা হবে না বলে জানিয়েছেন নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন।

তিনি বলেন, নিউমার্কেটের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা প্রাধান্য দিচ্ছি। সব দোকান মালিকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা এখানে অবস্থান করছি। যতক্ষণ পর্যন্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না হবে অর্থ্যাৎ সম্পূর্ণভাবে আগুন না নিভবে ততক্ষণ পর্যন্ত মার্কেট খোলা হবে না। সবার সাথে বসে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

-বাবু/এ.এস





  বিষয়:   দোকান  নিউ মার্কেট 



Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy