
X
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা পাবনা। এখানে এক সময় বিশেষ করে সাঁথিয়া-বেড়ায় (পাবনা-১) বিএনপি-জামায়াতের প্রাধান্য থাকলেও দিন বদলের সাথে সাথে এ জেলার রাজনৈতিক পরিবেশও পাল্টে গেছে। পাবনার অন্যান্য ৪টি আসনেই এখন আওয়ামী লীগের প্রাধান্য রয়েছে।
পাবনা-১ (সাঁথিয়া ও বেড়া) : দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে পাবনা-১ আসনে। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর তৎপরতা। নানা কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। পাবনা-১ আসনটি (উপজেলার আংশিক) নিয়ে গঠিত। আসনটি একসময় জামায়াতের ভোটব্যাংক বলা হতো। কিন্তু সে চিত্র পাল্টেছে, শোনা যাচ্ছে এ আসনের বেশিরভাগ মানুষ চায় না আসনটি ফের জামায়াতে ইসলামীর কাছে চলে যাক। এখন আওয়ামী লীগ আসনটিতে শক্ত অবস্থান রয়ে গেছে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের টুকুর কাছে হেরে যান জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৬ সালের মে মাসে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হয়। এই আসনে ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে পরপর তিনবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী শামসুল হক টুকু সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনিই দল থেকে মনোনয়ন পাবেন বলে শোনা যাচ্ছে। অধ্যাপক আবু সাইয়িদ সংস্কারপন্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত। তিনি গণফোরামে থেকে প্রার্থী হতে পারেন। এছাড়া সাঁথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ারে নাম শোনা যাচ্ছে।
বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইতে পারেন সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক এমপি মেজর অব. মনজুর কাদের। তিনি এই আসনটিতে হেভিওয়েট প্রার্থী হতে পারেন। সাঁথিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামছুল ইসলাম ওরফে ভিপি শামছুল, জাতীয়তাবাদী তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহসভাপতি সিআইপি ইউনুস আলী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল বাসেত খানও এই আসন থেকে লড়তে পারেন।
পাবনা-২ (সুজানগর-বেড়ার ৫টি ইউনিয়ন) : সুজানগর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন এবং বেড়া উপজেলার আংশিক (৫টি ইউনিয়ন) নিয়ে গঠিত পাবনা-২ নির্বাচনী আসন। পাবনা ২ আসন আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বলা হয়। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত আহমেদ ফিরোজ কবির বিএনপির একেএম সেলিম রেজা হাবিবকে হারিয়ে এই আসনে নির্বাচিত হন। আগামী দ্বাদশ নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি শুরু করেছে বড় দলগুলো। ক্ষমতাসীন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে বিভিন্ন সভা, সমাবেশ, মতবিনিময় সভা করছেন। জানা গেছে, আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য আহমেদ ফিরোজ কবির নির্বাচনী এলাকায় ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন। নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও যোগাযোগ বেশ ভালো। এছাড়াও আসনটিতে সাবেক সংসদ সদস্য খন্দকার আজিজুল হক আরজু, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা আশিকুর রহমান খান সবুজ, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আব্দুল মতীন, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা খন্দকার জাহাঙ্গীর কবির রানা এবং সুজানগর উপজেলার চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিনুজ্জামান শাহিন মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন।
নির্বাচনে আসলে এবার আসন ফিরে পেতে চেষ্টা করবে বিএনপি। বিএনপি নির্বাচনে এলে সম্ভাব্য প্রার্থীরা হলেনÑ সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম সেলিম রেজা হাবিব, কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন ও জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম সাজ্জাদ।
পাবনা-৩ : চাটমোহর উপজেলার ১১ টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা , ভাঙ্গুড়া উপজেলার ৬ ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা ও ফরিদপুর উপজেলার ৬ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে পাবনা জেলার এই সর্ববৃহৎ আসনটি গঠিত। আসনটিতে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ভোটারদের মন জয় করতে মাঠে নেমেছে। আসনে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের ১০ জন, বিএনপির ৬ জনসহ দেড় ডজন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন বিএনপি প্রার্থী গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সাইফুল আযমকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আ স ম আব্দুর রহিম পাকন তিনি এ আসনে হেভিওয়েট মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় আরও আছেন পাবনা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট শাহ আলম,পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি চাটমোহর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ মাস্টার, চাটমোহর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম নজরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল আলিম, ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র খ ম কামরুজ্জামান মাজেদসহ প্রায় এক ডজন প্রার্থী। অন্যদিকে, বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী তালিকায় রয়েছেন- চাটমোহর বিএনপির আহ্বায়ক সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, পাবনা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাকসুদুর রহমান মাসুদ ও চাটমোহর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব হাসাদুল ইসলাম হীরাসহ মনোনয়নপ্রত্যাশী।
পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া) : পাবনা জেলার ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা নিয়েই পাবনা-৪ আসন। প্রবীণ রাজনীতিবিদ প্রয়াত শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর মৃত্যুর পর আসনটি শূন্য হলে উপনির্বাচনে জেলার মুজিববাহিনী প্রধান বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ নুরুজ্জামান বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তিনি বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিবকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি এই আসনের সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছে।
আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন বর্তমান সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান বিশ্বাস, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্থ কমিটির চেয়ারম্যান ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম কৌঁসুলি সিনিয়র অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বুদু, প্রয়াত ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর ছেলে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সাকিবুর রহমান শরীফ কনক, সাবেক সংসদ সদস্য পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস, আটঘরিয়া পৌরমেয়র শহিদুল ইসলাম রতন, পাবনা জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রেজাউর রহমান লালসহ এক ডজন প্রার্থী। অপরদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীর তালিকায় রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম সরদার, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব।
পর পর পাঁচবার বিএনপি-জামায়াত জোট আসন হারালেও এবার পুনরুদ্ধার করতে চায় জামায়াতে ইসলামীও। মাঠ পর্যায়ে জনপ্রিয়তা থাকায় এখানে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবু তালেব প্রার্থী হতে চেয়েছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। এছাড়া উপজেলা জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকেও একজন প্রার্থী হওয়ার কথা শোনা গেলেও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে বিষয়টি এখনো পরিষ্কার হয়নি।
পাবনা-৫ (সদর) : পাবনা-৫ সদর আসনের রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা মাঠে কাজ শুরু করেছেন। এই আসনে ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। আওয়ামী লীগ আসনটিতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। গত তিনটি নির্বাচনেই আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স। ২০০৮ সালে জামায়াতের দুর্গ পাবনা-৫ আসনে নৌকার টিকিট পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুস সুবহানকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন তরুণ নেতা প্রিন্স। এবার আসনটিতে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন পাবনা পৌর ও সদর উপজেলার কয়েকবারের নির্বাচিত জনপ্রিয় চেয়ারম্যান জননেতা আলহাজ্ব মোশারফ হোসেন। এই আসনে তিনি হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বলে বাংলাদেশ বুলেটিনকে নিশ্চিত করেন তিনি। এছাড়া বন ও পরিবেশ বিষয়ক উপকমিটি ও পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মাজহারুল ইসলাম মানিক আসনটিতে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী। দলের নিবেদিত ত্যাগী নেতা মানিক আসনটির মনোনয়ন দৌড়ে শক্তদাবি রাখবেন বলে মনে করেন তার সমর্থকরা।
বিপরীতে জামায়াতের সাথে ঐক্যকে যেমন সাধারণ ভোটাররা মেনে নেয়নি তেমন দীর্ঘদিন ধরে আসনটিতে বিএনপির কোনো প্রার্থী না দেওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির শরিক জামায়াতকে আসন ছেড়ে দেওয়ায় বিএনপি কর্মীদের মধ্যে হতাশা রয়েই গেছে। গত নির্বাচনে শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস দলীয় মনোনয়ন পেলেও ঐক্যজোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নেতা অধ্যক্ষ মাওলানা ইকবাল হোসাইনকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হলে ভরাডুবি হয়। বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মীরা মনে করেন শিমুল বিশ্বাস একক প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন পেলে জয় নিশ্চিত হবে।
আসনটিতে বাংলাদেশের ওয়াকার্স পার্টি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী ওয়াকার্স পার্টি পাবনা জেলার সভাপতি জননেতা কমরেড জাকির হোসেন। এছাড়া সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী হতে পারেন আব্দুল কাদের খান কদর ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের প্রার্থী হতে পারেন প্রভাষক বাকীবিল্লাহ।
-বাবু/এ.এস