
X
ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ না মানা আর অসচেতনতার কারণেই রাজধানীতে এতবেশি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে। বাড়ছে প্রাণহানি এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে একসময়ের সম্পদশীল ব্যক্তি। অথচ কিছু নিয়ম মানলেই বিশাল এই ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, মাত্র ৫৮টি বিল্ডিংয়ের তথ্যে ৩৫টিই অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ঢাকায় হাজার হাজার বিল্ডিংয়ের মধ্যে কতো বিল্ডিং ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে এটি বলা মুশকিল। অর্থাৎ পুরো ঝুঁকির মধ্যেই আমরা বসবাস করছি। গতকাল রোববার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড ম্যানন্টেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সূত্র মতে, ভয়াবহ সব অগ্নিকাণ্ডে মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও যেন আমরা ঘুমিয়ে আছি। বলতে গেলে মৃত্যুপুরিতে বসবাস। ঢাকার অধিকাংশ অগ্নিদুর্ঘটনা পূরাণ ঢাকায়। এর দায় ভয়ঙ্কর কেমিক্যাল। পুরো পুরাণ ঢাকায় ছোট বড় সবমিলিয়ে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন। পাশাপাশি অধিকাংশ মার্কেটও ঝুঁকিপূর্ণ। এই এলাকায় অতিঝুঁকি নিয়েই কোটি মানুষ দিন পার করছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, নিউ সুপার মার্কেটসহ রাজধানীতে ৯টি অতিঝুঁকিপূর্ণ, ১৪টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৫টি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ৫৮টি ভবন হালনাগাদ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
গতকাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মার্কেট-শপিংমলের অগ্নিঝুঁকি নিরসন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ বিষয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করছি। প্রতিবছর আমরা বিভিন্ন ভবন হালনাগাদ করি। এরপর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ভবন মালিককে জানাই। চিহ্নিত সমস্যাগুলো সমাধান না করলে আমরা ব্যানার টানিয়ে দিই, যেন জনগণ সচেতন হয়। আমাদের কার্যক্রমের লক্ষ্যই হচ্ছে জনসচেতনতা বাড়ানো। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে ১ হাজার ৫১১টি ভবন, মার্কেট, রেস্টুরন্ট হালনাগাদ করা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্নিনির্বাপণ করতে পারছি না। ভবনগুলোতে মহড়া না করার কারণে আমাদের যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে সেগুলো ব্যবহার করতে পারছি না। তিনি সবাইকে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ও মহড়া আয়োজন করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি মার্কেটের প্রতিটি জায়গায় পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করতেও আহ্বান জানান। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের কারণে দাহ্য হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি বলেও জানান তিনি। তাজুল ইসলাম বলেন, দোকানে, করিডোরে, সিঁড়িতে ও দোকানের সামনে মালামাল স্তূপ করে রাখা যাবে না। আর মার্কেটের ভেতরে কোনো ধরনের ধূমপান করা যাবে না।
তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতের শুরুতেই ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে হবে। ফায়ার সার্ভিসকে নির্বিঘ্নে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। অগ্নিনির্বাপণের সময় মার্কেটের মালামাল টানাহেঁচড়া করা যাবে না। এ সময় তিনি ঢাকা নিউ সুপার মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন।
এদিকে মার্কেটের পাশাপাশি বহুতল ভবনও অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। রাজধানীর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ভবনে অগ্নিনির্বাপণের কোনো ব্যবস্থা নেই। অতি ঝুঁকিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ, কম ঝুঁকিপূর্ণ এ তিন ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে ভবন মালিকদের অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা নেওয়ার জোর তাগিদও দেয়া হয়েছিল ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে। তবে সে তাগিদ উপেক্ষা করে আসছে ভবন মালিকরা।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর দেশে ১৬ হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। গত আট বছরে দেশে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছে দুই সহস্রাধিক মানুষ।
এদিকে ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলি ও ২০১৯ সালে চুড়িহাট্টায় ঘটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। নিমতলিতে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয় ১২৪ তাজা প্রাণ, আর চুড়িহাট্টায় ৭১। দু’বারই সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বলা হয়েছিল খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরান ঢাকা থেকে দাহ্য রাসায়নিকের ব্যবসা স্থানান্তর করা হবে। তবে এখনো দাহ্য কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের হাত থেকে মুক্ত হয়নি পুরান ঢাকা।
দিন যত গেছে সেই তৎপরতা ততই কমেছে এবং কমতে কমতে এক সময় থেমে গেছে। চকবাজার যেমন ছিল তেমনই আছে, তেমনই আছে পুরান ঢাকা। কিছুই সরেনি, কিছুই নড়েনি। ২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলিতে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও এমনটাই ঘটেছিল। প্রাণের পর প্রাণ ঝরে, পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ কেমিক্যাল সরে না। গণমাধ্যমের সংবাদে ও মানুষের মনে দগদগে ঘায়ের মতো এসব স্মৃতি যত শুকিয়ে যায়, কর্তৃপক্ষের দায়দায়িত্বও ততই ফুরিয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ :
অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে ফায়ার সার্ভিসের প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য সুপারিশমালাগুলো হলো- অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে আবাসিক এলাকায় যে কোনো ধরনের রাসায়নিকের দোকান বা গুদাম স্থাপন করা যাবে না। পুরান ঢাকার সব রাস্তা ও গলিপথ বাধামুক্ত করে কমপক্ষে ২০ ফুট প্রশস্ত করতে হবে। এসব রাস্তায় স্ট্রিট হাইড্রেন্ট স্থাপন করে নির্দিষ্ট দূরত্বে পানির প্রবাহ নিশ্চিত রাখতে হবে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের সেই সুপারিশের পুরোপুরি বাস্তবায়ন ঘটেনি আজও। শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত বছর দাখিল করা একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ড ঠেকানোর ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। এদিকে সম্প্রতি ফায়ার সার্ভিস, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরের (জিজিএফআই) একটি সমন্বিত দল গাউছিয়া মার্কেট পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন শেষে পরিদর্শক দলের প্রধান ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স ঢাকা সদর জোন-১ এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. বজলুর রশিদ বলেন, মার্কেটগুলো ফায়ার সার্ভিসের চাহিদা ফুলফিল করতে পারেনি। ঢাকার বেশিরভাগ মার্কেটই আমাদের চোখে ঝুঁকিপূর্ণ। গাউসিয়া মার্কেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ মার্কেটের ছয়টি সিঁড়ি রয়েছে, কিন্তু সিঁড়িগুলো উন্মুক্ত নয়। দোকান বসার কারণে সবগুলোই অপ্রশস্ত হয়ে পড়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এসব সিঁড়ি দিয়ে পর্যাপ্ত মানুষ নামতে পারবে না। বৈদ্যুতিক তার যেখানে-সেখানে ঝুলে রয়েছে। এছাড়া মার্কেটটিতে স্বয়ংক্রিয় ফায়ার এলার্ম ব্যবস্থা স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল সেটি এখনও করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, এ মার্কেটে ৪৩০টি দোকান রয়েছে। মার্কেটের ওপরের তলাগুলোতে রয়েছে পাইকারি ব্যবসায়ীদের অফিস ও গুদাম। মার্কেটে ফায়ার এক্সটিংগুইশার আছে, এছাড়া যা যা থাকা দরকার তা নেই।
তিনি বলেন, ২০২০ সালে মার্কেটটিতে একটি মহড়া হয়েছিল। মহড়া শেষে বেশ কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল, যার কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভাতে কাজ করবে, সেজন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও এখানে নেই। রিজার্ভ পানি থাকলেও সেটা পর্যাপ্ত নয়। এ মার্কেটে ফায়ার টিম আছে বলে জানিয়েছেন মালিক সমিতি, তবে তার অস্তিত্ব পাইনি। এ সময় গাউছিয়া মার্কেট মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব মোহাম্মদ কামরুল হাসান বাবু বলেন, দু’বছর আগে ফায়ার সার্ভিস যে নির্দেশনা দিয়েছে তা পরিপূর্ণ করেছি। আমাদের ফায়ার সার্টিফিকেট আছে। এছাড়া সব ভবনেই কিছু ত্রুটি থাকে, আমাদের এখানে আউটডোরসহ যে ত্রুটি আছে তা দু-একদিনের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করব।
সিঁড়ির মধ্যে দোকান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব দোকান বসাতে সমিতির কোনো দায় নেই। কর্তৃপক্ষ যাদের দোকান বরাদ্দ দিয়েছে তারা জানেন এ বিষয়ে। সমিতির সভাপতি হিসাবে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কাজ আমার না। এরপরও ফায়ার সার্ভিস এসব দোকান সরাতে বলছে, আমরা কমিটির সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিব।
-বাবু/এ.এস