
X
# রুমাতে সন্ত্রাস নির্মূলে দফায় দফায় বিক্ষোভ
# চলছে যৌথ বাহিনীর অভিযান
# ‘সন্তানদের রক্ত বৃথা যাবে না দাবি স্বজনদের’
বান্দরবানে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন কুকিচিন’র আইইডি বিস্ফোরণ ও গুলিতে ফের দুই সেনা সদস্য নিহতের পর ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ওই এলাকার সর্বস্তরের মানুষ। ঘটনার পর এলাকাজুড়ে থমথমে অবস্থা বিরাজ করলেও স্থানীয়রা এ সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে দফায় দফায় বিক্ষোভ মিছিল করছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন তারা। তাদের দাবি নতুন করে গজিয়ে ওঠা এসব সন্ত্রাসীদের শেকড় পর্যন্ত উপড়ে ফেলতে হবে।
সেনা হত্যার ঘটনার পর থেকে স্থানীয় প্রশাসন ওই এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করেছে। চালানো হচ্ছে অভিযান। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। এদিকে নিহত দুই সেনাসদস্যকে তাদের গ্রামের বাড়িতে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে। নিহতের পরিবার বলছে, তাদের সন্তানের রক্ত বৃথা যাবে না। দেশের জন্য তারা জীবন দিয়েছে। যাদের জন্য জীবন দিতে হলো তাদের শেকড় উপড়ে ফেলার দাবি জানিয়েছেন তারা।
চট্রগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকেই পুলিশের অতিরিক্ত উপস্থিতি রয়েছে ওই এলাকায়। অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। পোশাকে এবং সাদাপোশাকে পুলিশ কাজ করছে।
জানা যায়, বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) সন্ত্রাসীদের আইইডি বিস্ফোরণ ও অতর্কিত গুলিতে সেনাবাহিনীর দুজন সৈনিক নিহত ও দুই অফিসার আহত হন। গত মঙ্গলবার বেলা দুইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। গত বুধবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বান্দরবানের রুমা উপজেলার সুংসুংপাড়া সেনা ক্যাম্পের আওতাধীন জারুলছড়িপাড়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আস্তানার খবর পাওয়া যায়। সুংসুংপাড়া সেনা ক্যাম্পের মেজর মনোয়ারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টহল দল মঙ্গলবার দ্রুততার সঙ্গে ওই স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। টহল দলটি জারুলছড়িপাড়ার কাছাকাছি ছড়ার কাছে পৌঁছালে বেলা ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) বোমা (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস আইইডি) বিস্ফোরণ ও অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। এতে দুজন কর্মকর্তা ও দুজন সৈনিক আহত হন। তাঁদের দ্রুত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে চিকিৎসারত অবস্থায় আহত দুই সৈনিক মারা যান। আহত দুই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন।
আইএসপিআর বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে কেএনএ বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার গহিন অরণ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অরাজক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। দেশমাতৃকার জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদ সেনাসদস্যদের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুতে সেনাবাহিনীর প্রধান গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।’
এর আগে চলতি বছরের মার্চে বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর কেএনএর অতর্কিত গুলিবর্ষণে সেনাবাহিনীর মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন নিহত হন। আহত হন আরও দুই সেনাসদস্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত বছরের ৯ অক্টোবর থেকে অভিযান পরিচালনা করছে। কেএনএফের কথিত সামরিক শাখার নাম কেএনএ। ইতিপূর্বে এ সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে দেশের নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই আস্তানায় সমতল থেকে আসা জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিতো বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে জানানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেএনএফ নামের সংগঠনটি গড়ে ওঠে বান্দরবানের রুমা উপজেলায়। এর প্রধান রুমা উপজেলা সদর বাজারের বাসিন্দা নাথান বম। তিনি ২০১২ সালে কুকি চিন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনস (কেএনডিও) নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেটি পরবর্তী সময়ে কেএনএফ নামের সশস্ত্র সংগঠনে রূপান্তর করেন।
এদিকে এ ঘটনার পর বান্দরবান জুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাহাড়ি এ সন্ত্রাসী গোষ্ঠির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে সাধারণ মানুষ। গত বুধবার আরও দুই সেনা নিহতের খবর প্রকাশের পর সাধারণধের মাঝে চাপা উত্তেজনা দেখা দেয়। শান্তিকামী পাহাড়ি ও বাঙ্গালীরা কয়েক দফায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। দ্রুত এ সকল সন্ত্রাসীকে নির্মূলেরও দাবি জানান তারা।
এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে নিন্দার ঝড় বইছে। অনেকেই কুকিচিনকে সমূলে নির্মূলের দাবি জানাচ্ছেন। বড় ধরনের অপারেশন চালানোর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ বলছেন- কুকিচিনের কারণে বান্দরবানের পর্যটক আসা যাওয়া প্রায় বন্ধ। এছাড়াও সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। দেশে বিদেশে আমাদের সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের অনেক স্বীকৃতি রয়েছে। গুটি কয়েক সন্ত্রাসীদের কারণে পুরো পার্বত্য এলাকা জিম্মি থাকতে পারে না। বর্তমান সময়ে এ সকল সন্ত্রাসীদের সমূলে নির্মূলের দাবি তুলছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুলিশ, আর্মড পুলিশ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং সেনাবাহিনীর তত্বাবাধানে যৌথ বাহিনী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে কাজ করছে। পুরো এলাকাজুড়ে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চালানো হচ্ছে অভিযান।
এদিকে নিহত দুই সেনাসদস্য তৌহিদুল ইসলাম ও আলতাফ হোসেন মাসুমের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। বৃহস্পতিবার তাদের লাশ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। নিহত দুই সেনা সদস্যের পরিবার পরিজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ।
নিহত দুইজনের মধ্যে তৌহিদুলের বাড়ি রাজশাহীর বাগমারায়। বৃহস্পতিবার বিকেলে সেনাবাহিনীর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তাঁর লাশ রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার নরদাশ গ্রামে আনা হয়।
বিকেল পাঁচটায় নরদাশ কলেজ মাঠে জানাজার পর পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। জানাজায় পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ছাড়াও এলাকার বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নেন।
বাবা মহসিন আলী বলেন, তার ছেলে দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, যে সকল সন্ত্রাসীদের কারণে তার ছেলেকে জীবন দিতে হলো তার ছেলের সেই রক্ত বৃথা যাবে না। এ সকল সন্ত্রাসীদের চিরতরে নির্মূলের দাবি জানান তিনি। তিনি আশা প্রকাশ করেন- তার ছেলের মত যেনো অন্য কোনো সৈনিকের জীবন দিতে না হয় সেই ব্যবস্থাই হবে।
নিহত আলতাফ হোসেন মাসুমের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলা সদরের কাদিরহানিফ ইউনিয়নের পূর্ব লক্ষ্মীনারায়ণপুর গ্রামে। পারিবারিক কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। এ সময় গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে কয়েক হাজার মানুষ তার জানাজার নামাজে অংশ নেয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিহত সেনাসদস্য আলতাফ হোসেন মাসুমকে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। বাবা আবুল কাশেমের মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে ২০১৮ সালের ২৫শে জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন মাসুম। মা ও একমাত্র ছোট বোন সানজিদা সুলতানা মিমকে নিয়ে সুখের সংসার সাজানোর প্রত্যাশা ছিল তার।
মাসুমের ছোট বোন সানজিদা সুলতানা মিম বলেন, গত বছর আমি এইচএসসি পাস করেছি। ভাইয়া আমাকে বলেছে অনেক বড় হতে হবে। দেশের সেবা করতে হবে। এখন আমাদের ভবিষ্যতের কী হবে। মাকে নিয়ে আমি এখন কি করবো, বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মিম। মিম বলেন, তার ভাইয়ের মত আর কারও যেন জীবন দিতে না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। নির্মূল করতে হবে সন্ত্রাসীদের। বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, দুই সেনা সদস্য নিহতের ঘটনার পর থেকে সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে আমরা কাজ করছি। এর বাইরে বেশি বলা যাচ্ছে না। আমাদের এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
- বাবু/এ.এস