
X
বান্দরবানে আইইডি বিস্ফোরণ ও গুলিতে দুই সেনা সদস্য নিহতের পর শুরু হওয়া যৌথ অভিযানে টিকতে না পেরে পালিয়েছে সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন কেএনএফ। অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। সহায়তা করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশের অভ্যন্তরে নাশকতা চালিয়ে তারা বরাবরের মত এবারও মায়ানমারে পালিয়ে গেছে। সেখানে অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীর শেল্টার নিয়ে থাকে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ওই সকল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিকট তারা অস্ত্র, অর্থ এমনকি মেডিকেল সাপোর্টও পেয়ে থাকে। চলমান এ অভিযানে দুর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র এ সংগঠনের সঙ্গে অন্তত দুইবার সন্মুখভাগে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলেও জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান অভিযানে সফলতা এসেছে। এই সফলতা ধরে রাখতে হবে। এই সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা যেন সংঘঠিত হতে না পরে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত ও সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করতে হবে। র্যাবের মুখপাত্র কমান্ডর খন্দকার আল মঈন গণমাধ্যমকে দুর্গম পাহাড়ের র্যাবের অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
জানা যায়, গত ১৬ মে বান্দরবানের রুমা উপজেলায় কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) সন্ত্রাসীদের আইইডি বিস্ফোরণ ও অতর্কিত গুলিতে সেনাবাহিনীর দুজন সৈনিক নিহত ও দুই অফিসার আহত হন। পরের দিন ১৭ মে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বান্দরবানের রুমা উপজেলার সুংসুংপাড়া সেনা ক্যাম্পের আওতাধীন জারুলছড়িপাড়ায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আস্তানার খবর পাওয়া যায়। সুংসুংপাড়া সেনা ক্যাম্পের মেজর মনোয়ারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি টহল দল মঙ্গলবার দ্রুততার সঙ্গে ওই স্থানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। টহল দলটি জারুলছড়িপাড়ার কাছাকাছি ছড়ার কাছে পৌঁছালে বেলা ১টা ৫৫ মিনিটের দিকে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) বোমা (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস আইইডি) বিস্ফোরণ ও অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। এতে দুজন কর্মকর্তা ও দুজন সৈনিক আহত হন। তাঁদের দ্রুত হেলিকপ্টারের মাধ্যমে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে চিকিৎসারত অবস্থায় আহত দুই সৈনিক মারা যান। আহত দুই কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সিএমএইচে চিকিৎসাধীন।
আইএসপিআর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে কেএনএ বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলার গহিন অরণ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অরাজক পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছে। দেশমাতৃকার জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদ সেনাসদস্যদের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুতে সেনাবাহিনীর প্রধান গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।
এর আগে চলতি বছরের মার্চে বান্দরবানের রোয়াংছড়িতে সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর কেএনএর অতর্কিত গুলিবর্ষণে সেনাবাহিনীর মাস্টার ওয়ারেন্ট অফিসার নাজিম উদ্দিন নিহত হন। আহত হন আরও দুই সেনাসদস্য।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত বছরের ৯ অক্টোবর থেকে অভিযান পরিচালনা করছে। কেএনএফের কথিত সামরিক শাখার নাম কেএনএ। ইতিপূর্বে এ সশস্ত্র গোষ্ঠীর আস্তানায় অভিযান চালিয়ে দেশের নতুন জঙ্গি গোষ্ঠী জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার অনেক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই আস্তানায় সমতল থেকে আসা জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিত বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে জানানো হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেএনএফ নামের সংগঠনটি গড়ে ওঠে বান্দরবানের রুমা উপজেলায়। এর প্রধান রুমা উপজেলা সদর বাজারের বাসিন্দা নাথান বম। তিনি ২০১২ সালে কুকি চিন ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনস (কেএনডিও) নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেটি পরবর্তী সময়ে কেএনএফ নামের সশস্ত্র সংগঠনে রূপান্তর করেন।
এদিকে এ ঘটনার পর বান্দরবান জুড়ে আতঙ্ক শুরু হয়। পাহাড়ি এ সন্ত্রাসীগোষ্ঠির বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ। গত ১৭ মে এ খবরের পর থেকেই চাপা উত্তেজনা দেখা দেয়। শান্তিকামী পাহাড়ি ও বাঙলিরা কয়েক দফায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেন। দ্রুত এ সকল সন্ত্রাসীকে নির্মূলেরও দাবি জানান তারা। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে নিন্দার ঝড় বইছে। অনেকেই কুকিচিনকে সমূলে নির্মূলের দাবি জানাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলা হচ্ছে, কুকিচিনের কারণে বান্দরবানের পর্যটক আসা যাওয়া প্রায় বন্ধ। এছাড়াও সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর ওপর হামলা করে এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। দেশে বিদেশে আমাদের সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের অনেক স্বীকৃতি রয়েছে। গুটি কয়েক সন্ত্রাসীদের কারণে পুরো পার্বত্য এলাকা জিম্মি থাকতে পারেনা। বর্তমান সময়ে এ সকল সন্ত্রাসীদের সমূলে নির্মুলের দাবি তুলছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), পুলিশ, আর্মড পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর তত্বাবাধানে যৌথ বাহিনী সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে কাজ করছে। পুরো এলাকাজুড়ে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চালানো হচ্ছে অভিযান।
স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা যাচ্ছে, চলমান এ অভিযানে ব্যাপক সফলতা পাচ্ছে যৌথ বাহিনী। গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে চালানো এ অভিযানে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দূর্গম পাহাড় ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তারা মায়ানমারের অভ্যন্তরে অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীদের কাছে শেল্টার নিয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলোর নিকট থেকে অস্ত্র, অর্থ ও মেডিকেল সাপোর্ট পায় তারা।
জানা যায়, ১৮ থেকে ২০ মে এবং ২৩ থেকে ২৫ মে এই সময়ের মধ্যে দূর্গম পাহাড়ে সশস্ত্র অবস্থানের গোয়েন্দা তথ্য পায় যৌথবাহিনী। তথ্য পাওয়ার পরপরই সেখানে পরিচালিত হয় অভিযান। অভিযানে সশস্ত্র কেএনফের সদস্যরা যৌথবাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালালে যৌথবাহিনীও পাল্টা জবাব দিতে থাকে। দীর্ঘসময় সন্মুখভাগে গোলাগুলিতে গুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের আস্তানা। এক পর্যায়ে মায়ানমারের অভ্যন্তরে পালিয়ে যায় কেএনএফ’র সশস্ত্র সদস্যরা।
স্থানীয়রা বলছেন, সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে হলে এই ধরনের অভিযানের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। তারা যেন কোনভাবে সংগঠিত হতে না পারে সে ব্যাপারে আরো গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে। চট্রগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেন জানান, ঘটনার পর থেকেই পুলিশের অতিরিক্ত উপস্থিতি রয়েছে। অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। পোশাকে সাদাপোশাকে পুলিশ কাজ করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল আব্দুর রশিদ বলেন, কেএনফের এ তৎপরতা উদ্বেগের অনেক বড় কারণ। বর্তমানে সেখানে যে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে তাতে সফলতাও আসছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাক্যাম্প কেন্দ্রীক সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের ব্যাপারেও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।