
X
হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে স্বর্ণ চোরচালানে আবারো জড়িয়ে পড়েছে ১০ জনের ট্রলিম্যানদের একটি সিন্ডিকেট। সম্প্রতি বড় বড় চালান না আসলেও ক্ষুদ্র এই চালানগুলো এই সিন্ডিকেট বিমানবন্দর পার করে দিচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইতিমধ্যে এই সিন্ডিকেট শনাক্ত করে তাদেরকে গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রেখেছে। বিমানবন্দর দিয়ে স্বর্ণ পাচারে যারা সহায়তা করে থাকে তাদের মধ্যে এটি একটি গ্রুপ। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেনটিভ ইউনিটের উপ-কমিশনার মোকাদ্দেস হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের ইউনিট, পাশাপাশি শুল্ক গোয়েন্দা ইউনিট বরাবরি তৎপর। আমাদেরও নজরদারি রয়েছে। যারাই চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত হবেন তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আসতে হবে। তিনি বলেন, অতিসম্প্রতি আমরা ২৫ কেজি স্বর্ণের চালান ধরতে সক্ষম হই। আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বলছেন, এই সিন্ডিকেট এক সময় শক্তিশালী থাকলেও গোয়েন্দা নজরদারি ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নানাচাপে তারা ঘাপটি মেরেছিল। সম্প্রতি এই ট্রলিম্যানদের এই সিন্ডিকেটটি আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের দেয়া তথ্য মতে জানা যায়, বিমানবন্দরের যাত্রীদের লাগেজ নিয়ে আসার জন্য সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের তত্বাবাধানে ৫০ জনের মত ট্রলিম্যান কাজ করে। এর মধ্যে ১০ জনের মত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। যারা বিশেষ করে স্বর্ণ পাচারে সহায়তা করে আসছে।
সংস্থার সদস্যদের দেয়া তথ্য মতে, এই ট্রলিম্যানরা বিগত প্রায় এক বছর আগে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে ঘাপটি মেরে ছিল। প্রায় তিন মাস থেকে এই সিন্ডিকেটটি আবারো সক্রিয় হয়ে উঠা শুরু করেছে। এরা চোরাচালান গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বর্ণ বিমানবন্দর থেকে বের করে দেয়ার কাজে সহায়তা করে আসছে।
যেভাবে সহায়তা করে ট্রলিম্যানরা :
গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনের দেয়া তথ্য মতে, দুই ধাপে এই ট্রলিম্যানরা চোরাচালানী ব্যক্তিদের সহায়তা করে থাকে।
প্রথম ধাপ হলো, একটি ফ্লাইট অবতরণ করার পর যাত্রীরা ইমিগ্রেশনের জন্য লাইনে দাঁড়ান। আর এই সময় ট্রলিম্যানরা ওই লাইনের আশপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে। অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেখানে তেমন দৃষ্টি না দিলে তারা সেখানেই নির্ধারিত ব্যক্তির নিকট থেকে পুটলা আকৃতির ছোট ব্যাগ, অথবা বিস্কুটের প্যাকেটর ন্যায় প্যাকেটসহ অভিনব পন্থায় আনা স্বর্ণের বারগুলো কৌশলে তাদের নিকট থেকে নিয়ে নেয়। পরে তারা সেগুলো নিয়ে কৌশল করে গ্রিন চ্যানেল পার হয়ে বাহিরে চলে আসে। বাহিরে আসার পর তাদের যেন কেউ সন্দেহ না করতে পারে এ কারণে বাহিরে থাকা ট্রলিগুলো গোছাতে বা এক জায়গায় করার কাজ শুরু করে। ততক্ষণে স্বর্ণ আনা লোকজন ওই ট্রলিম্যানকে অনুসরণ করে তার নিকট গেলে সে ওই জিনিসগুলো দিয়ে দেয়। পরে ওই ব্যক্তি নিরাপদে বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
দ্বিতীয় ধাপ হলো, ইমিগ্রেশনে যখন সুযোগ হয় না, তখন তারা বেল্টের নিকট এসে দাঁড়ায়। বেল্টে মালামাল আসতে দীর্ঘক্ষণ সময় ব্যয় হয়। এই সুযোগে ট্রলিম্যানরা তাদের নিকট আসে। অন্যান্য আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকলেও তারা সেখানে যাত্রীর সঙ্গে নানা ধরনের কথা বলে। যেহেতু দীর্ঘক্ষণ একস্থানে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা থাকে না বা থাকতে পারে না সেই সুযোগ বুঝে তারা মালামাল নিয়ে বাইরে চলে যায়।
গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা জানান, যদি চোরাকারবারী তার দেহে করে নিয়ে আসে সেক্ষেত্রে তারা ট্রলিম্যানদের ব্যবহার করে। আর বেশিরভাগ লোক যাদের সঙ্গে চুক্তি তারা দেহে করে নিয়ে আসে। একটি লোক কৌশল করে দেহে কমপক্ষে ৮ থেকে ১০ কেজি স্বর্ণ নিয়ে আসতে পারে। এক্ষেত্রে বারগুলো বেশিরভাগ সময় ১০ তলার হয়। আর ১ কেজি ওজনের যদি বার হয় তাহলে সেগুলো ৫ টির মত নিয়ে আসতে পারবে। তবে সে যদি ট্রলিম্যানদের সেটি না দেয় নিজে নিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করে তবে সে স্ক্যান পার হওয়ার সময় ধরা পাড়ে যাবে।
আর যদি যাত্রী তার লাগেজে নিয়ে আসে তবে আগে বলেই দেয় লাগেজে রয়েছে। এরপর সে বেল্টে আসলেই সে নিজেই ট্রলিতে উঠায়। এ সময় সে কৌশল করে কাষ্টমস স্ক্যান না করেই পার করে দেয়। এ সময় যাত্রীর লম্বা লাইনের অযুহাতসহ নানা কৌশল করে। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বলছেন, ইতিমধ্যে এই গ্রুপকে চিহ্নিত করে তাদের গভীর পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
গোয়েন্দা সংস্থার এক সদস্য জানান, সম্প্রতি দুবাই থেকে আসা যাত্রী আজিম উদ্দীন তার প্যান্টের বেল্টের ভেতর করে ৮ কেজির উপরে স্বর্ণ নিয়ে আসছিল। পূর্ব থেকে তথ্য পাওয়ার কারণে শুল্ক গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ইমিগ্রেশনের নিকট ফ্লাইট নামার সঙ্গে সঙ্গে অবস্থান নেয়। এ সময় ট্রলিম্যান সিন্ডিকেটটি নানা কৌশলে তার নিকট স্বর্ণ নেয়ার জন্য চেষ্টা করে। কিন্তু তাকে কোন সুযোগ না দেয়ার কারণে তাকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বলছেন, আমরা পুরো এই গ্রুপকে হাতেনাতে ধরে আইনের আওতায় আনার অপেক্ষায় রয়েছি। বিমান বন্দরে স্বর্ণ পাচারে যারা সহায়তা করে তাদের মধ্যে এটি একটি গ্রুপ। অন্যান্যরাও আমাদের পর্যবেক্ষণের মধ্যে রয়েছে।
বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিয়াউল হক পলাশ বলেন, আমাদের নিয়মিত অভিযান পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারী চলছে। আমরা চেষ্টা করছি চোরাচালানের সঙ্গে যারাই জড়িত হবে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
-বাবু/এ.এস