
X
ওপারে ভারতীয় ভূমি গারো পাহাড় আর এপারে পাহাড়ের পাদদেশ ঘেরা বাংলাদেশের ফসলি জমি-জনবসতি। ওপারের পাহাড়ে তীব্র খাদ্য সংকট তাই খাদ্যের সন্ধানে সীমানা পাড়ি দিয়ে এপারে দল বেঁধে নেমে আসে বন্যহাতি।
নষ্ট করে কৃষকের স্বপ্নের ফসল। তচনছ করে বাড়ি ঘর। রক্ষা করতে গেলে হাতির আক্রমে প্রাণ হারাতে হয় সাধারণ মানুষকে। এভাবে চলছে দীর্ঘদিন ধরে। দিনের বেলায় স্বাভাবিক থাকলেও রাত হতেই ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার টিলায় খাবারের সংকট থাকায় দানব হয়ে লোকালয়ে নেমে আসছে হাতির পাল। হাতির হানায় প্রাণভরে চরম আতঙ্কে আছে মানুষ।
গত কয়েকদিন ধরে এলাকায় অবস্থান করছে পাহাড় থেকে সঙ্গে বাচ্ছাসহ নিয় আসা বন্যহাতির এক বৃহৎ দল। তান্ডব চালাচ্ছে মানুষের বসতভিটায়। নষ্ট করে দিচ্ছে ফলের গাছসহ বাড়ির মাচায় রাখা ধান-চাল। এতে হাতির আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে উপজেলার কড়ইতলী, মহিষলেটি, রংগমপাড়া, গোবরাকুড়া ও কোচপাড়া এলাকার বাসিন্দারা।
এর মধ্যে গত মঙ্গলবার রাতে কড়ইতলী গ্রামে হাতির আক্রমণে গোলাপ হোসেন (৫৫) নামের এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এতে আশপাশের চার গ্রামের মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে গত চার বছরে হালুয়াঘাট সীমান্তে হাতির আক্রমণে মারা গেছে ১১ জন।
স্থানীয় লোকজন ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, হালুয়াঘাট সীমান্তে আগে শুধু বোরো ও আমন আবাদের সময় হাতি লোকালয়ে এলেও এখন অবাধে চলাফেরা করে হাতির পাল। সর্বশেষ দুই সপ্তাহ ধরে কড়ইতলী এলাকার কোচপাড়া টিলায় ৪০-৪৫টি ছোটবড় হাতির সম্বয়ে একটি বন্যহাতির দল অবস্থান করছে। এই দলে পাঁচ থেকে সাতটি শাবকও আছে। দিনে বনে দেখা গেলেও সন্ধ্যার পরপরই এসব হাতি খাবারের সন্ধানে নেমে আসছে লোকালয়ে।
লোকালয়ে হাতি আসায় জানমাল রক্ষায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারা। রাত জেগে মশাল জ্বালিয়ে বন্য হাতির পাল প্রতিরোধের চেষ্টায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে তারা।
স্থানীয়রা জানান, গত মঙ্গলবার রাতে বৃষ্টির মধ্যে গোলাপ হোসেনের বাড়িতে হাতি তান্ডব চালায়। তছনছ করে দেয় দুটি ঘর। ওই রাতেই পশ্চিম কড়ইতলী গ্রামের আবদুল মালেক মন্ডলের বাড়িতে হানা দেয় হাতির পাল। এ সময় তাঁদের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কয়েক দিন আগে হাতির পাল মহিষলেটি গ্রামের রহম আলী, সাদেক মিয়া, মনু মিয়া, আবদুল আজিজের বাড়িঘর তছনছ করে দেয়। হামলার সময় ঘরে থাকা ধান, চাল, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল খাওয়ার পাশাপাশি নষ্ট করে দেয়। এতে আতঙ্ক বেড়েছে সীমান্তবর্তী ভুবনকুড়া ইউনিয়নের কড়ইতলী, পশ্চিম কড়ইতলী, মহিষলেটি বানাইচিরিঙ্গিপাড়া ও কোচপাড়া গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে।
কড়ইতলী গ্রামের ইব্রাহিম হোসেন কৃষক বলেন, ‘আমরা এখন নিরুপায় আত্তি (হাতি) মামা এহন কিচ্ছু মানে না। সরকার হয় ভারতের এই আত্তি সরাক, না হয় আমাগোরে এই এলাকা থেকে সরাই নেক।’ স্থানীয় আরেক কৃষক চান মিয়া জানান, ঝড়বৃষ্টির মধ্যে রাত জেগে হাতি পাহারায় থাকতে হচ্ছে তাঁদের। এই অবস্থায় হাতির আক্রমণ রোধে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ভুবনকুড়া ইউপির চেয়ারম্যান সুরুজ মিয়া জানান, মাঠে ফসল না থাকায় খাদ্যের সন্ধানে হাতির পাল এখন বসতবাড়িতে হানা দিচ্ছে বলে। হাতির অত্যাচারে গ্রামবাসী নির্ঘুম রাত পার করছে। এদের জঙ্গলে ফেরাতে বন বিভাগের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হালুয়াঘাট উপজেলা পরিষদের নব নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ বলেন, হাতির পাল ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের বাধার কারণে সীমান্তের ওপারে যেতে পারে না। বিষয়টি সমাধানের জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের গোপালপুরের বিট কর্মকর্তা লোকমান হাকিম জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে বন বিভাগের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আবেদন করতে বলা হয়েছে।