ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বর প্লেটের নামে নির্বিচারে চাঁদাবাজি

কামরুজ্জামান রনি, চট্টগ্রাম

সারাবাংলা

চট্টগ্রাম শহর জুড়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এর ডিজিটাল অনলাইন বসতবাড়ি হোল্ডিং প্লেট সরবরাহের নামে চলছে নির্বিচারে টাকা

2024-07-03T19:00:13+00:00
2024-07-04T15:03:59+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন
ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বর প্লেটের নামে নির্বিচারে চাঁদাবাজি
কামরুজ্জামান রনি, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুলাই, ২০২৪, ৭:০০ পিএম  আপডেট: ০৪.০৭.২০২৪ ৩:০৩ পিএম  (ভিজিট : ১২২৩)
X

চট্টগ্রাম শহর জুড়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) এর ডিজিটাল অনলাইন বসতবাড়ি হোল্ডিং প্লেট সরবরাহের নামে চলছে নির্বিচারে টাকা আদায়৷ যাকে নগরবাসী বলছে, চসিক অনুমোদিত চাঁদাবাজি। কারণ, চট্টগ্রাম নগরীর প্রতিটি হোল্ডিং নম্বরের বিপরীতে একটি করে ডিজিটাল নাম্বার প্লেটের বিনিময়ে ৩৫০ টাকা করে আদায় করার কথা থাকলেও এখন ট্রেডলাইসেন্স নাম্বার বসিয়েবিভিন্ন ওয়ার্ডের ভাড়াটিয়া দোকানদারের কাছ থেকেও অনেকটা জোর পূর্বক এই হোল্ডিং প্লেটের নামে ৩৫০ টাকা করে টাকা আদায় করা হচ্ছে। চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেছেন, "শুধুমাত্র যাদের নামে চসিক এর হোল্ডিং নাম্বার আছে তারাই এসব ডিজিটাল হোল্ডিং প্লেট পাবেন৷ এর বাইরে কারো কাছ থেকে টাকা নেয়া যাবে না৷" এসব কাজের জন্য বিনা দরপত্রে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও এক ব্যক্তিকে অনুমতি দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় অনেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের লোকজন এলাকাগুলোতে হোল্ডিং নম্বরের মালিক, বাসিন্দা এমনকি ভাড়াটিয়া দোকানদারদের ভয় ভীতি দেখিয়ে ডিজিটাল হোল্ডিং প্লেটের নামে টাকা আদায়ে কাজ করছে ।

চসিক ১১নং দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের আনোয়ারুল আজিম একজন ভাড়াটিয়া দোকানদার। তার কাছ থেকেও ডিজিটাল হোল্ডিং প্লেট বাবদ ৩৫০ টাকা আদায় করা হয়েছে৷ ৩ জুলাই ৩৬৩৯ নম্বর রশিদে এই টাকা আদায় করা হয়৷ একই ওয়ার্ডের আরেকজন ভাড়াটিয়া দোকানদার জাহেদ উদ্দিনের কাছ থেকেও একই হারে টাকা আদায় করা হয়৷ ৩ জুলাই তারিখে ৩৬৩২ নং টাকা আদায়ের রশিদে হোল্ডিং নং এর স্থানে তার প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের নাম্বার লিখে দেয়া হয়েছে যা কোন ভাবেই হোল্ডিং নাম্বার হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা নয়৷ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মনোগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত ৩৫০ টাকা আদায়ের সেই রশিদে প্লেট ডেলিভারির ২৫/৭/২০২৪ উল্লেখ করা হয়েছে৷ 


এই বিষয়ে একাধিক ভাড়াটিয়া দোকানদার বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, নিজেদের সিটি কর্পোরেশনের লোক পরিচয়ে প্রতিটি দোকানদারের কাছ থেকে ৩৫০ টাকা করে টাকা তোলা হচ্ছে৷ সেখানে স্থানীয় নান্নু নামের একজন ছেলে থাকায় আমরা টাকা দিতে বাধ্য হয়েছি৷ মীর মোঃ ইমতিয়াজ প্রকাশ নান্নু নামের সেই ব্যক্তির ডিজিটাল নাম্বার প্লেটের জন্য টাকা আদায়ের কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে বাংলাদেশ বুলেটিনকে স্বীকার করেছেন৷ তবে তিনি বলেন, "কাউন্সিলর ইসমাইল ভাই আমাকে বলেছেন চসিক এর লোকজনের সাথে আমি যদি কাজ করি তাহলে আমাকে প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে পারিশ্রমিক দেয়া হবে৷ আমি শরিফ নামের চসিক এর লোকের সাথে থেকে কাজ করেছি।" অন্যদিকে শরিফ নামের সেই ব্যক্তি নিজেকে ফিল্ড অফিসার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, "আমরা শ্যামল আচার্যের আন্ডারে কাজ করছি৷ অফিস থেকে আমাদের বলা হয়েছে বাসাবাড়ি হলে প্রতিটি হোল্ডিং নাম্বার আর দোকান হলে ট্রেড লাইসেন্সের নাম্বারে প্রতিটি দোকান থেকে ৩৫০ টাকা করে টাকা নিতে হবে৷" 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বিনা দরপত্রে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়িতে ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেট সরবরাহের জন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ও এক ব্যক্তিকে অনুমতি দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। এই কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা এখন প্রতিটি বাসাবাড়িতে পিভিসি প্লাস্টিকের একটি নম্বরপ্লেটের বিপরীতে আদায় করছে ৩৫০ টাকা। চুক্তি হিসেবে, নগরীতে ২ লাখ ১১ হাজার হোল্ডিং এর বিপরীতে নম্বরপ্লেট সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানগুলো আদায় করবে সাড়ে ৭ কোটি টাকা। যার মধ্যে চসিক পাবে মাত্র ৭৪ লাখ টাকা।

চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেছেন, "আমাদের কাছে প্রতিটি হোল্ডিং এর মালিকের নাম ডাটাবেজে সংরক্ষিত আছে৷ শুধুমাত্র সেই ডাটা অনুযায়ী আমরা ডিজিটাল হোল্ডিং প্লেট সরবরাহ করতে চুক্তি করে অনুমতি দিয়েছি৷ যদি কোন দোকানদারের নামে হোল্ডিং নাম্বার না থাকে তাহলে তাকে তো ডিজিটাল হোল্ডিং প্লেট সরবরাহের সুযোগ নেই৷" তাহলে এই বাড়তি আদায় করা টাকাগুলোর কি হবে প্রশ্ন করা হলে তিনি আগে এই সংক্রান্ত রশিদ দেখাতে বলেন৷ সে কথা মতন প্রতিবেদক চসিক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার হোয়াটসএপে দুটি ভাড়াটিয়া দোকানদারের কাছ থেকে আদায় করা রশিদের ছবি প্রেরণ করেন৷ এরপর থেকে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এই প্রতিবেদকের কল রিসিভ করেননি৷ 

জানা গেছে, ২০২২–২০২৩ অর্থবছরে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) ৮৪ হাজার ৮৭টি ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করেছে । এখন যদি প্রতিটি ট্রেড লাইসেন্সের বিপরীতে হোল্ডিং প্লেটের জন্য টাকা আদায় করা হয় তাহলে আরো কয়েক কোটি বাড়তি টাকা বিনা টেন্ডারে কাজ পাওয়া ৫ প্রতিষ্ঠান ও এক ব্যক্তির পকেটেই ঢুকবে বলে ধারণা করছে নগরবাসী।

চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এই সংক্রান্ত কাজের অনুমতিপত্রে ৯টি শর্ত দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে– সব ধরনের স্থাপনার ডোর টু ডোর ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেট স্থাপন করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে চসিক কোনো রকম খরচ বহন করবে না। প্রতিটি ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেট তৈরি, স্থাপন ও অন্যান্য কার্যক্রমের জন্য ৩৫০ টাকা ফি নির্ধারণ করা হয়। এই ফি হোল্ডিং মালিক স্বেচ্ছায় দিলে নেওয়া যাবে; এর জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা ও চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। প্রতিটি হোল্ডিং নম্বর প্লেটের বিপরীতে নেওয়া ৩৫০ টাকার মধ্যে সিটি করপোরেশনে জমা দিতে হবে ৩৫ টাকা।

শর্তে বলা হয়েছে "মালিক স্বেচ্ছায় দিলে নেওয়া যাবে; এর জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা ও চাপ প্রয়োগ করা যাবে না"  অথচ এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি চসিক নির্ধারিত ফির অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হুমকি-ধামকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া দোকান মালিকরা। 

নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেট সরবরাহের জন্য যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পেয়েছে সেগুলো হলো– ওয়াসি এন্টারপ্রাইজ, এসএ এন্টারপ্রাইজ, বিডব্লিউডিএস, গ্রাসরুট কো-অপারেশন ও এডসেল। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২২টি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পেয়েছে ওয়াসি এন্টারপ্রাইজ। এ ছাড়া গত ১৩ মে কক্সবাজারের ঈদগাঁও ইসলামাবাদ এলাকার শ্যামল আচার্য্য নামে এক ব্যক্তিকে নগরীর ১১ নম্বর দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডে ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেট স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে কাজ দেওয়া হলেও কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি। এমন কর্মকাণ্ড সরকারি ক্রয় আইনের লঙ্ঘন বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া এতো বড় একটি কার্যক্রমের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও নেয়া হয়নি। তবে এই কার্যক্রমটি সিটি করপোরেশনের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী চালানো হচ্ছে বলে দাবি কর্মকর্তাদের। টাকা আদায় করে ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেট দেওয়া হলেও এতে নাগরিকরা কী সুবিধা পাবেন, তা স্পষ্ট করতে পারেননি চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে হোল্ডিং মালিকদের শনাক্ত করা সহজ হবে।

টাকা আদায়ের রশিদে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নাম, মনোগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর ছবি ছাপা থাকলেও সেখানে আদায়কারী প্রতিষ্ঠানের কোন নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার পাওয়া যায়নি৷ তবে সেখানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কার্যাদেশ স্মারক নাম্বার উল্লেখ করা আছে৷ ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বর প্লেট স্থাপনের দায়িত্ব পাওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বিরুদ্ধে এতো এতো অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের নাম্বারে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বেশির ভাগ নাম্বার বন্ধ পাওয়া গেছে। 

সচেতন নাগরিক কমিটি ও টিআইবির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেছেন, ডিজিটাল হোল্ডিং নম্বরপ্লেটের নামে টাকা আদায় করাটা এক প্রকার অনুমোদিত চাঁদাবাজি। বিভিন্ন সেবার জন্য হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের পর আবার সেই সেবা দিতে জোর করে টাকা নিচ্ছে চসিক। নাগরিক অধিকার বিষয়টা এখন শুধুমাত্র কেতাবি কথায় অবশিষ্ট আছে৷ জনপ্রতিনিধিরা জনস্বার্থের চেয়ে কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে যায় না। 





Loading...
Loading...


সারাবাংলা এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy