
X
নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোমলমতি শিশুদের শ্রেণি কার্যক্রম চলছে ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষকরা ধারনা করছেন, এই ব্যবস্থা চলতে থাকলে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।
প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জরাজীর্ণ ভবনে ক্লাস চালিয়ে যাওয়া বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, উপজেলার মাসকা ইউনিয়নে দিগলী মাচিয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বলাইশিমুল ইউনিয়নে উজিয়ালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মোজাফরপুর ইউনিয়নে চৌকিধরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ হাজী মালেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গগডা কোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,সান্দিকোনা ইউনিয়নে দুরচাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়নে সইলাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সরেজমিনে বেশ কয়েকটি ঝুকিপূর্ণ বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, প্রতি বছর বিদ্যালয় ভবনে শুধু চুনকাম করে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষকরা। এমনকি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে টিনশেড ঘরও নির্মাণ করা হয়নি কোনো বিদ্যালয়ে।
ছাদ ও দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ায় ব্যবহার অযোগ্য এসব ভবনে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যে কোন সময় ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে। হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক আরো বেড়ে যায়।
প্লাস্টারের পাশাপাশি দরজা জানালার গ্রিলও খসে পড়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাঠদান প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এমনিতেই বিভিন্ন কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছে।
এই ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান ভয়াবহ আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয় বিকল্প ব্যবস্থা নিলেও অধিকাংশ বিদ্যালয়ে পাঠদান চলছে জরাজীর্ণ ভবনে। কারণ তাদের বিকল্প কোনো ভবনও নেই। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক- কর্মচারীদের মধ্যেও বিরাজ করছে হতাশা।
আরো জানা যায়, এই সব বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা দুশ্চিন্তায় আছেন। এসব জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় ভবনে ছাদের পলেস্তরা নেই। মরিচাযুক্ত রড ফেটে ফেটে পড়ছে। নিরাপত্তা পিলারের ইট সুরকি খসে ভেতরের রড বেরিয়ে গেছে। কিছু কিছু বিদ্যালয়ের জানালা নেই, মরিচা ধরে ভেঙে পড়ে রয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার বলাইশিমুল ইউনিয়নে কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, এই বিদ্যালয় ভবনটি ১৯৯৯ সনে পাকা করন করা হয়। সেখানে রয়েছে চারটি রুম। দীর্ঘ ২৪ বছর পর এই বিদ্যালয়ের ভবনটি অকেজো হয়ে পড়েছে এবং ইতোমধ্যে একটি রুমে শ্রেণি কার্যক্রম অনুপযোগী হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ন অবস্থায় তালাবদ্ধ রয়েছে। ফলে শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কক্ষের সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে।
ঐবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমন,ইমা, ইভা,সিয়াম জানায়,শ্রেণী কক্ষের সঙ্কট থাকার কারণে বিদ্যালয়ে কষ্ট করে এক রুমে দুই ক্লাস করতে হচ্ছে। স্কুল খোলা থাকা অবস্থায় শ্রেণি কক্ষের ছাদ থেকে পলেস্তারা শরীরের উপর পড়েছে কয়েকবার। তাই ভয় হয় সবার কখন যে দূর্ঘটনা ঘটে ? এখানে নতুন ভবন নির্মাণ হলে আমাদের আর কষ্ট হবে না।
কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জানান, এই বিদ্যালয়ে ৮৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষক রয়েছেন ৪জন। বিদ্যালয় ভবনের অবস্থা মোটেও ভালো না। সিমেন্ট উঠে যাচ্ছে, দেয়াল ও ছাদের ফাটল গুলো দিন দিন বড় হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে ভবনটি। শিক্ষা মানোন্নয়ন লক্ষ্যে নতুন ভবন খুবই দরকার বলে তিনি জানান।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবক আবুল কাশেম জানান, বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চলমান থাকলেও বিদ্যালয় ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়ছেলেমেয়েদের শ্রেণি কার্যক্রম নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।
অপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাসকা ইউনিয়নে দিগলী মাচিয়ালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিক আব্দুল হেলিম শেখ জানান, আমার স্কুলের ভবনটি চার কক্ষবিশিষ্ট। শিক্ষক রয়েছেন ৬জন। শিক্ষার্থী রয়েছে ১৯৮ জন। বর্তমানে ভবনটি খুব জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ন হওয়ায় বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কষ্ট করে ক্লাস চালাতে হচ্ছে। এতে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম চালাতে খুবই অসুবিধা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানান তিনি।
কেন্দুয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি শফিকুর রহমান জানান, কেন্দুয়া উপজেলা ১৮২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ন হওয়ায় শ্রেণি কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকসহ সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার দরুন শিক্ষার্থীদে সঠিক পাঠদান ব্যহত হচ্ছে । আশু ঝুঁকিপূর্ন ভবন পুনর্নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আনুপাতিক হারে পদ সৃষ্টির মাধ্যমে পর্যাপ্ত শিক্ষক দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বেগবান করার জোর দাবি জানান তিনি।
এব্যাপারে উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মির্জা মোহাম্মদ সোহাগ জানান, ঝুকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলো সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। আমি বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শনে যাব, যদি পরিত্যক্ত করার উপযোগী মনে হয় তাহলে পরিত্যক্ত করা হবে পাশাপাশি অন্যান্য সব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সচেষ্টা থাকব।
বৃহস্পতিবার (২৯আগষ্ট) দুপুরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো.আমিনুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কেন্দুয়া উপজেলায় ১৮২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ন।
জরাজীর্ণ এসব বিদ্যালয়ে পাঠ দান করা খুবই ঝুঁকিপূর্ন হওয়াতে যে কোন সময় বড় ধরনের দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই এই সকল বিদ্যালয়গুলোতে যতদ্রুত সম্ভব নতুন ভবন নির্মাণ করা জরুরী এবং সকল বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাবো বলে তিনি জানান।