
X
চট্টগ্রামের রাউজানে গত ৫ আগস্ট থেকে প্রতিনিয়ত হামলা লুট আর অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বিগ্ন স্থানীয়রা৷ দুর্বৃত্তদের চাঁদাবাজি, ঘরে ঘরে হামলা ও লুটতরাজ থেকে রক্ষা পায়নি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতবাড়ি ও উপাসনালয়। এসময় দূর্বৃত্তদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি রাউজানে কৃতি সন্তান বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন স্মৃতি ভবনটি।
এসকল ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা এতোদিন প্রাণ ভয়ে বিষয় গুলো চেপে গেলেও এখন এক এক করে মুখ খুলতে শুরু করেছে৷ অনেকে এসব ঘটনার পেছনে মুষ্ঠিমেয় রাজনৈতিক লোকজনকে অভিযুক্ত করলেও এসকল ঘটনার জন্য প্রধানত স্থানীয় কিছু দুর্বৃত্তদের দায়ী করছেন যাদের কোন দলীয় পরিচয় নেই৷ তবে ইতিমধ্যে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও হামলা করে ঘর ভাংচুর লুটপাটের অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন পারভীন আক্তার নামে এক মাইলা। ঘটনাটি ৮ আগস্ট হলেও অভিযোগটি দায়ের করেন ৫ সেপ্টেম্বর। রাউজানে হামলা ও লুটের শিকার আরো বেশ কয়েকটি পরিবার মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
চাঁদা দাবি ও হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের মামলা: গত ৮ আগস্ট রাউজানে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও ঘরে ঢুকে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনায় গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চীফ জুড়িলসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করা অভিযোগটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত৷ মামলায় ৮/১০জনকে আসামী করা হয়। আদালতে দায়ের কৃত এজাহার সূত্রে জানা যায়, ৮ আগষ্ট সকালে রাউজান উপজেলার উত্তর গুজুরা ইউনিয়নের খলির মাস্টারের বাড়ির পারভীন আক্তারের কাছে ১০ লাখা চাঁদা দাবি করেন একই এলাকার আবু সাঈদ, আবু তাহের, আবু জাহেদ ও রজব আলী নামে চার ব্যক্তি। তিনি চাঁদা দিতে অপরাগতা প্রকাশ করলে বাড়ির সীমাণা প্রাচীর ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে লুটপাট চালাতে তাকে আসামীরা । এসময় পরিবারের লোকজনকে মারধর করে আলমিরায় থাকা নগদ ৭২ হাজার টাকা, তিন ভরি স্বর্ণালংকার ও একটি ভিএসএলআর ক্যামরা লুট করে নেয়। এসময় বিবাদীনিকে ১০ লাখ টাকা না দিলে তার ছেলেকে তুলে নেওয়া হবে বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন বাদী। মামলার বাদী পারভীন আক্তার গণমাধ্যমকে বলেন, ৮ আগস্টে হামলার পর থেকে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় আছি। দীর্ঘদিন থানায় পুলিশ না থাকায় মামলা অভিযোগ করতে পারি নাই। এখন মামলা দায়ের করেছি, আশাকরি পিবিআই তদন্ত করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবে।
রাউজান জুড়ে চলেছে ব্যাপক নৈরাজ্য ও লুটতরাজ: রাউজান পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের ব্রাহ্মণপাড়ার এক সনাধন ধর্মালম্বী ভূক্তভোগী জানান, "৫ আগস্ট দিবাগত রাত ৩টার পর আমাদের বাড়িতে হামলা হয়৷ হামলাকারীরা শুধু যে হামলা কিংবা ভাংচ্যুর চালিয়েছে তা নয় তারা মূলত ব্যাপকহারে লুটপাট চালিয়েছে৷" ভূক্তভোগী আরো বলেন, তিনদফা আমাদের বাড়িতে লুটতরাজ চালানোর পর তারা আমাদের পুকুরের মাছ পর্যন্ত লুটের চেষ্টা চালায়৷ এটা যদি রাজনৈতিক হামলা হতো তাহলে তারা আমার ঘর ভাংবে, আমার ছবি কিংবা পুরো ঘরটাই শুধু ভাংতো৷ কিন্তু তারা বাড়ির জিনিস পত্র লুট করে নিয়ে চলে গেছে৷ রান্নাঘরে থানা হলুদ, মরিচ, তেল থেকে শুরু করে রান্নার গ্যাসের চুলাটিও ওরা নিয়ে গেছে৷ এমনকি বাথরুমে থাকা পানির বালতি ও এডজস্ট ফ্যান পর্যন্ত খুলে নিয়ে যায়৷ ৩য় দফা হামলাকারীরা এসে আমাদের উপসনালয় ভাংচ্যুর করেছে বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে৷ তবে ঘণবসতি পূর্ণ এলাকা হওয়ায় সেটি করতে পারেনি৷" এসব বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, "আমি আমার পরিবার নিয়ে ১০/১২ দিন তো অনেকটা উদ্বাস্তুর মতন ছিলাম৷ এখন যেহেতু একটি সরকার গঠন হয়েছে, পরিবেশ পরিস্থিতি যদি নিরাপদ নিশ্চিত করে তাহলে আশাকরি শীঘ্রই এই বিষয়ে আইনী পদক্ষেপ নিবো৷"
রাউজান হলদিয়া বাঘমারা টিলা ইয়াসিন নগর এলাকার বাসিন্দা বলেন, "৫ তারিখ সরকার পতনের রাতেই ৩০/৪০ জনের একটি গ্রুপ আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা মূলত ডাকাতির উদ্দেশ্যেই ঘরে প্রবেশ করেছিল। কারণ ওরা এসে আলমিরা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছিল কিন্তু এক পর্যায়ে আমার আব্বুর পারিবারিক বেশ কিছু টাকার ব্যাগ পেয়ে গেলে তারা সেগুলো নিয়ে চলে যায়। রাত আনুমানিক ১০টার সময় সংঘটিত এই ঘটিনার নেতৃত্বে স্থানীয় কিছু চিহ্নিত মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা নেতৃত্ব দিয়েছিল বলে জানান এই ভূক্তভোগী৷ নিজেদের পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই এতোদিন কোন মামলা করেনি বলেও জানান তিনি৷ এখনো পারিবারিক নিরাপত্তার কথা ভেবে কোন মামলা করতে যেতে পারছেন না বলে জানান তিনি৷
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৫ আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর স্থানীয় সংসদ ফজলে করিম চৌধুরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থরের জনপ্রতিনিধিদের বসরবাড়ি থেকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে ৷ প্রায় প্রতিদিনই বিচ্ছিন্ন ভাবে হামলা, লুটের ঘটনা ঘটলেও বেশীর ভাগ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থরা নীরব ভূমিকা পালন করছে৷ বর্তমানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বেশীর ভাগই এলাকা ছাড়া৷ নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাউজানের সিনিয়র এক আওয়ামী লীগ নেতা বাংলাদেশ বুলেটিনকে বলেন, "আসলে এমনটা হলে কখনো কল্পনাও করিনি৷ এই মূহুর্তে সাংগঠনিক কর্মকান্ডের চেয়ে নিজেদের ও নিজ নিজ পরিবারের জানমাল রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে। তবে ক্ষতিগ্রস্থতা প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠছে। ভূক্তভোগীরা আইনি লড়ায়ে নামলে আমরা সর্বোচ্চ সহায়তা করবো৷ ইতিমধ্যে হামলা ও লুটপাটের শিকার অনেক পরিবার আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগ করেছে৷
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের রাউজানে মো. ইউসুফ মিয়া (৬৫) নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রবিবার (০১ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় রাউজান পৌরসভার ৯নম্বর ওয়ার্ডের ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী বাগান বাড়ির পূর্ব পাশে একটি পরিত্যক্ত কক্ষ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ইউসুফ মিয়া বাগান বাড়িটির পুরনো কেয়ারটেকার বলে জানা গেছে৷ এই ঘটনায় থানায় একটি এজাহার দায়ের করেছে নিহতের ছেলে৷
আইন শৃংখলা বাহিনী যা জানালেন: পুলিশ স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলায় সদ্য যোগদানকারী পুলিশ সুপার (এসপি) রায়হান উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘স্বাভাবিক পুলিশিং কার্যক্রম একেবারে ভেঙে পড়েছিল। এর মধ্যে অনেক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আমরা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে চেষ্টা করছি।’ ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর ২ নম্বর গেটস্থ নিজ কার্যালয়ে চট্টগ্রামে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ সব কথা বলেন।
পুলিশ সুপার রায়হান বলেন, ‘মামলার তদন্ত কোয়ালিটি নিশ্চিত করতে চাই। যাতে বিচারের ক্ষেত্রে রেজাল্ট পাওয়া যায়। মাঠ পর্যায়ে পুলিশের সার্ভিসের পরিবর্তন করতে কাজ করব। যাতে চট্টগ্রাম জেলার মানুষের সহজে দ্রুত পুলিশের সেবা নিশ্চিত করতে পারি।’