সারাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হলেই ঢাকার বিকন্দ্রেীকরণ সম্ভব

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী দখল ও দূষণ, পরিবেশ দূষণ, পলিথিনের উচ্চ ব্যবহার এবং অসহনীয় যানজটের কারণে

2025-08-23T18:33:29+00:00
2025-08-23T18:33:29+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
সারাদেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হলেই ঢাকার বিকন্দ্রেীকরণ সম্ভব
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫, ৬:৩৩ পিএম   (ভিজিট : ১৬৪)
X

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ন, নদী দখল ও দূষণ, পরিবেশ দূষণ, পলিথিনের উচ্চ ব্যবহার এবং অসহনীয় যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় বসবাস ক্রমাগতভাবে অসহণীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, এ অবস্থা উত্তরণে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিতকল্পে সারাদেশের টেকসই উন্নয়ন জরুরী বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন ডিসিসিআই আয়োজিত ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভায় বক্তারা।     

আজ ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত “রাজধানী ঢাকার টেকসই উন্নয়নে বিকেন্দ্রীকরণ ও পরিবেশ সুরক্ষা” শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভা ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম-এ মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

মতিবিনিময় সভার স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের জিডিপিতে ঢাকা শহরের অবদান ৪৫%, যদিও ২০২২ সালে বুয়েট পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার প্রতিদিন যানজটের জন্য ১৪০ কোটি টাকার কর্মঘন্টা নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, ঢাকার উপর চাপ হ্রাস ও বিকেন্দ্রীকরণের জন্য প্রশাসনিক এবং বাণিজ্যিক কাজের ঢাকার আশেপাশের শহরগুলোকে সেকন্ডোরি শহর তৈরি করতে হবে। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও টেকসই মহানগর হিসেবে গড়ে তোলতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই বলে মত প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি।    

প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে পরিবেশ, বন এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দেশের জলবায়ু পরিবর্তন ঢাকার বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আরো প্রকট করছে। তিনি জানান, সারাদেশের টেকসইয়ের উন্নয়ন করতে হলে, তা সমাজ থেকে আসতে হবে, যেটা আমাদের মধ্যে বেশ অভাব রয়েছে। তিনি জানান, পলিথিন ব্যবহার কমাতে গত ১বছরে অনেক ঝুঁকি মোকাবেলা করে সরকার বেশকিছু কাজ করেছি, এখন সরকারী অনেক সংস্থাও এগিয়ে আসছে এবং আশা করছি ভবিষ্যতে ভালো ফল পাওয়া যাবে। পরিবেশ দূষণমুক্ত চাইলে দূষণকারী শিল্প-কারখানা বন্ধ করতে শিল্প-উদ্যোক্তাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। উপদেষ্টা আরো বলেন, ঢাকায় জনসংখ্যা কাঙ্খিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ রাখা বেশ কষ্টসাধ্য এবং বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে ঢাকার আশেপাশের শহরগুলোকে স্যাটেলাইট শহর হিসেবে গড়ে তোলা জরুরী। পুরোনো কাঠামো, লোকবল এবং প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করে, নতুন বাংলাদেশ উপহার দেওয়া বেশ কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন। পরিবশে উপদেষ্টা জানান, সরকার এয়ার পিউরিফায়ারের উপর আরোপিত ট্যাক্স অনেকাংশে কমানো হয়েছে, তা ব্যবহারে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ঢাকা শহরের আশেপাশে ৪টি নদী সহ সারদেশে ১৩টি নদী দখল ও দূষণ মুক্তকরতে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং একাজে দাতা সংস্থাগুলো সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।        

রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: রিয়াজুল ইসলাম বলেন, টেকসই ঢাকা তৈরি করতে হলে পুরো বাংলাদেশকেই টেকসই করতে হবে, যা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি, কারণ কর্মসংস্থানের অন্যতম উৎস হিসেবে রাজধানী শহরের কোন বিকল্প উৎস নেই, এর উপর চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং ভবিষ্যতেও এটা কমার সম্ভাবনা প্রতিফলিত হচ্ছে না। ঢাকার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মত প্রকাশ করেন, সেই সাথে সকল ধরনের উন্নয়নের কার্যক্রম একটি সংস্থার আওতায় নিয়ে আসার প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।    

এ মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্থপতি ইকবাল হাবিব, বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ রাজধানীতের বসবাস করলেও ঢাকার সবুজায়নের অভাব এবং উষতার বৃদ্ধির কারণে এখানকার জীবনযাপন বর্তমানে হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, অতিকেন্দ্রিকতার কারণে ঢাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি, বর্জ্য অব্যবস্থাপনার সংকট, নগর দূষণ এবং জনস্বাস্থ্য সংকট প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিশেষকরে দেশের নদীগুলোর সুরক্ষার জন্য তিনি নদীকমিশনের সক্ষমতা ও আইনী ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেন। ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণে সুষম নগরায়ন ও শহরের বিকেন্দ্রীকরণ ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের উপর তিনি জোরারোপ করেন। এছাড়াও ঢাকার প্রস্তাবিত রিং-রোডগুলোকে যোগযোগের করিডোর বিবেচনা করে প্রাধিকারভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরুী বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।      

উক্ত অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি)-এর ভূগোলবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদ দিলবাহার আহমেদ, রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)-এর সিনিয়র সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, ডিসিসিআই’র প্রাক্তন সহ-সভাপতি এম. আবু হোরায়রা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক, রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম, স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. জিয়াউল হক এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। 

বিআইপি’র সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার উন্নয়নকে মহানগরের বাইরে নিয়ে যেতে হবে, এর জন্য দেশের প্রান্তিক এলাকাগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য যথাযথ উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন করতে হবে।    

রিহ্যাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, ঢাকার রাস্তায় যান্ত্রিক ও অ-যান্ত্রিক যানবাহন চলার কারণে অসহনীয় যানজট হয়ে থাকে, এর দ্রুত প্রতিকার প্রয়োজন। তিনি রাজধানীর বাইরে সকল নাগরিক সুবিধা সম্বলিত স্যাটেলাইট শহর তৈরির উপর জোরারোপ করেন এবং এখাতে বেসরকারিখাতকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন। 

ডিসিসিআই প্রাক্তন সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ্ বলেন, জীবিকা সহ অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসার কারণে ঢাকা প্রতিনিয়ত ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে, তাই বিকেন্দ্রীকরণের কোন বিকল্প নেই।   

বুয়েটের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল হক বলেন, গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন না করে আমরা মেগা পরিকল্পনার উপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি, ফলে সামগ্রিকভাবে আমাদের ব্যয় বেড়েছে, যদিও তা জনগনের কাজে আসছে না। দেশের সমন্বিত উন্নয়নের জন্য সুষম পরিকল্পনার কাঠামোগত সংষ্কার প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। 

দিলবাহার আহমেদ জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে ১২৫ কিলোমিটার খাল উদ্ধার করা হয়েছে ও বৃক্ষরোপন করা হয়েছে, সেই সাথে রিজওন্যাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান বাস্তবায়ন ও ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। 

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ  মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ৩টি রিং রোডের মাধ্যমে ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণের প্রস্তাব হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি, ঢাকার চাপ কমাতে সাভার ও গাজীপুরকে স্যাটেলাইট শহরে হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উপর আহ্বান জানান।

সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ কাজী গোলাম নাসির বলেন, ১৫২৮ বর্গকিলোমিটারের ঢাকা শহরের পরিকল্পনার জন্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের উপর জোর দিতে হবে, খন্ডিত পরিকল্পনার কোন সুযোগ নেই, তাই সার্বিকভাবে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন একান্ত অপরিহার্য।

ডিএসসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকত মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার কারণ চিহ্নিত রয়েছে, তবে এর বাস্তব সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি জানান, পলিথিন ব্যবহারের উচ্চ হার ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ এবং পলিথিনের ব্যবহার হ্রাসকরণে জনগনকে নাগরিক দায়িত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।   

ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট খাতের স্টেকহোল্ডারবৃন্দ এসময় উপস্থিত ছিলেন।





Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy