
X
ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল কমপ্যাক্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (UN GCNB) 'সাসটেইনেবিলিটি ডে ২০২৫' উদযাপন করেছে- যা কর্পোরেট টেকসই উন্নয়ন, দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণ এবং উদ্ভাবনকে অগ্রসর করার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত একটি বার্ষিক ফ্ল্যাগশিপ অনুষ্ঠান।
মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠানটি উদযাপন করা হয়। এ বছরের থিম ছিল — “Catalyzing Change: Bangladesh at the Crossroads of Innovation” — যা বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে টেকসই পরিবর্তনের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে তুলে ধরেছে।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন খাতের ১৫০ জনেরও বেশি অংশগ্রহণকারী উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতিসংঘ সংস্থা, কূটনৈতিক মিশন, ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রতিষ্ঠান এবং শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা, যারা একত্রিত হয়ে আরও টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সবুজ অর্থনীতির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
উদ্বোধনী অধিবেশনে দেশি ও আন্তর্জাতিক অতিথিদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান। অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে ছিলেন ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল কমপ্যাক্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক রিপ্রেজেন্টেটিভ ফারুক সোবহান, ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিক অ্যাডভাইজর ওয়েই প্যারেই, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসির ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং জাতিসংঘ গ্লোবাল কমপ্যাক্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ বোর্ড চেয়ার ফারজানাহ চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) বাংলাদেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট এ.কে. আজাদ।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ফারুক সোবহান বলেন, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের জন্য এখনই সময় টেকসই কৌশলে উদ্ভাবনকে অন্তর্ভুক্ত করার। তিনি বলেন, “কর্পোরেট প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে তাদের মডেলকে পরিবেশগত ও সামাজিক অগ্রাধিকারের সাথে সামঞ্জস্য করতে পারে তার উপর।”
বিষয়ভিত্তিক কারিগরি অধিবেশনসমূহ উদ্বোধনের পর চারটি থিমেটিক টেকনিক্যাল সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নীতিনির্ধারক, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং টেকসই উন্নয়ন নেতৃত্বরা অংশ নেন।
প্রথম সেশন: “Greening Real Estate, Industry & Infrastructure in Bangladesh”
এই সেশনে আলোচনা হয় কীভাবে টেকসই নকশা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের নগর ও শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি টেকসই করা যায়। আলোচনায় ছিলেন—
মো. রেজাউল করিম, যুগ্ম সচিব (ENV-1), পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়;
স্থপতি ইকবাল হাবিব, পরিচালক, ভিটি স্থপতি বৃন্দ লিমিটেড;
স্থপতি তানিয়া করিম, পার্টনার, তানিয়া করিম ও এন.আর. খান অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস;
মাশিদ রহমান, ডিভিশনাল ডিরেক্টর, রিয়েল এস্টেট, রানকন হোল্ডিংস;
মাশুক মুজিব চৌধুরী, সিনিয়র ম্যানেজার, সাসটেইনেবিলিটি, ডিবিএল গ্রুপ।
বক্তারা জলবায়ু-সংবেদনশীল নকশা, নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
দ্বিতীয় সেশন: “Mainstreaming Sustainability Disclosures – Challenges & Opportunities”
এই সেশনে বাংলাদেশের কর্পোরেট খাতকে GRI, CSRD, ও ISSB-এর মতো বৈশ্বিক রিপোর্টিং মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্য করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়। বক্তারা ছিলেন— চৌধুরী লিয়াকত আলী, পরিচালক, সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংক; মনতাসির নাহিদ, ন্যাশনাল লিড, গ্লোবাল ফ্যাশন অ্যাজেন্ডা; তাহমিদ চৌধুরী, প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর, প্রগ্রেস, সুইসকন্টাক্ট বাংলাদেশ মোহাম্মদ মনোয়ার হোসেন, প্রধান, সাসটেইনেবিলিটি, টিম গ্রুপ; এবং মোল্লা করিমুল ইসলাম, অপারেশনাল হেড, সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগ, দ্য সিটি ব্যাংক পিএলসি।
বক্তারা স্বচ্ছতা, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং তথ্যনির্ভর ইএসজি রিপোর্টিং-এর গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তৃতীয় সেশন: “From Waste to Value – Embracing Circularity”
এই সেশনে শিল্প খাতে সম্পদ দক্ষতা ও বর্জ্য হ্রাসে উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক মডেল, প্রযুক্তি ও অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। সেশনের আলোচনায় ছিলেন—
কে.এম. আসাদুন নূর, ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর, SWITCH2CE প্রকল্প, ইউনিডো বাংলাদেশ;
আশিম রহমান, পলিসি অ্যাডভাইজর, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট, নেদারল্যান্ডস দূতাবাস;
মিস সুমাইয়া টি. আহমেদ, প্রধান, সাসটেইনেবিলিটি, প্রান-আরএফএল গ্রুপ;
এ.বি.এম. ফকরুল আলম, প্রধান, সাসটেইনেবিলিটি, উর্মি গ্রুপ।
বক্তারা সার্কুলার ইকোনমি ও শিল্প খাতের পুনর্ব্যবহারযোগ্য উদ্যোগগুলো নিয়ে অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন।
চতুর্থ সেশন: “Sustainability Communication & Storytelling”
এই সেশনে আলোচিত হয় কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের টেকসই উদ্যোগের গল্পকে সত্যনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করতে পারে এবং স্টেকহোল্ডারদের আস্থা অর্জন করতে পারে।
সেশনের আলোচনায় ছিলেন
মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, পরিচালক, কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স ও সাসটেইনেবিলিটি, সিঞ্জেন্টা বাংলাদেশ;
দেবাশীষ রায়, পরিচালক, ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্ট এক্সচেঞ্জ (IIX) বাংলাদেশ;
মো. মাহাদি ফয়সাল, ডেপুটি ডিরেক্টর, ক্যাটাগরি গ্রোথ ও ইএসজি, এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেড;
মিস ফারহানা ইসলাম তেরেসা, প্রধান, সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট, গ্রামীণফোন।
বক্তারা বিশ্বাসযোগ্য বার্তা নির্মাণ, তথ্যনির্ভর গল্প বলা এবং গ্রিনওয়াশিং এড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন ইউনাইটেড নেশনস গ্লোবাল কমপ্যাক্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মিস শাহামিন এস. জামান। তিনি বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানান জাতিসংঘ গ্লোবাল কমপ্যাক্টে যোগ দিতে, যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ কর্পোরেট টেকসই উন্নয়ন উদ্যোগ।
তিনি বলেন, সাসটেইনেবিলিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শুধু ঋবাংলাদেশে নয় বিশ্বের সারা দেশে কিন্তু সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে সরকার এবং প্রাইভেট সেক্টর অনেক কাজ করছে। আমরা চাই সাসটেইনেবিলিটি নিয়ে আরো কাজ করতে। আমরা ক্লাইমেট নিয়ে, এনভায়রনমেন্ট নিয়ে গার্মেন্টস্ , ক্ষুদ্রশিল্প, সোশাল ইকোনমিক নিয়ে আরো কাজ করতে পারি। যার মাধ্যমে আমাদের দেশটাকে ভবিষ্যতে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমাদের দেশ যেহেতু এসডিজি গ্রাজুয়েশন হওয়ার কথা। আমরা যদি আমাদের দেশটাকে নিজেরাই ঠিক না করতে পারি তাহলে ভবিষ্যতে উন্নতি করতে পারবোনা।
অনুষ্ঠানের আলোচনায় একটি যৌথ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পায় যা বাংলাদেশের বেসরকারি খাতকে উদ্ভাবন, স্বচ্ছতা এবং সহযোগিতাকে টেকসই উন্নয়নের মূল কেন্দ্রে রাখতে হবে — যাতে প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ নেয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন হয়।