
X
টঙ্গীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি জামে মসজিদের খতিব মুফতি মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী অপহৃত হন নি। পুলিশের কাছে এমন স্বীকারোক্তি দিলেন তিনি নিজেই। পুরো ঘটনা পরিকল্পিত নাটক বলে মনে করছে পুলিশ।
তিনি নিজেই নিজের পায়ে শিকল লাগিয়ে শুয়ে ছিলেন, এসব কিছু তার নিজের পরিকল্পিত কাজ। তাকে পঞ্চগড়ে কেউ নিয়ে যায়নি। কেউ তার দাড়ি কাটেনি। কেউ তাকে নির্যাতন করেননি। ঘটনাটি একটি সাজানো নাটক বলে মন্তব্য মনে করছে পুলিশ।
পুলিশ জানায়, মুফতি মুহিব্বুল্লাহর দাবি করা অপহরণের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ট্র্যাকিং এবং চিকিৎসকের রিপোর্টে চরম অসঙ্গতি পাওয়া যায়। এরপর ঘটনার আসল রহস্য উদ্ধারে ছায়া তদন্তে নামে পুলিশ। পরে তদন্তের একপর্যায় সন্দেহের তীর যায় খতিবের বিরুদ্ধেই। এ ঘটনার পর গতকাল সোমবার বিকালে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে হেফাজতে নেয় টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ।
পরে আজ মঙ্গলবার দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়াটার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে অপহরণের ঘটনাটি মিথ্যা এমন স্বীকারোক্তি দেন মুফতি মোহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ মিয়াজী।
তিনি বলেন, গত বুধবার ২২অক্টোবর সকাল সাতটায় টঙ্গী পূর্ব থানাধীন টিএন্ডটি বাসা থেকে হাটতে বের হয়ে পূবাইল মীরের বাজার থেকে সিএনজিতে করে বাসন থানাধীন ভোগরা বাইপাস এলাকায় গিয়ে নামেন। পরে ভোগরা বাইপাস হতে ঢাকা শ্যামলী পরিবহনে পঞ্চগড়গামী শ্যামলী পরিবহনে যাত্রা শুরু করেন। বাসটি যাত্রাপথে বগুড়া জেলার শেরপুর থানাধীন পেন্টাগন হোটেলে মাগরিবের নামাজের জন্য সন্ধ্যা ৫:৪০ ঘটিকার সময় যাত্রাবিরতি করলে তিনি বাস থেকে নেমে হোটেলে নামাজ পড়ে দ্রুত বাসে উঠেন।
অতঃপর রাত সাড়ে এগারটায় পঞ্চগড় জেলার সর্বশেষ বাস স্টেশনে নেমে তিনি হাটতে থাকেন। পরে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা পুলিশ লাইন্স এর সামনে গিয়ে পৌছলে তার প্রসাবের বেগ হলে তিনি আরও কিছু দূর এগিয়ে অন্ধকার একটি জায়গায় রাস্তার পাশে প্রসাব করেন। এসময় প্রস্টেট গ্রন্থির রোগের কারণে তার পায়জামা ও পাঞ্জাবি ভিজে গেলে তিনি তার নিজ হাতে পায়জামা ও পাঞ্জাবি খুলে ফেলেন।
কিন্তু কিছুটা ঠান্ডা অনুভব করায় এবং শরীর ক্লান্ত থাকায় অবচেতন মনের কারণে তার পক্ষে পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরিধান করা সম্ভব হয় নাই। এসময় রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া সোনালী রংয়ের একটি ছোট তালা সংযুক্ত একটি শিকল তিনি পায়ে জড়িয়ে রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে পড়েন। এঘটনার পর ওই এলাকার স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। ঘুম থেকে জেগে তিনি দেখতে পান তিনি পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে আছেন।
আশেপাশের উলামায়ে কেরামগণ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার অবচেতন মনে তিনি বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলেন। পরে টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ তাকে পঞ্চগড় থেকে উদ্ধার করে টঙ্গীতে নিয়ে আসেন।
তার দেয়া বক্তব্যে তিনি আরো বলেন, আমি এটা অন্যায় করেছি, আমার ভুল হয়েছে। কেন যে এমন করছি, কিছুই বলতে পারছি না। পুলিশের যা ভালো মনে তাই করবে। তবে এ ঘটনা লাইভ করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে না দেওয়ার অনুরোধও জানান তিনি।
পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেওয়া জেলার সিভিল সার্জন মো. মিজানুর রহমান বলেন, শরীরে আঘাতের চিহ্ন কিংবা উনাকে মারধর করা হয়েছে এমন কিছু আমরা পাইনি। সিভিল সার্জন আরও জানান, ব্যথা অনুভব করার কথা বলায় তাকে ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো জখম বা আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান বলেন, ইমাম মুহিবুল্লাহ অপহরণের পেছনে ইসকন জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছিল। তবে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে তিনি নিজে শ্যামলী পরিবহনের বাসের টিকিট কেটে পঞ্চগড় গেছেন। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় চাঞ্চল্যকর এই মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ইমাম মুহিবুল্লাহর বাসের সহযাত্রী এবং বাসের সুপারভাইজারও পুলিশের হেফাজতে আছে। ইতোমধ্যে ইমাম মুহিবউল্লাহ পুলিশের কাছে প্রকৃত ঘটনা স্বীকার করেছেন। খতিব মহিবুল্লাহ নিজেই অপহরণের নাটক সাজিয়েছেন।
উল্লেখ্য, গত ২২ অক্টোবর বুধবার সকাল ৭টায় টঙ্গীর শিলমুন এক্সিস লিংক সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন সেন্টারের সামনে থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তুলে নেওয়ার দাবি করেন। পরের দিন বৃহস্পতিবার সকালে পঞ্চগড় থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। এরপর টঙ্গী পূর্ব থানায় একটি অপহরণ মামলা করা হয়। ওই মামলার রেশ ধরেই বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।