
X
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেট জেলার চারটি আসন নিয়ে বিএনপি মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে নতুন হিসাব-নিকাশ চলছে। সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এতদিন যারা শোডাউনে ছিলেন, তাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ লড়াই শুরু হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াত। সিলেটের চারটি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটাতে জামায়াত নীরবে তৎপরতা শুরু করেছে।
বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, সিলেট-১ আসনে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট-৩ আসনে এম এ মালিক, সিলেট-৬ আসনে এমরান আহমদ চৌধুরী মনোনয়ন পেয়েছেন। তবে সিলেট-৪ ও সিলেট-৫ আসনে এখনও দলটি কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। এই দুটি আসন কৌশলগত কারণে ফাঁকা রাখা হয়েছে।
তাদের এই মনোনয়ন মানতে পারছেন না নিজ দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। এতে সামনে নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ কাজ করবে। সিলেটের এই আসনগুলোতে বিএনপির প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটাতে জামায়াত নানা তৎপরতা চালাবে বলে দলের অনেক নেতাকর্মীরা মনে করছেন।
দলটির একাধিক নেতা জানান, সিলেট-১ আসনে খন্দকার মুক্তাদির মনোনয়ন লাভ করায় আরিফ বলয়ে এখন অভ্যন্তরীণ লড়াই কাজ করবে। আরিফকে যদি সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি গিফট দিয়ে দলটি রাজি করাতে পারে, তাহলে আরিফ প্রকাশ্যে কোনো বিরোধীতায় যাবেন না। কিন্তু যদি মেয়র পদেও আরিফ কোনো নিশ্চয়তা না পান তবে সিলেট-১ আসনে বিএনপির ভরাডুবি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
কারণ, আরিফ ইতিপূর্বে বলেছেন,“সিলেট-১ আসন না পেলে আসসালামু আলাইকুম”। মঙ্গলবার আরিফুল হক ঢাকায় কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে গিয়েছেন। সেখানে তার ব্যাপারে যদি কোনো সুরাহা করা হয়, তবে আসনটিতে বিএনপির দ্বন্দ্ব কমে আসতে পারে। আরিফকে সিলেট-৪ আসন অথবা মেয়র পদ দিতে জোর লবিং করা হচ্ছে। সিলেট-১ আসনে আরিফুল হক একটি ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছেন বিএনপির অনেক নেতারা। যদি তিনি কোনো কারণে দলের বিপক্ষে অবস্থান করেন, তাহলে সিলেট-১ আসনে খন্দকার মুক্তাদিরের পরাজয়ের আশঙ্কা রয়েছে। কেননা, সিলেট-১ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হলেন মাওলানা হাবিবুর রহমান। তাকে নিয়ে নতুন হিসাবে যাবে মুক্তাদির বিরোধীরা।
দলীয় সূত্র জানায়, সিলেট-৩ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম এ মালিক। দীর্ঘ ১৯ বছর পর দেশে ফিরে তিনি এবার নির্বাচন করতে দল থেকে মনোনীত হলেন। তার সঙ্গে মনোনয়ন দৌড়ে ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এ সালাম ও জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। ইতিপূর্বে এই আসনটির বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। এম এ মালিক মনোনয়ন পাওয়ায় কাইয়ুম ও সালাম বলয়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ লড়াই কাজ করছে।
মালিকপন্থীদের সঙ্গে সাম্প্রতিক শোডাউন থেকে দ্বন্দ্ব রয়েছে নেতাকর্মীদের। সেই দ্বন্দ্বে ভাগ বসাবেন জামায়াত থেকে একক প্রার্থী মাওলানা লোকমান আহমদ। মাওলানা লোকমান জামায়াত থেকে দক্ষিণ সুরমার উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। একসময় ফেঞ্চগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যানের পদও জামায়াতের দখলে ছিল। এই আসনটিতে আওয়ামী লীগের ভোট ও বিএনপির বিদ্রোহীদের ভোট মিলে হিসাব-নিকাশ বদলে দিতে পারে। তাই এম এ মালিকের আসনেও বিএনপির ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে।
সিলেট-২ আসনে এম ইলিয়াস আলী পত্নী তাহসিনা রুশদি লুনা কিছুটা নির্ভার আছেন। হুমায়ুন কবিরকে দলটির যুগ্ম মহাসচিব করায় সিলেটের বিশ^নাথ-ওসমানীনগর আসনে নিরাপদ অবস্থানে আছে বিএনপি। তাই সিলেটের ঘোষিত চারটি আসনের মধ্যে একমাত্র সিলেট-২ আসনে ইলিয়াস আলীর ভক্তরা তাহসিনা রুশদির লুনার বিজয় নিশ্চিত করে দিতে পারে বলে দলটির সূত্র জানিয়েছে।
সিলেট-৬ আসনে মূল লড়াইয়ে ছিলেন জেলা বিএনপির সদস্য ফয়সল আহমদ চৌধুরী, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী ও সাবেক এমপি ড সৈয়দ মকবুল হোসেন কন্যা সৈয়দ আদিবা হোসেন। আসনটিতে মনোনয়ন পেয়েছেন এডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। এছাড়াও আসনটিতে লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় নেতা আবুল কাহের শামীম, চিত্রনায়ক ও জাসাস নেতা হেলাল খান ও যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি কমর উদ্দিনের কন্যা সাবিনা খান পপি। তারেক রহমান দেশ ত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে কমর উদ্দিনের আশ্রয়ে ছিলেন। তারেক রহমানের সখ্যতায় বিয়ানীবাজারে কমর উদ্দিন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা হিসেবে মাঠে-ঘাটে পরিচিত ছিলেন। তার একটি বলয় বিয়ানীবাজারে আছে।
এদিকে, ড সৈয়দ মকবুল হোসেন ওই আসনের দুবারের এমপি ছিলেন। তারও একটি শক্ত অনুসারি রয়েছে। যা এই দুই নেতার কন্যাদের হাত ধরে মাঠে সক্রিয় রয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে নানাভাবে আলোচনা-সমালোচনায় ছিলেন বিএনপি নেতা ফয়সল আহমদ চৌধুরী। বিগত নির্বাচনে তিনি ওই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নিজের অবস্থান বেশ পাকাপোক্ত করেছেন। মনোয়ন ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ও তার বলয় মাঠে সরব ছিল।
এমরান চৌধুরীর বিজয় এখন নির্ভর করছে প্রতিপক্ষের চেয়ে নিজ দলের বলয়গুলোর উপর। আসনটিতে জামায়াতের মনোনীত একমাত্র প্রার্থী হলেন মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীরের দায়িত্ব পালন করছেন। ওই আসনটিতে জামায়াতের জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমানের নির্বাচন করার কথা ছিল। তিনি আসনটিতে জামায়াতকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে গেছেন। পরে দলীয় নির্দেশে তিনি সিলেট-১ আসনে সরে আসেন। এরফলে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের দূর্গ পূর্ব থেকেই শক্তিশালী রয়েছে।