
X
উত্তরাঞ্চলের মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন বহুল প্রতীক্ষিত তিস্তা মহা-পরিকল্পনা কি সত্যিই তাদের দীর্ঘদিনের দুঃখ-কষ্টের স্থায়ী সমাধান আনবে, নাকি এটি আবারও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে থাকবে?
তিস্তা নদী উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা, আর শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানিশূন্যতা—এই দুই চরম পরিস্থিতির মধ্যেই নদীতীরের মানুষের জীবনযাপন। নাব্য সংকট, চর জেগে ওঠা, কৃষি ক্ষতি এবং লাগাতার নদীভাঙন তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। এ অবস্থায় তিস্তা নিয়ে বড় উদ্যোগ মানে স্থানীয়দের কাছে টিকে থাকার প্রশ্ন।
তিস্তায় পানিবণ্টন নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। ১৯৮৩ সালের অন্তর্বর্তী চুক্তি কিংবা ২০১১ সালের খসড়া স্থায়ী চুক্তি কোনোটিই বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষ করে ২০১১ সালের পরিকল্পনা পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতে থেমে যাওয়ার পর বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার তিস্তা মহা-পরিকল্পনায় আবারও তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। চীনা দূতাবাসের প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে প্রাথমিক জরিপ সম্পন্ন করেছে। প্রথম ধাপের ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় নদীভাঙন রোধ, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ–ব্যবস্থা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) খসড়া চুক্তি চীনের কাছে পাঠিয়েছে। চীনের রাজনৈতিক বিভাগের পরিচালক জংজিং জানিয়েছেন, সবকিছু চূড়ান্ত হলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্প বাস্তায়ন শুরু হতে পারে। চীনা প্রতিনিধিরা এ ছাড়া বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং বিভিন্ন নদী–রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন।
রিভারাইন পিপলের গবেষণায় দেখা গেছে, তিস্তার ভাঙন ও প্লাবনে প্রতিবছর পাঁচ জেলার মানুষের ক্ষতি এক লাখ কোটি টাকারও বেশি। নদীভাঙনে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সংকটে পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর বড় প্রকল্পের ঘোষণা এলেও বাস্তবায়ন হয়নি। তিস্তার উন্নয়ন বরং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তিস্তা আজ শুধু পানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এটি উত্তরবঙ্গের মানুষের আবেগ, তাদের জীবনের সংগ্রাম এবং ভোট–রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। নির্বাচন এলেই তিস্তা নিয়ে প্রতিশ্রুতির বন্যা নামে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে অগ্রগতি দেখা যায় কম।
সূত্র জানায়, আগের সরকারের সময়ই চীনের সঙ্গে তিস্তা উন্নয়ন নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল। ২০১৬ সালে চায়না পাওয়ার তিস্তার দুইপাড়ে আধুনিক স্যাটেলাইট শহরসহ বড় প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন ইস্যু ও কূটনৈতিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
সব মিলিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন-তিস্তা মহা-পরিকল্পনা কি সত্যিই তাদের বহুবছরের দুঃখ-কষ্টের স্থায়ী সমাধান আনবে, নাকি এটি আবারও নির্বাচনী কৌশলের অংশ হিসেবেই থেকে যাবে?