বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়: উপদেষ্টা ফরিদা

কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, বিশেষ প্রতিনিধি

জাতীয়

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের

2025-11-28T16:46:47+00:00
2025-11-28T18:19:07+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়: উপদেষ্টা ফরিদা
কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ৪:৪৬ পিএম  আপডেট: ২৮.১১.২০২৫ ৬:১৯ পিএম  (ভিজিট : ৫৩)
X

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাওয়া খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।

তিনি বলেন, মানুষ খাদ্য খায় বেঁচে থাকার জন্য, কিন্তু সেই খাদ্য কেন রোগের উৎস হচ্ছে। খাদ্য যেন রোগের উৎস না হয়। দেশের সামগ্রিক পুষ্টিচিত্র নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় গড় হিসাবের ওপর নির্ভরতা একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। ধনী মানুষের আয় দিয়ে গরিব মানুষকে বিচার করবেন না। কৃষিতে আমরা ভর্তুকির কথা শুনি। কিন্তু প্রাণী ও মৎস্যে ভর্তুকি পাই না। এ খাতেও ভর্তুকি দরকার।

শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী ‘কৃষি ও খাদ্যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা এ কথা বলেন। বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরাম (বিএজেএফ) আয়োজিত এ সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের বিষয় ছিল ‘জাতীয় প্রাণিসম্পদ সপ্তাহ: পুষ্টি নিরাপত্তায় প্রাণী ও মৎস্য খাত’। বিএজেএফের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।

ফরিদা আখতার জানান, ওপরের কয়েক শতাংশ মানুষের ভোগক্ষমতার গড় তুলে ধরা হলে বাস্তবে গরিব মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস ও পুষ্টিঘাটতি আড়াল হয়ে যায়। ফলে নীতিনির্ধারণে ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মৌলিক পুষ্টি-চাহিদা অজানাই থেকে যায়। দেশীয় প্রাণিসম্পদ শুধু উৎপাদনশীলতার জন্য নয়, গ্রামীণ খাদ্যচাহিদা, সংরক্ষণ সুবিধা, নারীর কর্মসংস্থান ও কৃষির ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে শিল্প হিসেবে দেখা হলেও উৎপাদনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এখনো গ্রামীণ সাধারণ মানুষের হাতেই হচ্ছে। শিল্পায়ন প্রয়োজন, তবে দেশীয় প্রজাতির সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে সংকর জাত তৈরির সময় যেন দেশীয় জাতের মৌল বৈশিষ্ট্য হারিয়ে না যায় সেদিকেও তিনি কঠোর সতর্কতা দেন।

পুষ্টিহীনতার প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, ‘জিরো হাঙ্গার’ মানে শুধু পেটভরে খাওয়া নয়, পুষ্টিমান নিশ্চিত করাও জরুরি। আমরা বছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার সংখ্যা ১৩৭টি বলি। কিন্তু এই গড় হিসাব ধনী-গরিবের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাসের বৈষম্যকে আড়াল করে দেয়। ফলে দরিদ্র মানুষের প্রকৃত ভোগ্যচিত্র অদৃশ্য থেকে যায়।

গ্রামীণ খাদ্যব্যবস্থার বৈচিত্র্য রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উৎপাদনকারী জেলার মানুষও অনেক সময় নিজ এলাকার দেশীয় মাছ খেতে পারেন না। সুনামগঞ্জে দেশীয় মাছের স্বাদ অত্যন্ত ভালো হলেও অনেক সুনামগঞ্জবাসী এখন একোয়াকালচারের পাঙাস খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব বাস্তব তথ্য সাংবাদিকদের তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে একোয়াকালচারের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে উপদেষ্টা বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ফিড ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এসব বিষয়ে এখনই নিয়ন্ত্রণ জরুরি। মাংস খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু গরুর মাংসই মাংসের একমাত্র উৎস নয়। মহিষ, ভেড়া, হাঁস-মুরগি ও কোয়েলসহ সব ধরনের মাংস ও ডিমের দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রেড মিটের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও মাথায় রাখতে হবে।

খাদ্যে ফোর্টিফিকেশনকে (প্রক্রিয়াকরণকালে পুষ্টি যোগ করা) একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক উৎসে উৎপাদিত খাবারের পুষ্টিগুণ বেশি। কীটনাশকের ব্যবহার কমানো না গেলে খাদ্যই ভবিষ্যতে রোগের উৎসে পরিণত হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। উপদেষ্টা বলেন, দেশীয় জাতের মাছ, মাংস ও প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ, যেগুলো রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। পৃথিবীর অনেক দেশের যেসব প্রাণিসম্পদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আমাদের দেশে টিকে আছে।

স্বাগত বক্তব্যে সাহানোয়ার সাইদ শাহীন বলেন, আমরা বিএজেএফ থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বেশ কিছু রাজনৈতিক ও নীতিগত অঙ্গীকার চাই। এর মধ্যে নদীর মাছ ফেরত আনা, অযাচিত বালাইনাশক ব্যবহার কমানো, চাষের মাছের গুণগত মান রক্ষা এবং খামারিদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ দেখতে চাই।

অনুষ্ঠানে সামুদ্রিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা ও সুনীল অর্থনীতি বিষয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. জিয়া হায়দার চৌধুরী। তিনি বলেন, মজুত জরিপ, জেলেদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ, আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার ফলে বাংলাদেশ সুনীল অর্থনীতির বাণিজ্যিক ও টেকসই বিকাশের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মেরিন স্পেশিয়াল প্ল্যানিং, টেকসই আহরণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমুদ্রের স্বাস্থ্যের উন্নয়ন- এ চার খাতে বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবদুর রউফ বলেন, নদীর মাছ কমার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট কারণ রয়েছে। আমরা চাষের ক্ষেত্রে কীটনাশকের ব্যবহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনার কৌশল বাস্তবায়ন করছি। নিরাপদ মাছ উৎপাদন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. সাজেদুল করিম সরকার বলেন, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) এখন পর্যন্ত ৯৭টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। দুধ, ডিম ও মাংস উৎপাদনে জেনেটিক উন্নয়ন, ফডার (ঘাস চাষ) প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণার ফলে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।

মাছের খাদ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে আস্থা ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদিত ফিশ ফিড এখন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হচ্ছে, যা দেশের রপ্তানি খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তবে এ খাতকে টেকসই করতে ফিশ ফিডের জন্য বিশেষ রপ্তানি প্রণোদনা নীতির প্রয়োজন রয়েছে।

ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে এসিআই এগ্রিবিজনেসের প্রেসিডেন্ট ও এসিআই লিমিটেডের গ্রুপ উপদেষ্টা ড. ফা হ আনসারী বলেন, কৃষি ভ্যালু চেইন শক্তিশালী হলে কৃষকের ওপর মধ্যস্বত্বভোগীদের চাপ কমবে এবং খাদ্যপণ্যের দামের অস্থিরতাও নিয়ন্ত্রণে আসবে। গবেষণা থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ পর্যন্ত সমন্বিত ব্যবস্থাপনার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা নীতির তাগিদ দিয়ে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. কাজী ইমদাদুল হক বলেন, কৃষিকে টেকসই করতে উৎপাদনের পাশাপাশি ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করা এবং গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি হ্রাস ও মূল্যনীতির দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিএজেএফের চার দিনের এ সম্মেলনে সহযোগিতায় রয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।





Loading...
Loading...


জাতীয় এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy