দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে একদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বাজার সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন দেশি পেঁয়াজ বাজারে আসা এবং ভারত থেকে আমদানির অনুমতি (আইপি) দেওয়ার সরকারি ঘোষণার প্রভাবেই হঠাৎ কমেছে দাম।
ব্যবসায়ীরা জানান, বৃহস্পতিবার ও শনিবার যে পেঁয়াজ ১৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল, সেটি রোববার নেমে এসেছে ৯০ টাকায়। পাশাপাশি নতুন আসা মেহেরপুর জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে কেজি ৭০ থেকে ৮৫ টাকায়।
গত কয়েকদিনে হঠাৎ দেশি পেঁয়াজের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে ভারত থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। শনিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩০ টনের ৫০টি আইপি দেওয়ার তথ্য জানায়। এ ঘোষণার পরই সারাদেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে পেঁয়াজের দামে বড় প্রভাব পড়ে।
বাজার ঘুরে দেখা গেল নতুন পেঁয়াজের সরবরাহ
সরেজমিনে খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকার পেঁয়াজের আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি আড়তে নতুন পেঁয়াজ এসেছে। মেহেরপুরি জাতের এ পেঁয়াজ আকারে পাবনা ও সিরাজগঞ্জের পেঁয়াজের তুলনায় বড়।
মেসার্স আল মুনিরিয়া ট্রেডার্সের ম্যানেজার আবদুল আজিজ বলেন, “ভারত থেকে আমদানির খবরে রাতের মধ্যেই দাম কমে গেছে। শনিবার ১৩০ টাকায় যে পেঁয়াজ বিক্রি করেছি, আজ সেটা ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন মেহেরপুরি পেঁয়াজ কেজি ৭৫-৮০ টাকায় বিক্রি করছি।”
মেসার্স এ এইচ ট্রেডার্সের ম্যানেজার ইয়াসির আরাফাত বলেন, “এখনো আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে আসেনি। তবে নতুন মৌসুমের আগাম দেশি পেঁয়াজ আসতে শুরু করেছে। শনিবার আইপি দেওয়ার খবর ছড়ানোর পর প্রতি কেজিতে ৩৫-৪০ টাকা কমেছে দাম। বৃহস্পতিবার যে পেঁয়াজ ১১০ টাকায় বিক্রি করেছি, সেটি এখন ৭৫ টাকায় নেমেছে।”
মৌসুমের শেষ সময়ে হঠাৎ অস্থিরতা
চলতি বছর প্রায় পুরো চাহিদাই মিটেছে দেশি পেঁয়াজে। স্বাভাবিক সময়ে খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাইয়ে দৈনিক ১৫-১৮ ট্রাক পেঁয়াজ আসে। গত সপ্তাহে কিছুটা কমলেও বর্তমানে সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হয়েছে।
চাক্তাইয়ের মেসার্স বশর অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবুল বশর বলেন, “এবার কৃষকরা ভালো দাম পেয়েছেন। সারাবছর সরবরাহও ভালো ছিল, কারণ দেশে উৎপাদন বেশি হয়েছে। কিন্তু মৌসুমের শেষ সময়ে কিছু কৃষক বেশি লাভের আশায় দাম বাড়িয়ে দেন। ফলে মোটা পেঁয়াজ কেজিতে ১৩০-১৪০ টাকায় উঠে যায়। বাধ্য হয়ে সরকার আমদানির অনুমতি দেয়। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি বস্তায় দুই হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এখন বাজারে নতুন ও পুরনো দুই ধরনের পেঁয়াজই আছে। দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। আগামী কয়েকদিনে দাম আরও কমবে।”
উৎপাদন ও সংরক্ষণে বড় পরিবর্তন
ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩২ লাখ টন। উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও আগে সংরক্ষণের অভাবে ৩০-৩৫ শতাংশ পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে যেত। ফলে আমদানির প্রয়োজন হতো।
কৃষি বিভাগ এবার কৃষকদের আধুনিক ‘এয়ার ফ্লো’ সংরক্ষণ প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। এতে পেঁয়াজ পচন কমে ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—
২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫২ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ৯৯০ টন।২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮৭ টন।২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৮০ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন।২০২৫-২৬ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন উৎপাদনের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, “আগে সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে বড় ধরনের ক্ষতি হতো। এবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সেই ঘাটতি হয়নি। এখনো অনেক কৃষকের হাতে পুরনো পেঁয়াজ মজুত আছে। তাই বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নতি এবং প্রয়োজনের সময় আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এবার পেঁয়াজের বাজারে বড় সংকট এড়ানো সম্ভব হয়েছে।