ঝালকাঠির নলছিটি পৌর এলাকার সূর্যপাশা গ্রামে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সামাজিক অবক্ষয়ের কতটা গভীরে আমরা তলিয়ে গেছি। ৭৫ বছর বয়সী সেকেন্দার আলী ও তার স্ত্রী, জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও পাননি সন্তানের স্নেহ, পাননি পিতার প্রাপ্য মর্যাদা। তিন পুত্রের তিনটি বিলাসবহুল বাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তাদের ভাগ্যের প্রতীক একটি ভাঙাচোরা, অন্ধকার, বিদ্যুৎহীন ঘর। যে তিন ছেলের জন্য জীবনের সমস্ত শ্রম, ঘাম, ত্যাগ ও স্বপ্ন বিলিয়ে দিয়েছেন এই দম্পতির সেই ছেলেরাই আজ তাদের রেখেছেন সবচেয়ে অনাদিতে।
ছেলেদের ঘরে রয়েছে বিলাসি জীবন জ্বাপনের আরাম আয়েশের মনের মতকরে সাজানো টাইলসের চকচকে ফ্লোর,গ্যাসের চুলা,বিদ্যুতের উজ্জ্বল আলো,ফ্রিজসহ আধুনিক সব সুবিধা। জীবনের শেষ প্রান্তে অবহেলার যন্ত্রণা বয়সের ভারে ন্যুব্জ সেকেন্দার আলী দম্পতি আর ঠিক সেই উঠানেই সেকেন্দার আলীদের রাত কাটে অন্ধকারে। বর্ষায় চালের ফাঁক দিয়ে পানি ঝরে পড়ে মাথায়, শীতে হাড় কাঁপানো ঠান্ডা ঢুকে পড়ে ঘরে। একটি বাল্বও জ্বলায় না তাদের ঘরে কারণ ছেলেরা কেউ সেটুকুও করে দিতে রাজি নয়।
দুঃখের খাবার, দুঃখের জীবন,নিত্যদিনের খাবার বলতে ভাত আর আলু ভর্তাই। মাছ মাংশ, তাদের কপালে জোটেনা। মাটির চুলায় রান্না করতে হয়। জ্বালানি জোগাড় করতে আশপাশের বাড়ির বাগান থেকে শুকনো পাতা, ঝরা ডাল কুড়িয়ে আনেন তারা। এ যেন বেঁচে থাকা নয়, বেঁচে থাকার মতো চেষ্টা। ছোট ছেলের পাকা বাড়িটি তালাবদ্ধ। বাড়িটি ফাঁকা পড়ে থাকলেও দরজা খুলে জায়গা হয়নি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য। স্থানীয়রা ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলছেন “ফাঁকা বিল্ডিং তালা দিয়ে রাখা হয়, আর জন্মদাতা বাবা-মাকে থাকতে দেওয়া হয় ভাঙা ঘরে এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে?”এ কি আমাদের সমাজ?
এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশের সর্বত্র সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। মানুষ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে,এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি, যেখানে বিলাসবহুল বাসার সামনেই বাবা-মাকে অন্ধকারে ফেলে রাখা হয়? কোথায় মানবতা, কোথায় নৈতিকতা, কোথায় সন্তানধর্ম? আমাদের বিবেক কি জেগে উঠবে? সচেতন নাগরিকদের দাবি এমন ঘটনা শুধু প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নয়, সমাজের বিবেককে নাড়া দিক। কেউ যেন তার মা-বাবাকে এমন জীবন দেখতে না দেয়। যে হাতে ধরেই সন্তানেরা মানুষ হয়, বয়সের ভারে যখন সেই হাত কাঁপে তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোই হচ্ছে মানবতার সর্বোচ্চ পরিচয়।ছেলেদের সাথে যোগাযোগ করা হলে কথা বলতে রাজি হননি।