
X
গাজীপুরের শ্রীপুরে বাংলাদেশ তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরীক্ষামূলক খামারে ফুটে উঠেছে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী দেশি তুলা ফুটি কার্পাস। আবহাওয়ার পরিবর্তন, কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং আধুনিক উচ্চ ফলনশীল জাতের জনপ্রিয়তার কারণে বহু বছর ধরে হারিয়ে যেতে বসা এ দেশি তুলার পুনরুদ্ধার কৃষি গবেষণায় উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
গবেষকদের মতে, ফুটি কার্পাস ছিল বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে একসময়ের পরিচিত তুলা গাছ। তবে উচ্চ ফলনের জাত,উৎপাদন ব্যয় এবং চাষাবাদের ধরনে পরিবর্তনের কারণে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ জাতটির সঙ্গে পরিচিতি হারিয়ে গেছে। দীর্ঘদিনের গবেষণা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পর অবশেষে এ প্রজাতি পুনরুদ্ধারে সফল হয়েছে তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউট।
সংরক্ষিত বীজ থেকে পুনরায় চারা উৎপাদন বাংলাদেশ তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা জানান, সংগ্রহ করা সংরক্ষিত বীজ থেকে চারা উৎপাদন করে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি প্লটে রোপণ করা হয়। এ বছর এসব গাছে স্বাভাবিকভাবেই ফুল ফুটেছে। গবেষকদের ধারণা, এ সফলতা ভবিষ্যতে দেশীয় তুলার জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষা ও নতুন জাত উদ্ভাবনে বড় ভূমিকা রাখবে।
খামারের কটন অ্যাগ্রোনমিস্ট মো. আবদুল ওয়াহাব জানান, দিনাজপুর, বাগেরহাট, গাজীপুরের কাপাসিয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করা চার জাতের চারা গত বছরের ২৯ আগস্ট রোপণ করা হয়। প্রতিটি জাতের চল্লিশটি করে গাছ এখন মানুষের দ্বিগুণ উচ্চতা ছুঁয়েছে। শক্ত বাকলযুক্ত গাছগুলোতে ইতোমধ্যে ধরেছে তুলার গুটি। কিছু গাছে দুই দফায় ফুলও ফুটছে। হালকা হলুদ রঙের ফুল দুপুরে গোলাপি হয়ে যায়—যা ফুটি কার্পাসের স্বাতন্ত্র্য। প্রায় ১৫ বছর আয়ুষ্কালের এই গাছের আঁশ ছোট হলেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম, শক্ত ও উজ্জ্বল—যা মসলিন তৈরির আদর্শ উপাদান।
তুলা গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা আ. ন. ম. জহির উদ্দিন বলেন, ফুটি কার্পাস সংরক্ষণ ও এর চাষ সম্প্রসারণ মসলিন পুনরুদ্ধার প্রকল্পকে আরও ত্বরান্বিত করবে। ভবিষ্যতে এ জাতের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হলে দেশীয় তুলা উৎপাদনে ব্যাপক সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রধান পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন পরিচালক মো. আইয়ুব আলী বলেন, বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় ফুটি কার্পাস তুলার জাত উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পুনরুদ্ধারকৃত ফুটি কার্পাস তুলায় বীজের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি এবং ফাইবারের পরিমাণ কম। এছাড়া গাছের উচ্চতা সাধারণত ১৩ থেকে ১৪ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যে বীজের পরিমাণ কমানো, ফাইবারের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং গাছের উচ্চতা কমানোর জন্য গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, টেক্সটাইল অংশে অধিক পরিমাণে সুতা উৎপাদন, সুতার স্ট্রেংথ বৃদ্ধি, কাপড়ের উৎপাদন খরচ কমানো এবং প্রি-উইভিং প্রক্রিয়া উন্নয়নের ওপরও গবেষণা চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশের সোনালি ঐতিহ্য মসলিনের সুতা ও কাপড় তৈরির প্রযুক্তি পুনরুদ্ধার প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মাধ্যমে সফলভাবে ফুটি কার্পাস তুলা, মসলিনের সুতা তৈরির প্রযুক্তি এবং মসলিন কাপড় পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
আগামী মৌসুম থেকে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলার চাষিদের জন্য চাষাবাদ খরচ বাবদ প্রণোদনা প্রদান করা হবে এবং উৎপাদিত তুলা সরকারিভাবে ক্রয় করে নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমলে উৎপাদিত মসলিন কাপড়ের তুলনায় বর্তমানে উৎপাদিত মসলিন কাপড় আরও উন্নত মানের। বর্তমানে উৎপাদিত সব মসলিন কাপড় সম্পূর্ণ অর্গানিক। এসব কাপড়ে প্রাকৃতিক রঙের তুলা ব্যবহার করে নকশা করা হয়েছে এবং কোনো ধরনের কৃত্রিম ডাই ব্যবহার করা হয়নি।
অদূর ভবিষ্যতে মসলিন তৈরির প্রযুক্তি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ লক্ষ্যে উদ্যোক্তা, স্পিনার ও তাঁতিদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রায় ১৮ ফুট বা বারো হাত দৈর্ঘ্যের একটি মসলিন কাপড় তৈরিতে আনুমানিক ৪০০ গ্রাম ফুটি কার্পাস তুলার প্রয়োজন হয়।
প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে একটি শাড়ির উৎপাদন খরচ হালকা ডিজাইনে তিন থেকে চার লাখ টাকা, মধ্যম ডিজাইনে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা এবং ভারী ডিজাইনে সাত থেকে আট লাখ টাকা ছিল। বর্তমানে সেই খরচ প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও কমানো যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।